Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ডে সরকারের নজর

‘অপারেশন ক্লিন হার্টের’ আদলে অভিযানের চিন্তা

Advertisement

সিরাজুল ইসলাম

সিরাজুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

‘অপারেশন ক্লিন হার্টের’ আদলে অভিযানের চিন্তা

Advertisement

রাজধানীর বিরোধপূর্ণ জমি পালটাপালটি দখলকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে অপরাধীচক্র। তাদের নেপথ্যে রয়েছে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের হাত। সম্প্রতি ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রোপার্টিজ, মিরপুরের রাড্ডা ক্লিনিক, মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এবং আদাবরের শ্যামলী হাউজিংয়ে হামলার ঘটনায় বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। এসব ঘটনায় নাগরিক জীবনে ভীতির সঞ্চার হয়েছে। দেখা দিয়েছে নানা আশঙ্কা। কখন কার জমি বিরোধপূর্ণ দাবি করে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়ে সন্ত্রাসীরা দখলের চেষ্টা করে-এমন ভয় ও আতঙ্ক বিরাজ করছে মানুষের মনে। দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগে এমনটি হচ্ছে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। এসব ঘটনা সামনে রেখে সরকার জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। এর অংশ হিসাবে নজর দেওয়া হয়েছে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ড ও অপতৎপরতার দিকে। তাদের দমনে ২০০২ সালের ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর আদলে বড় ধরনের অভিযানের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মনে করছে, ক্ষমতার পালাবদল ও রাজনৈতিক পরিবর্তন এলেও দখলদারি ও আধিপত্য বিস্তারে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ব্যবহারের পুরোনো কৌশল বদলায়নি। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং পুরোনো আক্রোশ কাজে লাগিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা পেছন থেকে অপরাধের কলকাঠি নাড়ছে। গত কয়েকদিনে বেশ কয়েকটি হামলায় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নাম জড়ালেও এর গভীরে রয়েছে পুরোনো শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নানা ছক। এ কারণেই রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর আদলে বড় ধরনের কোনো অভিযান করা যায় কি না, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে সরকার। তবে বিষয়টি এখনো প্রাথমিকভাবে আলাপ-আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। এটি চূড়ান্ত করার আগে সরকারের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র যুগান্তরকে জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা ও সহিংসতার পেছনে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মদদ এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের তথ্য গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাতে বলা হয়েছে, সামনে জনজীবনে আরও বড় ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার মাধ্যমে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা চলছে। এসব বিষয় সরকারকে ভাবিয়ে তুলেছে। সূত্রটি জানায়, অবস্থা যেদিকে যাচ্ছে, যৌথ অভিযানের বিকল্প নেই।

পুলিশ সদর দপ্তরও বলছে, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থানে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। অপরাধীদের কোনো ছাড় না দিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।

এ বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, যারা এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত এবং ইন্ধনদাতা-সবার বিরুদ্ধেই তদন্ত কার্যক্রম চলছে। তদন্তে যাদের নাম আসছে, তাদেরই গ্রেফতার করা হচ্ছে। অপরাধীদের ধরতে পোশাকধারী পুলিশ এবং গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) যৌথভাবে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। অভিযান আরও জোরালো করা হবে। তিনি বলেন, নতুনভাবে যেসব অপরাধী মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ চলছে।

সাবেক আইজিপি নূরুল হুদা যুগান্তরকে বলেন, অপরাধমূলক ঘটনাগুলো কারা ঘটাচ্ছে, কেন ঘটাচ্ছে-এসব বিষয়ে এরই মধ্যে সুনির্দিষ্ট তথ্য বেরিয়ে এসেছে। প্রতিটি ঘটনা ধরে নেপথ্যের ব্যক্তিদের টান দিলে পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব। তিনি বলেন, পরাজিত শক্তি সব সময়ই সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করে। এ বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সরকারকে কঠোর হয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ইসিবি চত্বরসংলগ্ন নিউ গিনি প্রোপার্টিজে শনিবার রাতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার মূল কারণ সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী এবং নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়া (নিউ গিনি প্রোপার্টিজের মালিক) নামের এক ব্যক্তির দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব। নাজিম আগে জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি ফের জামায়াতে যোগ দিয়ে বিরোধপূর্ণ জমি নিজের দখলে রাখেন। এ ক্ষেত্রে আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের বিষয়টি সামনে আসে। তিনি টিনশেডের একটি রুমে স্টুডিও তৈরি করেন।

অপরদিকে নিউ গিনি প্রোপার্টিজের জমির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী যোগাযোগ করেন বিদেশে পলাতক আওয়ামী ঘরানার শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে। ঢাকার অপরাধজগতের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত হোসেন দীর্ঘদিন বিদেশে আত্মগোপনে থেকে আন্তর্জাতিক কল বা ইন্টারনেট অ্যাপের মাধ্যমে ক্যাডারদের পরিচালনা করে আসছেন। মিরপুর, পল্লবী, ক্যান্টনমেন্ট, মোহাম্মদপুর এবং কাফরুল এলাকায় সন্ত্রাসী পাঠিয়ে চাঁদাবাজি ও অবৈধ জমি দখল পরিচালনা করা তার মূল কাজ। ইসিবি চত্বরের বিরোধপূর্ণ জমিটি মহিউদ্দিন চৌধুরীর পক্ষ হয়ে দখলের জন্য সন্ত্রাসী শাহাদাতকে যুক্ত করা হয়। মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে শাহাদাত তার নিজস্ব দুই শতাধিক ক্যাডারকে অস্ত্রশস্ত্রসহ সেখানে পাঠিয়ে হামলা, ভাঙচুর ও স্টুডিও তছনছ করান। নেতৃত্ব দেন শাহাদাতের বিশ্বস্ত শুটার সোহেল। হামলা ও ভাঙচুরের পর সুপরিকল্পিতভাবে সেটিকে ‘বিএনপি বা যুবদলের চাঁদাবাজি’ হিসাবে ফেসবুক লাইভ ও মিডিয়ায় প্রচারের কৌশল নেওয়া হয় বলেও জানা যায়।

নিউগিনি প্রোপার্টিজের মালিক নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়া যুগান্তরকে বলেন, তার সম্পত্তিতে হামলার আগে শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাতের শুটার পরিচয়ে সোহেল তাকে (নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়া) মোবাইল ফোনে হুমকিও দেন। তিনি জানান, প্রায় দেড় বছর আগে জুলাই যোদ্ধা ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরকে জায়গায় রুম ভাড়া দেন। পরে বিষয়টি নিয়ে দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কেবল ইসিবি চত্বরের ঘটনাই নয়, রাজধানীর অন্য চাঞ্চল্যকর ঘটনাগুলোর পেছনেও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম এসেছে। মিরপুরের বহুল আলোচিত রাড্ডা ক্লিনিকের জমি দখল নিয়েও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। ১৯৭৪ সাল থেকে পরিচালিত এই চ্যারিটেবল ট্রাস্টের জমিটি কাগজে-কলমে বিহারিদের হলেও তা দখলের ছক আঁকা হয়। স্থানীয় সন্ত্রাসী ও স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক মহল পট পরিবর্তনের সুবাদে এই সম্পত্তি কবজায় নেওয়ার পরিকল্পনা করে। ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাত (২৫ সেপ্টেম্বর প্রথম প্রহর) সেখানে তাণ্ডব চালায় তারা। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরবতার সুযোগে ট্রাস্টের সম্পত্তি ব্যক্তিস্বার্থে গ্রাস করতে গিয়ে ভবন ভেঙে তছনছ করে দেওয়া হয়।

অন্যদিকে দুর্ধর্ষ গ্যাং ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের চারণভূমি হিসাবে পরিচিত মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এবং আদাবরের শ্যামলী হাউজিং এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই অরক্ষিত। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর থেকে এলাকার একাধিক হাউজিং প্রজেক্ট, সরকারি খাসজমি এবং প্রবাসীদের বিরোধপূর্ণ জমি দখলে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম বারবার সামনে আসে। এলাকার কিশোর গ্যাং ও ক্যাডারদের দিয়ে রাজনৈতিক দলের ব্যানার ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও জমি দখলের সব ধরনের অপচেষ্টা চালানো হয়। এতে জমির মালিক ও ব্যবসায়ীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন বলেন, সাম্প্রতিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ পুলিশ গোয়েন্দা নজরদারি, টহল ও চেকপোস্ট জোরদার করেছে। অপরাধপ্রবণ এলাকা ও অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি অপরাধীদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

ভবিষ্যৎ আশার আলো সৌরবিদ্যুৎ সবুজ শক্তির পথে নতুন সম্ভাবনা

সবুজ শক্তির পথে নতুন সম্ভাবনা

শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ডে সরকারের নজর ‘অপারেশন ক্লিন হার্টের’ আদলে অভিযানের চিন্তা

‘অপারেশন ক্লিন হার্টের’ আদলে অভিযানের চিন্তা

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে হতাশ পিডিবি

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে হতাশ পিডিবি

চড়া দামে চরম অস্থিরতা এলপিজির বাজার ১০ কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে

এলপিজির বাজার ১০ কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম