কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে হতাশ পিডিবি
Advertisement
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো (সরকারি-বেসরকারি) চালু হয়েছে ৫-৬ বছরও হয়নি। এর মধ্যে সরকারি এবং যৌথ উদ্যোগে গড়ে তোলা বেশির ভাগ বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নানা ধরনের যান্ত্রিক জটিলতায় ভুগছে। যার কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো স্বাভাবিকভাবে চলতে পারছে না। ফলে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো বেইসড লোড বা বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল উৎস ধরা হলেও এগুলো নিয়ে হতাশা বাড়ছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে (পিডিবি)। পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম সম্প্রতি যুগান্তরকে জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ বিভাগের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, সব কেন্দ্রের মেরামতের একটি সূচি তৈরি করে আগামী শীত মৌসুমে বন্ধের অনুমতি দেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের সব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে সম্প্রতি একটি বৈঠক হয়। সেখানে কেন্দ্রগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনার পর বেশ কিছু সিদ্ধান্ত দেয় বিদ্যুৎ বিভাগ।
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কয়লাভিত্তিক ১৩২০ মেগাওয়াটের পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র। ২০২০ সালের মে মাসে পায়রার প্রথম ইউনিট এবং ২০২২ সালের মার্চে দ্বিতীয় ইউনিট চালু হয়। কারিগরি ক্রটি এবং মেরামতের অভাবে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রে এখন মাত্র ৩০০-৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে।
অক্টোবরের মধ্যে দুটি ইউনিটই মেরামতের জন্য বন্ধ করতে হবে। এর মধ্যে দ্বিতীয় ইউনিট গত ২৫ সেপ্টেম্বর বন্ধ হয়ে গেছে। এই ইউনিটটি চালু হলে আগামী ২৫ অক্টোবর প্রথম ইউনিট মেরামতের জন্য বন্ধ করতে হবে। এছাড়া বৃহৎ এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বড় সমস্যায় আছে পায়রা বন্দরের গভীরতা নিয়ে। এই কেন্দ্রের জন্য আরও একটি বড় সমস্যা হচ্ছে রাবনাবাদ চ্যানেলের গভীরতা কম। এ নিয়ে গত ১৩ সেপ্টেম্বর পায়রা বন্দরের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। সেখানে রাবনাবাদ চ্যানেলে সাড়ে ১০ মিটার গভীরতা থাকা দরকার বলে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। তবে গভীরতার জন্য ড্রেজিংয়ে বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করতে হবে বলে জানানো হয়েছে। তাই আপাতত ৯ মিটার গভীরতার জন্য ড্রেজিং করা হবে। এজন্য পায়রা বন্দরের সঙ্গে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ৬৫০ কোটি টাকার লেভি চার্জের দাবি পূরণের তাগাদা দেওয়া হয়েছে। পায়রা কেন্দ্র সরকারি প্রতিষ্ঠান নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন এবং চীনের ন্যাশনাল মেশিনারি এক্সপোর্ট অ্যান্ড ইমপোর্ট কোম্পানি-সিএমসির সঙ্গে যৌথভাবে বসানো হয়েছে। পায়রার মতো ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা রাখে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। পিডিবি এবং ভারতের এনটিপিসির সঙ্গে যৌথভাবে বসানো হয় এই কেন্দ্র। ২০২৩ সালে এটির প্রথম ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। দ্বিতীয় ইউনিট চালু হয় ২০২৪ সালের মার্চে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা রামপাল কেন্দ্রের। গত এক বছরে ৩১-৩২ বার বন্ধ হয়েছে রামপালের কোনো না কোনো ইউনিট। বারবার কেন্দ্রের টিউবের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তাই আগামী ২৪ নভেম্বর থেকে পরের বছর ২ জানুয়ারি পর্যন্ত এটির প্রথম ইউনিট এবং ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দ্বিতীয় ইউনিটের মেরামতের জন্য বন্ধ রাখা হবে। রামপালে কয়লা সরবরাহ নিশ্চিত রাখতে ওই চ্যানেলে ড্রেজিং অব্যাহত রাখতে মোংলা বন্দরকে বলা হয়েছে।
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র চলতি বছরে চালু করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়েছে গত ২৮ মে। এর মধ্যে এই কেন্দ্রের সংরক্ষণ মেরামতের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। কারণ এই কেন্দ্রের ২ হাজার মিটার বয়লার টিউব পরিবর্তন প্রয়োজন। এখন তাদের হাতে আছে ৬০০ মিটার। বাকি টিউব ৩০ অক্টোবরের মধ্যে সাইডে আসবে। এরপর নভেম্বর-ডিসেম্বরে প্রথম ইউনিট এবং জানুয়ারিতে দ্বিতীয় ইউনিটের সংরক্ষণের জন্য বন্ধ করা হবে।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত ১৩২০ মেগাওয়াট মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংরক্ষণের জন্যও এটি বন্ধ করা দরকার বলে সংশ্লিষ্টরা পিডিবিকে জানিয়েছেন। তবে মাতারবাড়ীতে ব্যবহার করা কয়লার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর বিদ্যুৎ বিভাগের একজন যুগ্মসচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গত সপ্তাহে মাতারবাড়ী পরিদর্শন করেছেন। তারা এ ব্যাপারে সরকারকে জানাবেন বলে জানা গেছে। বরিশাল ৩০৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইয়ার্ডে ৪৮ হাজার টন কয়লা মজুত থাকলেও কোল মিলের সমস্যার কারণে এটি পুরোদমে উৎপাদন করতে পারছে না। এটি থেকে মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে অবস্থিত বেসরকারি এসএস পাওয়ার প্ল্যান্টে এখন পর্যন্ত কোনো যান্ত্রিক সমস্যা পাওয়া যায়নি। এটি চলতি মাসে ১ লাখ ১৩ হাজার ৭৫০ টন কয়লার এলসি করেছে।
পিডিবির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই কেন্দ্রটি নানা সমস্যায় জর্জরিত। এটির দ্বিতীয় ইউনিট বন্ধ আছে কয়েক বছর ধরে। আর প্রথম এবং তৃতীয় ইউনিটের দক্ষতা হারিয়ে ফেলছে প্রতিদিন। এই কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা ৫২৫ মেগাওয়াট হলেও এখন পাওয়া যায় মাত্র ২০০ মেগাওয়াটের মতো।
