Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি : সব খাতে বড় ধাক্কা

কষ্ট বাড়ল সাধারণ মানুষের

Advertisement

মনির হোসেন

মনির হোসেন

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কষ্ট বাড়ল সাধারণ মানুষের

Advertisement

একদিকে মানুষের আয় কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির আগুনে পুড়ছে প্রায় প্রতিটি সংসার। কাজের বাজারও মন্দা। নেই নতুন কর্মসংস্থান। নানা সংকটে একে একে বন্ধ হচ্ছে উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রোববার রাতে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ায় সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপর বাড়তি খরচের বোঝা চেপে বসেছে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের মানুষসহ যাদের হাতে আয় বাড়ানোর ক্ষমতা নেই, তাদের যাপিত জীবন একরকম বিষিয়ে উঠছে। তারা সংসার চালাতে শুধু হিমশিম খাচ্ছেন বললে ভুল বলা হবে; ‘দিশেহারা’ কথাটি যথার্থ। সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় তাদের এখন কেউ ধারও দিতে চায় না। ফলে জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বিরূপ প্রভাব শুধু সাধারণ মানুষের ওপর পড়ছে না, শিল্পপতির শিল্প পরিচালনার উৎপাদন খরচও বাড়বে বহুগুণ। বাড়ছে গণপরিবহণসহ সব ধরনের পরিবহণ ভাড়া। নিত্যপণের বাজার তো এ অজুহাতে সোমবার থেকেই গরম। কৃষকের সেচ খরচও নির্ঘাত বাড়ছে। এই যখন অবস্থা, বাড়ি ভাড়া বাড়াতেও বাড়িওয়ালারা বেশি সময় নেবেন না। এককথায় বলা যায়, ধনী থেকে দরিদ্র-সবার জীবনে কমবেশি এর বিরূপ প্রভাব পড়বে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এটি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে বড় ধাক্কা। এর ফলে একদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, অপরদিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমে যাবে। এককথায়, সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি নানামুখী চাপে পড়বে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত অর্থনীতিকে আরও বাধাগ্রস্ত করবে। তবে তাদের মতে, মূল্য না বাড়িয়ে তেমন কোনো বিকল্পও ছিল না।

জানতে চাইলে উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী যুগান্তরকে বলেন, ‘এমনিতে পণ্যমূল্যের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত। আয় নেই। বেকারত্ব বাড়ছে। এ অবস্থায় নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধাক্কা। অর্থনীতির সব খাতে এর প্রভাব পড়বে। এর ফলে মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে এবং কমে যাবে ক্রয়ক্ষমতা। সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কৃষি, শিল্প ও সেবার দাম বাড়বে। বিশেষ করে সাধারণ ও খেটে খাওয়া দরিদ্র মানুষ কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবেন, তা কারও বোধগম্য নয়।

এছাড়াও মধ্যবিত্তের ওপর বড় প্রভাব পড়বে।’ তিনি বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে খরচ বাড়বে। এতে বাড়বে ফসলের দাম। এছাড়া পরিবহণ ব্যয়, মানুষের যাতায়াতের ভাড়া, শিল্পের উৎপাদন, উৎপাদিত পণ্যের মূল্য-সবকিছুই বাড়বে। বাড়বে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ। সবকিছু মিলে মানুষের জীবন আরও অস্বস্তিতে পড়বে।’

তিনি বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়ে সরকারের সামনে খুব বেশি বিকল্প ছিল না। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ছে। আর ভূরাজনীতির কারণে আমাদের নানা সীমাবদ্ধতা আছে। ইতোমধ্যে দেওয়ালে আমাদের পিঠ ঠেকে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে চাইলেই রাশিয়া বা চীনের মতো দেশ থেকে জ্বালানি তেল কেনা যায় না।’

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন সোমবার যুগান্তরকে বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি পায়; যার প্রভাব ধীরে ধীরে খাদ্যপণ্য, কৃষি, শিল্প ও বিভিন্ন সেবার দামে পড়ে। পণ্য পরিবহণ, সেচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং কারখানা পরিচালনার খরচ বাড়ায় উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরা এর একটি অংশ ভোক্তার ওপর চাপাতে পারেন। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমবে। ছোট ব্যবসা, কৃষক ও পরিবহণ শ্রমিকরা বেশি চাপের মুখে পড়বেন। একই সঙ্গে সরকারের ভর্তুকি ও আমদানি ব্যয় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। তবে মূল্যবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব কমাতে গণপরিবহণের ভাড়া তদারকি, বাজার নজরদারি এবং দরিদ্র পরিবারকে লক্ষ্যভিত্তিক নগদ ও খাদ্য সহায়তা দেওয়া জরুরি।’

পণ্যমূল্য বৃদ্ধি : তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর খুচরা বাজারে বেশ কয়েকটি সবজির দাম কেজিতে ৫-৭ টাকা বাড়ানো হয়েছে। বেশির ভাগ সবজির দাম ৮০ টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে। কিছু সবজির দাম ১০০ টাকা ছাড়িয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে কোম্পানিগুলো। সরবরাহ একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে পণ্যের বাজারে ক্রেতার হাঁসফাঁস অবস্থা তৈরি হয়েছে।

পরিবহণ ভাড়া : জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর সব ধরনের গণপরিবহণে ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে। পরিবহণ মালিক সমিতি ও সরকার ইতোমধ্যে সেই প্রক্রিয়া শুরু করেছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা, ইতোমধ্যে মোটরবাইকের রাইড শেয়ারিংয়ের ভাড়া বাড়িয়েছেন চালকরা। সোমবার সকাল থেকে গ্রাহকদের বেশি ভাড়া পরিশোধ করে চলাচল করতে দেখা গেছে। সরেজমিন জানা যায়, মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিংয়ের ভাড়া ১৫০ থেকে ২০০ টাকা হয়ে গেছে। কেউ ২০০ টাকার ভাড়া ২২০ থেকে ২৩০ টাকা আদায় করছেন।

শিল্প খাত : অর্থনীতিতে মন্দার কারণে দীর্ঘদিন দেশের শিল্প খাতে শ্লথগতি চলছে। নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না বললেই চলে। উদ্যোক্তারা চরম হতাশ। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ সর্বনিম্নে পৌঁছেছে। এতে নতুন কর্মসংস্থান যেমন হচ্ছে না, তেমনই বিদ্যমান কর্মীও ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এতে আয় কমার পাশাপাশি বেকারত্বও বাড়ছে, যা মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও নিম্নমুখী ও কঠিন করে তুলছে। এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি তাদের আরও বিপাকে ফেলেছে। তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। পাশাপাশি জাহাজ ভাড়া বেড়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে শিল্পোৎপাদনে সবচেয়ে বেশি জ্বালানির প্রয়োজন হয়। গার্মেন্ট, টেক্সটাইল, সিমেন্ট, স্টিল, সিরামিকসহ সবরকম কারখানায় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ডিজেল লাগে। পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহের অভাবে এর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। যার ফলে বিদেশে রপ্তানির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। দেশের নির্মাণ খাতের মধ্যে রড-সিমেন্ট, ইটভাটা ও নির্মাণ যন্ত্রপাতি অন্যতম। এর সবকিছুই জ্বালানিনির্ভর। জ্বালানি সংকটে রড-সিমেন্ট, টাইলস, ইট উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নতুন করে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়বে। এছাড়াও বাড়বে পরিবহণ ব্যয়। এতে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে আসবে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা-জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবি জোরালো হবে। বিষয়টি সরকারকে বেশ ভোগাতে পারে।

বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ সোমবার যুগান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। ফলে দেশেও দাম বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই বৃদ্ধি কীভাবে করা হবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে দাম বাড়ানো উচিত ছিল।’ তার মতে, এমনিতেই ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা খারাপ। নতুন বিনিয়োগ নেই। আমাদের পণ্য উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির কারণে অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমেছে। এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে দেশের ভেতরে চাহিদা আরও কমবে। তিনি বলেন, ‘গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের কারণে ইতোমধ্যে অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে। নতুন করে আরও কারখানা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এছাড়া খেলাপি ঋণ ইতোমধ্যে ৩২ শতাংশে পৌঁছেছে, এটি আরও বাড়বে।’

কৃষি খাত : তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে প্রভাব পড়ছে দেশের কৃষি খাতে। বিশেষ করে ডিজেলচালিত সেচ পাম্পসংশ্লিষ্ট কৃষি ব্লক বা প্রকল্প প্রয়োজনীয় সেচের অভাবে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনই এখন দাম বাড়ায় কৃষকের মাথায় হাত পড়েছে। এছাড়াও জ্বালানির কারণে বিদ্যুতের মূল্য ও জেনারেটরের খরচ বেড়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন : দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে ক্রমেই জ্বালানি তেলের ব্যবহার বাড়ছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বাড়বে। বেশকিছু তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পড়ে রয়েছে। কিন্তু হঠাৎ দাম বাড়ানোয় এখন খরচও বাড়বে। অনেকে মনে করেন, এ পরিস্থিতিতে ভর্তুকি কমাতে সরকার শিগ্গিরই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চিন্তাও করবে। এছাড়া ব্যয় কমাতে যদি উৎপাদন কমানোর চিন্তা করা হয়, সেক্ষেত্রে বিদ্যুতের বিদ্যমান লোডশেডিং আরও বাড়বে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম