Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

দখল-চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে সাইমনের ‘টর্চার সেল’

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দখল-চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে সাইমনের ‘টর্চার সেল’

Advertisement

রাজধানীর বাংলামোটরে চাঁদা না পেয়ে বৃহস্পতিবার রাতে ব্যবসায়ী সোহানকে মারধরের মামলায় গ্রেফতার হওয়া সাইমনকে চার দিন ও তার তিন সহযোগীকে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। শুক্রবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত জাহানের আদালত শুনানি শেষে রিমান্ডের এ আদেশ দেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. ইবনে মিজান বিষয়টি যুগান্তরকে নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্ত শেষে ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হাতিরঝিল থানার উপপরিদর্শক মো. নাসিম চার আসামিকে আদালতে হাজির করে আসামিদের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়-ঘটনার সঙ্গে আরও কারা জড়িত, তাদের শনাক্ত ও গ্রেফতারসহ মামলার সংশ্লিষ্ট তথ্য উদ্ধারের জন্য আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। রিমান্ডে নেওয়া অপর তিন আসামি হলেন-ওমর (৩২), মোর্শেদ (২৫) ও মো. শাওন (২৫)।

যুবদলের বহিষ্কৃত নেতা ফেরদৌস আহমেদ সাইমনের অপরাধ সাম্রাজ্য নিয়ে শুক্রবার সরেজমিন খোঁজখবর নিয়ে আঁতকে ওঠার মতো তথ্য মিলেছে। এই সাইমন রাজধানীর বাংলামোটর এলাকায় আতঙ্কের নাম। এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন পুরো এলাকা। চাঁদাবাজি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও জায়গা দখল এবং মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ছিল তার দখলে। অপরাধ সাম্রাজ্য ধরে রাখতে তিনি তৈরি করেন নিজস্ব ‘টর্চার সেল’ (নির্যাতন কক্ষ)। চাঁদা না দিলে সেখানে নিয়ে ভুক্তভোগীদের করা হতো নির্যাতন। এখনো তার ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না অনেকে।

টর্চার সেল : বাংলামোটর পেট্রোল পাম্পের গলির ভেতরে অবস্থিত ৮০ নম্বর বাসা। ওই বাসার নিচতলার একটি কক্ষ ভাঙারি দোকান হিসাবে ভাড়া দিয়েছিলেন মালিক সাইদুর রহমান। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের শেষের দিকে সাইদুর রহমানের কক্ষটি নিজের দখলে নেন ফেরদৌস আহমেদ সাইমন। সেখানেই গড়ে তোলেন ‘টর্চার সেল’। গত ৬ মাসে এই ‘টর্চার সেলে’ প্রায় ২০-২৫ জনকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করেন তিনি। ভুক্তভোগীদের মধ্যে-বিকাশ ব্যবসায়ী আব্দুর রউফ, ফ্লেক্সিলোড ব্যবসায়ী রিজওয়ান, ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়ী রাজু, মুদি ব্যবসায়ী রতন, সেলুন ব্যবসায়ী নাহিদ, হোটেল ব্যবসায়ী মোতাহার, রিকশা ব্যবসায়ী নূরজাহানসহ আরও অনেককে সেই সেলে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হোসেন কক্ষটি দেখিয়ে বলেন, ‘এই রুমে বানাইছে আয়নাঘর। এই ঘরে নিয়ে টর্চার করে সবকিছু আদায় করে। মানুষকে মারপিট করে। নির্যাতন করে। এ ধরনের টর্চার কক্ষ বন্ধ না করলে নির্যাতন বন্ধ হবে না।’

ফ্লেক্সিলোড ব্যবসায়ী আব্দুর রব যুগান্তরকে বলেন, কিছুদিন আগে সাইমন আমার রুমে এসে ভাঙচুর চালায়, মারধর করে। পরে আমাকে তার রুমে নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে নির্যাতন করা হয়। শুধু আমাকে নয়, সেখানে আরও অনেক মানুষকে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে।

চাঁদার দাবিতে বৃহস্পতিবার রাত ৮টায় রাজধানীর বাংলামোটরের পেট্রোল পাম্পের গলিতে মো. সোহান নামের একজন ব্যবসায়ীর পথ রোধ করে যুবদলের বহিষ্কৃত নেতা ফেরদৌস আহমেদ সায়মন ও তার সহযোগীরা। এ সময় কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে সোহানকে পিস্তলের বাঁট দিয়ে মাথায় আঘাত করলে তার মাথা ফেটে রক্ত বের হতে থাকে। সোহান চিৎকার ও প্রতিবাদ শুরু করলে সায়মন বেশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করেন। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দারা এগিয়ে এলে সায়মন তার সহযোগীদের নিয়ে একটি ভবনে প্রবেশ করেন। তখন বাইরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন স্থানীয়রা। এ সময় একটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করেন বিক্ষুব্ধ জনতা। পরে মোটরসাইকেলটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান হাতিরঝিল থানা পুলিশ। এ সময় তাদেরও অবরোধ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে ডিএমপি পুলিশ, ডিবি, এসআরবি ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। বিক্ষোভের মুখে তারাও অনেকটা বেকায়দায় পড়েন। পরে জনগণের বিক্ষোভের মুখে সাইমনসহ চারজনকে আটক করে হাতিরঝিল থানায় নেওয়া হয়।

হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, গুলি ও মারধরের ঘটনার মূলহোতা সাইমনসহ চারজনকে ঘটনাস্থল থেকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের গ্রেফতারের পর ঘটনার বিষয়ে বেশকিছু তথ্য পেয়েছি। সেগুলো ধরে আমাদের তদন্ত কার্যক্রম চলছে। তদন্ত শেষ হলে ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত বলা সম্ভব হবে। তবে ঘটনায় জড়িত বাকিদের ধরতে অভিযান কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

নির্যাতনের শিকার সোহান বৃহস্পতিবার গভীর রাতে হাতিরঝিল থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, সাইমন তার থেকে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেছিল। ?চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সাইমন পিস্তল বের করে তার বুকের দিকে ধরে। পরে পিস্তলের বাঁট দিয়ে মাথায় আঘাত করে। সোহানের ভগিনীপতি মো. মোক্তার হোসেনসহ স্থানীয়রা বাধা দিলে তাদেরও মারধর করে। এ সময় সাইমন পিস্তল দিয়ে তিন রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে। পরে মোতাহার হোটেলের সামনে আরও দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে পালানোর চেষ্টা করলে স্থানীয়রা তাকে আটক করে। এ সময় কয়েকজন পালিয়ে গেলেও স্থানীয়রা সাইমনসহ কয়েকজনকে ধরে ফেলে। পরে পুলিশ গিয়ে তাদের হেফাজতে নেয়। এজাহারে সাইমন ছাড়াও মো. মিজান, ওমর, মোর্শেদ ও মো. শাওনের নাম রয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ২ থেকে ৩ জনের কথা উল্লেখ করা হয়।

ঢাকা মহানগর উত্তরের আওতাধীন ৩৫ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের আহ্বায়ক ছিলেন ফেরদৌস আহমেদ সাইমন। তবে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ, চাঁদাবাজি, মারামারি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ সুনির্দিষ্ট বেশকিছু অভিযোগের ভিত্তিতে চলতি বছর জানুয়ারি মাসে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। তবে বহিষ্কারের পরও দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান তিনি। গড়ে তোলেন নিজস্ব বাহিনী। সেই বাহিনীর মাধ্যমে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে দাবি স্থানীয়দের।

শুক্রবার সরেজমিন গিয়ে আরও দেখা যায়, অনেকটাই নীবর বাংলামোটরের পেট্রোল পাম্পের গলি। বন্ধ বেশকিছু দোকান। স্থানীয়দের মধ্যে অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে। ভয়ে মুখ খুলতে চান না অনেকে। স্থানীয়দের দাবি-চাঁদাবাজির মাস্টার সাইমন। বাংলামোটর এলাকার ফুটপাত, ভাসমান দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁ, বাসা-বাড়ি, অফিস ও নির্মাণাধীন ভবন থেকে নিয়মিত চাঁদা তুলতেন তিনি। চাঁদা না দিলে নেমে আসত অমানবিক নির্যাতন। তুলে নিয়ে যাওয়া হতো নিজস্ব ‘টর্চার সেলে’। সেখানে আটকে রেখে করা হতো মারধর। ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হতো।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রথমেই বাংলামোটর পাম্পের গলিতে আওয়ামী লীগ নেতা সাঈদ হোসেনের একটি সেলুন নিজের দখলে নেন সাইমন। এরপর মিল্লাত নামে দলটির আরেক নেতার দোকানও দখল করেন। সম্প্রতি এলাকার ডেন্টাল কেয়ার থেকে চাঁদা দাবি করেন সাইমন। জননী ইন্টারন্যাশনাল বিকাশের দোকানের মালিক আব্দুর রউফ বলেন, কিছুদিন আগে সাইমনসহ কয়েকজন আমার দোকানে আসেন। ছুরি দিয়ে আমাকে আঘাত করেন। পরে দোকানে থাকা প্রায় দেড় লাখ টাকা নিয়ে যান।

বৃহস্পতিবার হামলার শিকার সোহান যুগান্তরকে বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকে তার চাঁদাবাজি শুরু হয়। কেউ তার চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেন না। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে নির্যাতন করা হয়। মারধর করা হয়। তার একটা ‘টর্চার সেল’ আছে। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। তার এসব চাঁদাবাজি ও কর্মকাণ্ড থেকে এলাকার মানুষ মুক্তি চান।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

কমছে আয়, ঋণেই ভরসা

কমছে আয়, ঋণেই ভরসা

মিষ্টির পদত্যাগে সতর্কবার্তা আতঙ্কে চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীরা

আতঙ্কে চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীরা

বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এর সভা ব্যাংকক বৈঠকে চাওয়া হবে ৫০০ কোটি ডলারের ঋণ

ব্যাংকক বৈঠকে চাওয়া হবে ৫০০ কোটি ডলারের ঋণ

দখল-চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে সাইমনের ‘টর্চার সেল’

দখল-চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে সাইমনের ‘টর্চার সেল’

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম