মতিঝিল গুলিস্তান ফার্মগেট ও নিউমার্কেটে অভিযান
ঢাকঢোল পিটিয়ে উচ্ছেদ আবার দখল
ফুটপাত থেকে হকারদের উচ্ছেদ করাটা খুব কঠিন -অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক
Advertisement
রাজধানীর গুলিস্তানে অবৈধ হকার উচ্ছেদের পর আবারও রাস্তা দখল করে পসরা সাজিয়েছেন তারা। মঙ্গলবার তোলা -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদের কিছু দিন পর আবার সেখানে বসা নতুন কোনো ঘটনা নয়। অভিযান হয়, দোকানপাট সরিয়ে দেওয়া হয়। কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের জন্য পথচারীদের দখলে ফেরে ফুটপাত। আবার বসে দোকান, শুরু হয় বেচাকেনা ও চাঁদা তোলা। এভাবেই বছরের পর বছর চলছে উচ্ছেদ ও পুনর্দখলের ইঁদুর-বিড়াল খেলা। সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে হকার উচ্ছেদ নিয়ে তুলকালাম ঘটনা ঘটে। এর আগে এপ্রিলেও ঢাকঢোল পিটিয়ে রাজধানীর গুলিস্তান, বায়তুল মোকাররম, মতিঝিল, ফার্মগেট, নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকায় হকার উচ্ছেদ করা হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পর তারা আবার স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা এবং পুলিশ-প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ফের ফুটপাত দখল করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। সোমবার রাজধানীর ওই সব এলাকা ঘুরে ফুটপাত দখল করে হকারদের পুরোদমে ব্যবসা চালিয়ে যেতে দেখা গেল।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন-সিটি করপোরেশন ও পুলিশ প্রশাসনের এসব অভিযান স্রেফ লোক দেখানো। বিগত অভিযানের মতোই কিছুদিন যেতে না যেতেই মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এসব স্থানে বসানো হচ্ছে হকারদের। পাচ্ছেন ব্যবসা করার সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা। জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক যুগান্তরকে বলেন, রাষ্ট্র যখন সব নাগরিকের যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মের ব্যবস্থা করতে পারে না-তখন মানুষ যে কোনো উপায় অবলম্বন করে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করে। সেই উপার্জনের চেষ্টার কারণে আমাদের ফুটপাতগুলো হকারদের দখলে। এই ফুটপাত থেকে তাদের উচ্ছেদ করাটা খুব কঠিন। মিরপুরে ফুটপাত দখলমুক্তকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, সংঘাত ও দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। এরকম পরিবেশ সব জায়গায় তৈরি হবে। জোর করে হয়তো উচ্ছেদ সম্ভব হবে। কিন্তু ১৫ দিন পর আবার তারা বসবে। বিগত সময়ে এমন অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। তিনি বলেন, এটা চাপিয়ে দিলে হবে না। তাদের সঙ্গে আলোচনার মধ্যমে ঠিক করতে হবে। তাদের যথাযথ বা অর্থবহ আলোচনা ছাড়া উচ্ছেদ করতে গেলে এই ধরনের ধাওয়া-পালটাধাওয়ার প্রসঙ্গ তৈরি হবে। এখান থেকে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ার শঙ্কা থাকবে।
এদিন বেলা ১১টায় রাজধানীর গুলিস্তানে গিয়ে দেখা যায়, ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে দোকানপাট বসানো হয়েছে। চৌকিতে সাজানো পণ্যসামগ্রী। জামা, প্যান্ট, জুতাসহ নিত্য ব্যবহার্য পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন ক্রেতা। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি উপেক্ষা করেই দরদাম করছেন ক্রেতা। ফুটপাত দিয়ে হাঁটার উপায় না থাকায় প্রধান সড়ক ধরে হাঁটছেন পথচারীরা। গাড়ি চলাচলের জায়গা সরু হওয়ায় সৃষ্টি হয়েছে যানজটের ভোগান্তি। গোলাপশাহ মাজার চত্বর, পাতাল মার্কেট, ট্রেড সেন্টার, ফুলবাড়িয়া, রমনা মার্কেট ও বায়তুল মোকাররম সর্বত্রই একই চিত্র।
মতিঝিল শাপলা চত্বর থেকে পল্টন পর্যন্ত ফুটপাতে চলছে হকারদের হাঁকডাক, মৌচাকেও একই অবস্থা। মালিবাগ-মৌচাক পর্যন্ত ফুটপাতে এমনভাবে হকাররা দোকান বসিয়েছে, সেখানে কেনাবেচার সময় পথচারীদের হাঁটাচলার পথ সরু হওয়ায় বাধ্য হয়ে পথচারীদের প্রধান সড়ক ধরে হাঁটাচলা করতে দেখা গেল। দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়েই মানুষকে প্রধান সড়ক ধরে চলাচল করতে হচ্ছিল। দুপুর ১টার দিকে ফার্মগেট এলাকায়ও একই চিত্র দেখা গেল। আনন্দ সিনেমা হল ও তেজগাঁও কলেজের সামনের ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে চলছিল কেনাবেচা।
অথচ ডাকঢোল পিটিয়ে ঢাকা সিটি করপোরেশন ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের উদ্যোগে এপ্রিলে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় হকারদের বসার চৌকি, শামিয়ানা ও পণ্যসামগ্রী। এ সময় হকারদের স্থাপনা ভাঙচুর, গ্রেফতার, অর্থদণ্ড ও মালামাল জব্দসহ গ্রেফতারও করা হয়। রাস্তার পাশে অবৈধভাবে পার্কিং করে রাখা প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে দেওয়া হয় মামলা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারের কঠোর অবস্থানে ফুটপাত ছেড়ে দেয় হকাররা। পরে তাদের পুনর্বাসনে সরকারের তরফ থেকে ‘হলিডে এবং নাইট মার্কেট’ বসানোর পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। কিন্তু ২০ দিন না যেতেই সেই পুরোনো চেহারায় ফিরে ওই সব এলাকার ফুটপাত।
গুলিস্তানে কথা হয় হকার জসিম উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমরা জন্মগতভাবে হকার নই। পেটের দায়ে আমরা হকার। আমাদের সংসার-পরিবার আছে। সরকার আমাদের জন্য বিকল্প কিছু তৈরি করে না। অথচ বারবার আমাদের আঘাত করে। আমরা তো এই দেশের মানুষ। আমরা রাস্তায় বসি পয়সার বিনিময়ে। চাঁদাবাজদের নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনের এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমার ছোট একটা দোকান। এই দোকান থেকে লাইনের নামে প্রতিদিন ৫০ টাকা নেওয়া হয়। টাকা না দিলে ব্যবসা বন্ধ। বসতে দেয় না। দোকান খুলতে দেয় না।
আব্দুল রশিদ নামের এক হকার বলেন, উচ্ছেদ হয় নামে। প্রভাবশালীরা ফুটপাতের চাঁদা নিয়ন্ত্রণে নিতে উচ্ছেদের নামে কিছুদিন হয়রানি করে। কিছুদিন পর সব ঠিক হয়ে যায়। আরেক হকার ইয়াসিন বলেন, মিরপুরে হকারদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। সেখানে আর ফুটপাতে ও রাস্তায় দোকান বসতে দেওয়া হচ্ছে না। আমাদের এখানে কবে যে অভিযান শুরু হবে, তা নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে রয়েছি। ইতোমধ্যে রাস্তায় না বসতে সিটি করপোরেশন থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রশাসক মাঝেমধ্যেই আসছেন। সব মিলে আতঙ্ক রয়েছে।

