বড়পুকুরিয়া নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক
উন্মুক্ত ও পুনর্ভরণে কয়লা তুলতে চায় খনি কর্তৃপক্ষ
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির উত্তর ও দক্ষিণ অংশের অগভীর এলাকায় উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া সেন্ট্রাল বা কেন্দ্রীয় অংশের উত্তরাংশে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় ২০২৮ সালের পর ‘পুনর্ভরণ’ পদ্ধতিতে (পেস্ট ব্যাকফিলিং মাইনিং) কয়লা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত চেয়েছে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কোম্পানি-বিসিএমসিএল। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রচলিত ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে কয়লা তুলে বাংলাদেশ ঠকছে। কারণ মাটির নিচে মাত্র ৭-৮ শতাংশ কয়লা তোলা যাচ্ছে। অথচ খনি এলাকার মাটি দেবে যাচ্ছে। সেখানে প্রাথমিকভাবে খালি স্থানে মাটি, বালি, সিমেন্ট ও ছাই দিয়ে ভরাট করে অর্থাৎ পুনর্ভরণ পদ্ধতিতে খনি উন্নয়ন করলে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কয়লা উত্তোলন সম্ভব। বুধবার দুপুরে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এই সুপারিশ করে সিদ্ধান্ত চেয়েছে বিসিএমসিএল। তবে এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি বৈঠকে। বৈঠকে জ্বালানি সচিবসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেছেন, বড় পুকুরিয়ার ব্যাপারে সরকারকে শিগ্গিরই সিদ্ধান্ত না দিলে ২০২৭ সালের পর কয়লা উত্তোলন করা যাবে না। কারণ কয়লা উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত চীনের ঠিকাদারের সঙ্গে বিসিএমসিএলের চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছরের ডিসেম্বরে (২০২৭ সালে)। কিন্তু এর আগে সিদ্ধান্ত না দিলে পরবর্তী খনি এলাকার উন্নয়ন বা কয়লা উত্তোলনের নকশা বানানো সম্ভব হবে না। আর নকশা প্রণয়ন না হলে কোন পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হবে তা চূড়ান্ত করা যাবে না।
বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কোম্পানি থেকে বলা হয়, গত ১৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর সামনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ নিয়ে একটি পেপার উপস্থাপন করা হয়। সেখানে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রী কম গভীর এলাকায় উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে নির্দেশ দেন। এর অংশ হিসাবে বুধবারের বৈঠকে আলোচনা করা হয়। বলা হয়, বড়পুকুরিয়ার উত্তর ও দক্ষিণাংশে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলা সম্ভব। উত্তর অংশের ১১৮ থেকে ৩৭০ মিটার গভীরে ২ দশমিক ৮১ কিলোমিটার এলাকাব্যাপী কয়লার মজুত আছে প্রায় ১৩৫ মিলিয়ন টন। দক্ষিণাংশে ২ দশমিক ২২ কিলোমিটার এলাকাব্যাপী ১৫২ থেকে ২৫৬ মিটার গভীরে কয়লার মজুত আছে ৫৪ মিলিয়ন টন। সব মিলিয়ে উত্তর ও দক্ষিণ অংশে ৫ দশমিক ০৩ কিলোমিটারে কয়লার মজুত আছে ১৯৮ মিলিয়ন টন। সরকার উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত নিলে এই দুই অংশ থেকে কয়লা তোলা যাবে ১৭০ মিলিয়ন টন। তবে এ ব্যাপারে ভূপ্রকৃতি এবং পানি ব্যবস্থাপনার জন্য আরও পর্যালোচনার দরকার আছে। কয়লা খনির কর্মকর্তারা জানান, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের ব্যাপারে এখন সিদ্ধান্ত নিলে নকশা ও অন্যান্য কাজ শেষ করে কয়লা তুলতে কমপক্ষে ৭-৮ বছর সময় লাগবে।
বড়পুকরিয়া খনি কোম্পানি থেকে বলা হয়, ২০১৪ সালে আইডব্লিউএম নামে একটি প্রতিষ্ঠান উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তুলতে এক রিপোর্ট দিয়েছে। সেখানে পানি ও ভূপ্রকৃতি বিষয়ে বিভিন্ন মতামত দেয়া হয়েছে। কিন্তু সে রিপোর্ট যথেষ্ট নয়। পুরো বিষয়গুলো নিয়ে আরও পর্যালোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা দরকার।
উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার ব্যাপারে খনি কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, বিষয়টি স্পর্শকাতর। তবে এই পদ্ধতিতে কয়লা তুললে ৯০ শতাংশের বেশি কয়লা তোলা যাবে। প্রাথমিকভাবে ৪ বর্গকিলোমিটার এবং পরবর্তীতে ২২ বর্গকিলোমিটার এলাকার জমি ব্যবহার দরকার হবে। পরবর্তীতে ১৯ থেকে ২০ বর্গকিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার করা যাবে। এর মধ্যে ৪,৭০০ থেকে ৪,৯০০ একর কৃষিকাজসহ অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা যাবে। কয়লা উত্তোলন শেষে ২-৩ বর্গকিলোমিটার লেকের সৃষ্টি হবে। বড়পুকুরিয়ার উত্তর-দক্ষিণাংশে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তুললে ২০টি গ্রামের ১৮-২০ হাজার মানুষকে পুনর্বাসন করতে হবে।
পেস্ট ফিলিং পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন : কয়লা খনি কর্তৃপক্ষ এবং জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা সম্প্রতি চীনে গিয়ে পুনর্ভরণ পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন দেখে এসেছেন। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে কেন্দ্রীয় অংশের উত্তরাংশের দশমিক ৮৬ কিলোমিটার এলাকায় পুনর্ভরণ পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সুপারিশ করা হয়। কোম্পানি থেকে বলা হয়, কেন্দ্রীয় অংশে গত আগস্ট মাস পর্যন্ত মাত্র ৩৮ দশমিক ৩৫ লাখ টন কয়লা তোলা হয়েছে। চীনা ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী আর মাত্র ৬ দশমিক ৬৬ লাখ টন কয়লা তোলা যাবে এই অংশ থেকে। তবে চুক্তির বাইরে বর্তমান ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে আরো ৩ দশমিক ৬৯ লাখ টন কয়লা তোলা যেতে পারে। এই কয়লা উত্তোলনের পরিমাণ মজুতের মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ। কিন্তু পেস্ট ফিলিং বা পুনর্ভরণ পদ্ধতিতে কয়লা তুললে কেন্দ্রীয় অংশের উত্তরাংশে (এলাকা দশমিক ৮৬৩ কিলোমিটার) মজুতের ৫২ শতাংশের বেশি কয়লা তোলা যাবে। সেখানে কয়লা আছে ৩১ দশমিক ০৯ মিলিয়ন টন। আর পুনর্ভরণ পদ্ধতিতে তোলা যাবে ১৬ মিলিয়ন টন। এর জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবস্থাপনা। সেটি আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে করা যাবে। পুনর্ভরণ পদ্ধতিতে কয়লা তুলতে আয় ও ব্যয় নিয়ে আরো আলোচনার দরকার আছে। তবে খনি কর্তৃপক্ষ প্রাথমিক পর্যালোচনা করে দেখেছে, বড়পুকুরিয়া খনির কয়লার দাম বেশি। প্রতি টন ১৭৬ ডলারের মতো। সেই হিসাবে পুনর্ভরণ পদ্ধতিতে সরকারের লাভ হয়।
