Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

মিষ্টির পদত্যাগে সতর্কবার্তা

আতঙ্কে চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীরা

Advertisement

Icon

সিরাজুল ইসলাম

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

আতঙ্কে চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীরা

Advertisement

সংরক্ষিত আসনের সংসদ-সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগে বাধ্য করার মধ্য দিয়ে সরকার ও দলে এক ধরনের বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার এই সিদ্ধান্তে স্পষ্ট হয়েছে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সমুন্নত রাখা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে তিনি কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা চাঁদাবাজ, দখলদার ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে তার ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ইতোমধ্যে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, অপরাধী যেই হোক না কেন, তার রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি বিএনপিতেও শুরু হয়েছে শুদ্ধি অভিযান। এই অভিযানের খবরে দলে এরই মধ্যে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিসহ অনেকেই দেশের বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এদিকে মন্ত্রিসভার বিতর্কিত দু-একজন সদস্যও ভয়ে আছেন বলে জানা গেছে।

বিএনপি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অপকর্মকারীদের স্থান হবে শুধু কারাগারে। শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসাবে সংসদ-সদস্য মিষ্টিকে পদত্যাগ করানো হয়েছে। তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান রয়েছে। বিভিন্ন অভিযোগের কারণে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে ঢাকা মহানগর উত্তরের কমিটি। ওই কমিটির কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে মিরপুরের রাড্ডা ক্লিনিক এবং ইসিবি চত্বরে হামলার ঘটনায় কিছু কর্মী পাঠিয়ে মদদ দেওয়ার অভিযোগ আছে।

বিএনপির বিভিন্ন সূত্রে খবর নিয়ে জানা গেছে, উত্তরের কমিটি বিলুপ্ত এবং মিষ্টির ঘটনার পর দলটির বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত নেতারা অনেকটাই চুপসে গেছেন। চাঁদাবাজ হিসাবে পরিচিতদের মধ্যে ঢুকে গেছে এক ধরনের ভয়। এদিকে, আন্ডারওয়ার্ল্ডের সক্রিয় গ্যাং ও অপরাধ চক্রগুলোর ওপর নজরদারি বাড়াতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সক্রিয় করা হয়েছে। তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের গ্রেফতারে ইতোমধ্যে বিশেষ টিম কাজ শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপে দেশের অপরাধ জগতে বড় ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

সূত্রগুলো জানাচ্ছে, আনুষ্ঠানিক চিঠি এখনো না গেলেও বিএনপির কেন্দ্র থেকে নেতারা তৃণমূলের কাছে প্রধানমন্ত্রীর কড়া বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। বলা হয়েছে, অপকর্মের সঙ্গে জড়িত হলে প্রধানমন্ত্রী কাউকে ছাড় দেবেন না। উদাহরণ হিসাবে বলা হয়েছে, সাবেক ছাত্রদল ও বিএনপির পোড় খাওয়া মাঠপর্যায়ের নেতা মিষ্টিকে ছাড় দেওয়া না হলে আর কারোরই ছাড় পাওয়ার সম্ভাবনা কম। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি শুক্রবার রাজধানীতে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নীতি ও সুশাসনের প্রতি শক্ত অবস্থানের কারণেই সংসদ-সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে ও সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কেউ যদি দেশে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করে, এক বিন্দুও ছাড় দেওয়া হবে না।

বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড মডেল থানার প্রধান ফটকের সামনে গাড়ি রাখাকে কেন্দ্র করে এক পুলিশ সদস্যকে মারধরের ঘটনায় চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সহসভাপতি ইসমাইল হোসেনকে দলের সব পদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।

কিছু অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংরক্ষিত আসনের একজন সংসদ-সদস্যের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নেওয়া সিদ্ধান্ত ‘যুগান্তকারী’ বলে মনে করেন তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ। যুগান্তরকে তিনি বলেন, বিভিন্নভাবে যারা সরকারের নাম ভাঙিয়ে দেশের এবং দলের ক্ষতি করছেন প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত তাদের জন্য বড় সতর্কবার্তা। কারণ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ইমেজ, খালেদা জিয়ার স্যাক্রিফাইস এবং তারেক রহমানের দেখানো স্বপ্নের প্রতি আস্থা রেখে মানুষ ভোট দিয়েছেন। সুতরাং ব্যক্তিগতভাবে কারও স্বার্থরক্ষা, চাঁদাবাজি বা অপকর্মের দায়ভার সরকার বা আমরা নেব না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর সময়োপযোগী ও কঠোর বার্তার পর জননিরাপত্তায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। এই কঠোর বার্তা যদি মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে দেশ থেকে অপরাধ সিন্ডিকেটগুলোর শিকড় দুর্বল হয়ে যাবে। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক যুগান্তরকে বলেন, অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো রাজনৈতিক প্রশ্রয় ও দলীয় পরিচয়ের আড়ালে দায়মুক্তি পাওয়ার সংস্কৃতি। ব্যতিক্রম হিসাবে যখন কোনো সরকার নিজ দলের প্রভাবশালী নেতা বা সংসদ-সদস্যকে ছাড় না দিয়ে আইনের মুখোমুখি করে, তখন অপরাধীদের কিছুটা হলেও ভয় তৈরি হয়। যদি দলীয় পরিচয় দূরে রেখে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার ধারা মাঠপর্যায়ে স্থায়ী রূপ নেয়, তবে তা শুধু চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের শিকড়ই দুর্বল করবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক অপরাধের হার উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দল কিংবা সরকারে পদ-পদবি রক্ষা করা সম্ভব হবে না। পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারের কঠোর ও নজিরবিহীন পদক্ষেপে পুলিশ প্রশাসনে স্বস্তি এসেছে। পুলিশ সদস্যদের মধ্যে এই বিশ্বাস শুরু হয়েছে যে, রাজনৈতিক কারণে অপকর্মকারীদের আর প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আরও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পাবে। দায়িত্বশীল এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রীর বার্তা তাদের কাজের গতি ও সাহস বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন কোনো রাজনৈতিক প্রভাবের তোয়াক্কা না করে অপরাধীদের গ্রেফতার করা সহজ হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, অপরাধী যেই হোক এবং যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। গোয়েন্দা নজরদারি যেমন বাড়ানো হয়েছে, তেমনি সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। এক্ষেত্রে কে কোন রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শে বিশ্বাসী সেটি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না।

গত কয়েক দিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি মিরপুরে রাড্ডা ক্লিনিক গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং ইসিবি চত্বরে নিউ গিনি প্রোপার্টিজে হামলার ঘটনায় সরকার কিছুটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়।

স্পেশাল অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশ যুগান্তরকে বলেন, সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও অস্ত্রধারীদের আস্তানাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। জনগণের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে এসআরবির পক্ষ থেকে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ যুগান্তরকে বলেন, অপরাধী যত প্রভাবশালী কিংবা যে দলেরই হোক না কেন, আমরা কাউকে ছাড় দিচ্ছি না। তাদের পালানোর পথ ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নগরবাসীর নিরাপত্তা রক্ষায় ডিএমপির চলমান অভিযান আরও জোরদার করা হবে বলে তিনি জানান।

উত্তরা পূর্ব থানার ওসি মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম যুগান্তরকে জানান, এলাকায় চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের তালিকা তৈরি করে অভিযান জোরদার করা হচ্ছে। শীর্ষ পর্যায় থেকে সুনির্দিষ্ট বার্তা পাওয়ায় অপরাধীরা এখন আত্মগোপনে চলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছি। অপরাধী যেই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে আমরা বদ্ধপরিকর।

এদিকে শুদ্ধি অভিযান ঘিরে বিএনপির ভেতরে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। নেতাকর্মীরা নিজেদের মধ্যে আলোচনায় বলাবলি করছেন, অন্যায় ও অপরাধ করে এখন আর পার পাওয়ার সুযোগ নেই। তারা একজন অন্যজনকে সতর্ক করে দিচ্ছেন। সরকারের গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন আরও বেশি সক্রিয় হয়ে উঠছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলের কথা স্মরণ করে দলের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা বলছেন, জিয়াউর রহমান নিজ দলের অপরাধীদের স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলতেন-‘হয় ভালো হয়ে যাও, না হয় জেলখানায় বা বিদেশে চলে যাও।’ দলের নীতিনির্ধারকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও তার বাবার পথ অনুসরণ করছেন। দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এমন কাউকেই তিনি বরদাশত করবেন না বলে দলের নীতিনির্ধারণী মহলে জানিয়ে দিয়েছেন।

বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা যুগান্তরকে বলেন, ‘আমাদের নেতা তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, দল ও সরকারের ভাবমূর্তি সবার আগে। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের নীতিতেই হাঁটছেন। দলের ভেতরে থাকা অপকর্মকারীদের ছেঁটে ফেলার ঘোষণা দিয়েছেন। ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘটনা তার জ্বলন্ত প্রমাণ। এতে সাধারণ মানুষ ও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের আস্থা বহুগুণ বেড়ে গেছে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

কমছে আয়, ঋণেই ভরসা

কমছে আয়, ঋণেই ভরসা

মিষ্টির পদত্যাগে সতর্কবার্তা আতঙ্কে চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীরা

আতঙ্কে চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীরা

বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এর সভা ব্যাংকক বৈঠকে চাওয়া হবে ৫০০ কোটি ডলারের ঋণ

ব্যাংকক বৈঠকে চাওয়া হবে ৫০০ কোটি ডলারের ঋণ

দখল-চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে সাইমনের ‘টর্চার সেল’

দখল-চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে সাইমনের ‘টর্চার সেল’

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম