বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন
নতুন করে দরিদ্র ২১ লাখ মানুষ
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সংকট, কম রাজস্ব আদায় ও বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত সংস্কার না হলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে আটকে থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তবে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি এবং সরকারের সংস্কার কার্যক্রম গতি পেলে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে। মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের প্রকাশিত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমছে। দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার সঙ্গে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিনিয়োগ কমেছে, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির গতি হারিয়েছে এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। একই সময়ে ব্যবসার পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে।
অর্থনীতির এই দুর্বলতার বড় প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্যে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। একই সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে এবং বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থান কমেছে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেন, অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার প্রয়োজন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা এবং নতুন ও ভালো কর্মসংস্থান তৈরির জন্য এসব সংস্কার জরুরি।
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের জুনে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এই অনুপাত ছিল ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ। খেলাপি ঋণের এই উচ্চহার ঋণ বিতরণ ব্যবস্থা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
রাজস্ব আহরণের দুর্বলতাও বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় সমস্যা বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। ২০২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ, যা বিশ্বের অন্যতম সর্বনিু। একই সময়ে বাজেট ঘাটতিও বেড়েছে। ২০২৫ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি ছিল জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠেছে। এতে সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়ছে।
জ্বালানি সংকটও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানোর পথে বড় বাধা হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। অর্থনৈতিক দুর্বলতার প্রভাব পড়েছে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপরও। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করলেও সুবিধাভোগী নির্বাচনের পদ্ধতি আরও উন্নত করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। এ ক্ষেত্রে সরকারের ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একাধিক খাদ্যভিত্তিক ভর্তুকি কর্মসূচিকে একীভূত করা এবং ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচির আরও ভালো সমন্বয় করা গেলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব।
তবে সব প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশের বৈদেশিক খাত কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখিয়েছে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতির কারণে বহিঃখাত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, এখন বাংলাদেশের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দ্রুত দূর করা। সংস্কার কার্যক্রম গতি পেলে অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধারের সুযোগ রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি এবং সরকারের সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে গেলে ২০২৮ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে।
অন্যদিকে একই দিনে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে তা কিছুটা কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নামতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশকে নতুন প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসাবে কাজে লাগাতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে দক্ষতা, অবকাঠামো ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
