রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সন্ত্রাসী হামলা
গুঁড়িয়ে দেওয়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে ফিরেছে প্রাণ
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন ও মিরপুর (ঢাকা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর প্রাণ ফিরে পেয়েছে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারটি। গত দুদিন বাইরে ত্রিপল টাঙিয়ে টিকা কার্যক্রম চললেও সোমবার ভাঙা কক্ষের ভেতরে চলে স্বাস্থ্যসেবাদান। দুটি কক্ষ কোনো রকম পরিষ্কার করে টিকাদান কার্যক্রম চালানো হয়েছে। কক্ষ দুটির একটিতেও দরজা-জানালা নেই, ছিল না বিদ্যুৎও। ভাঙা ভবনের ভেতরেই চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসেছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। প্রচণ্ড গরমের মধ্যেই ছোট্ট শিশুদের টিকা দিতে এনেছে অভিভাবকরা। তবে আঙিনাজুড়ে ছিল উৎসুক জনতার ভিড়। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে গুঁড়িয়ে দেওয়া কংক্রিটের স্তূপ। এক্সকেভেটর দিয়ে চলছে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ। দখলদারদের সাইনবোর্ডটি সরিয়ে টাঙানো হয়েছে রাড্ডার ভেঙে ফেলা আগের সাইনবোর্ড। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বাইরে বসানো হয়েছে পুলিশের পাহারা। জামায়াতে ইসলামী ও এবি পার্টির নেতারা গতকাল সোমবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সরকারি দলের আশ্রয়-প্রশ্রয় ছাড়া এত বড় অপকর্মের সাহস কেউ করবে না। তিনি গুঁড়িয়ে দেওয়া ভবনটি সংস্কারে প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেন। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটিতে হামলার ঘটনাকে গাজায় ইসরাইলি হামলার সঙ্গে তুলনা করেছেন এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ (আসক)।
গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে মিরপুর এক নম্বরে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গতকালও লুট হওয়া টিনসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। হামলার পর থেকে বাইরে ত্রিপল টানিয়ে সেবা কার্যক্রম চললেও চতুর্থ দিনের মাথায় গতকাল রুমের ভেতরে টিকাদান কার্যক্রম চলে। প্রাণ ফিরে পাওয়ায় স্বাস্থ্যকর্মীরাসহ শিশুদের নিয়ে সেবা নিতে আসা মায়েরা খুশি হন। মূল গেটটি খুলে দেওয়া হয়েছে। গেটে একটি বেঞ্চে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন পুলিশ ও এপিবিএন সদস্যরা। ভেতরে একটি কক্ষে টিকাদান এবং দ্বিতীয় কক্ষটিতে মায়েদের বিভিন্ন পরামর্শ দিচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। বিদ্যুতের ব্যবস্থা না থাকায় গরমে অনেক শিশুকে কান্নাকাটি করতে দেখা গেছে। তবে সেবা নিয়ে ফিরে যাওয়ার সময় অনেককেই সন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা যায়। সাড়ে চার মাস বয়সি শিশুকে টিকা দিতে আসা লাবণী বেগম জানান, ভাঙা ঘরে নাতিকে নিয়ে সেবা নিতে হচ্ছে। গরমে শিশুটি কষ্ট পাচ্ছে। তবে টিকা দিতে পারায় তিনি সন্তুষ্ট। হামলায় জড়িতদের বিচার দাবি করেন তিনি।
মিরপুরের গুদারাঘাটের বাসিন্দা মা ইলা বেগম বলেন, হামের টিকা দিতে এসেছি শিশুকে নিয়ে। বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে খুব কষ্ট হচ্ছে। তবে টিকাদান আর প্রাথমিক কিছু পরামর্শ বাদে সব সেবাই বন্ধ রয়েছে। সেন্টারটি ঘুরে দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত কক্ষগুলো সংস্কারের জন্য ভেতরে পড়ে থাকা বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রবেশপথে গেট লাগানো হচ্ছে। বিভিন্ন কক্ষে লাগানোর জন্য সিলিং ফ্যান, লাইট, বৈদ্যুতিক তারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম আনা হয়েছে। কয়েকটি কক্ষে রঙের কাজ করতে দেখা গেছে।
প্রতিষ্ঠানটির স্বাস্থ্যকর্মী জুলেখা খানম, বিউটি ও এলিজা আক্তারসহ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, দুদিন ধরে সবাই বাইরে দাঁড়িয়ে ডিউটি করেছেন। তারপরও কেউ মনোবল হারাননি। সোমবার ভেতরে বসার জায়গা হয়েছে। এজন্য সবাই খুশি। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার যুগান্তরকে বলেন, শিশুদের ইপিআই টিকা, হাম-রুবেলা ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইনের টিকা এবং গর্ভবতী মায়েদের টিটি টিকা দেওয়া হচ্ছে। প্রাইভেসি নিশ্চিত করা গেলে গর্ভবতী মায়েদের গর্ভকালীন চেকআপও শুরু হবে। পাশাপাশি সাধারণ রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রেসক্রিপশন দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, দুপুর পর্যন্ত ৫৬ জনকে টিকা দেওয়া হয়েছে। বিকাল ৩টা পর্যন্ত সেবা কার্যক্রম চলে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ও স্যানিটেশন সুবিধার সংকট রয়েছে। সরকার এক সপ্তাহের মধ্যে স্বাস্থ্যকেন্দ টি সংস্কারের আশ্বাস দিয়েছে। দুদিনের মধ্যে বিদ্যুৎ, পানি ও ওয়াশরুমের ব্যবস্থা নিশ্চিতের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, তিনটি সেমিপাকা ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস এবং পাকা ভবনটিও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শাহ আলী থানার ওসি রেজাউল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, নতুন করে আরও দুজন গ্রেফতার করা হয়েছে। লুট হওয়া টিনসহ কিছু সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। চক্রের অন্যদের গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে।
সরকারি দলের প্রশ্রয় ছাড়া কেউ সাহস করবে না : জামায়াতে ইসলামীর নেতা ডা. শফিকুর রহমান বিকালে পরিদর্শনে এসে বলেছেন, গাছের গোড়া কেটে মাথায় পানি দেবেন আপনারা, এটা জনগণ দেখতে চায় না। সর্প হয়ে দংশন করে ওঝা হয়ে ঝাড়ার নাটক আমরা দেখতে চাই না। হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করুন। ভবিষ্যতে যেন কেউ এ ধরনের অপকর্ম করার সুযোগ না পায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। এসব ঘটনায় বিরোধী দলকে জড়ানোর চেষ্টা হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, এ ধরনের অপকর্মের সঙ্গে আমার দলের লোক তো দূরের কথা, আমি নিজেও যদি জড়িত থাকি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন আমাকে ক্ষমা না করে। আমাকেও যেন আইনের আওতায় নেয়।
গাজায় ইসরাইলি হামলাকে মনে করিয়ে দেয় : সোমবার বেলা ১১টার দিকে স্বাস্থ্যকেন্দ টি পরিদর্শন শেষে সংবাদ সম্মেলনে এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেছেন, পুলিশের গাড়ির সামনে থেকেই ফার্নিচার ও সরঞ্জাম ট্রাকে তুলে নেওয়া হয়েছে। এ হামলাকে গাজায় ইসরাইলি হামলার সঙ্গে তুলনা করেন তিনি। তিনি বলেন, এই ১০ কাঠা জমি হাসপাতালকে একটি ট্রাস্ট করে আপনারা দিয়ে দেবেন। এটিকে বহুতল কমিউনিটি হাসপাতাল করার জন্য যে যে উদ্যোগ নেওয়া দরকার, আপনারা সে উদ্যোগ নেবেন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ : রাড্ডা সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের পর ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ (আসক)। প্রতিষ্ঠানাটি জানায়, প্রায় পাঁচ দশক ধরে নিম্নআয়ের মানুষের, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসা একটি প্রতিষ্ঠানের ভবন এভাবে ধ্বংস করে দেওয়া অত্যন্ত গুরুতর ও অগ্রহণযোগ্য ঘটনা।
আসকের কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরব ভূমিকা। আইন ও সালিশ কেন্দ দাবি করছে, হামলা ও ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পাশাপাশি পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা ও পৃষ্ঠপোষকদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা স্বাধীনভাবে তদন্ত করে দায় নির্ধারণ করতে হবে।
