ষড়যন্ত্রে লিপ্ত সেই দুই সেনা কর্মকর্তা রিমান্ডে
সাবেক সেনাপ্রধান আজিজসহ আ.লীগের সঙ্গে যোগাযোগ
Advertisement
যুযগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন-অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেবাশীষ কুমার বড়ুয়া (৪৭) এবং লেফটেন্যান্ট কাজী গুলশান আরা (৪৩)। রোববার দিবাগত রাত ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত পরিচালিত বিশেষ অভিযানে রাজধানীর পল্লবী ও বনানী ডিওএইচএস এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্লবী থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা হয়েছে। এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গ্রেফতার দুই সেনা কর্মকর্তাকে ৪ দিনের জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন আদালত। সোমবার শুনানি শেষে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিদারুল আলম এ আদেশ দেন। এদিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের ইন্সপেক্টর শেখ বশির আহমেদ তাদের ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত আদেশ দেন।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শাফিকুল ইসলাম জানান, এ দুই আসামির বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাষ্ট্রবিরোধী উসকানিমূলক অপপ্রচার চালানো এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার তথ্য-উপাত্ত মিলেছে।
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, রাষ্ট্রবিরোধী এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে আর কারা কারা যুক্ত রয়েছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের প্রচারণার নেপথ্যে অন্য কোনো ইন্ধন রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রিমান্ড আবেদনে যা বলা হয় : গ্রেফতার দুই অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ও তাদের সহযোগীরা নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা, তহবিল সংগ্রহ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারের সঙ্গে জড়িত মর্মে উল্লেখ করা হয় রিমান্ড আবেদনে। এতে বলা হয়, আসামিরা বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ফেসবুক পেজ ব্যবহার করে সরকারবিরোধী প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা চালান। এছাড়া অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পলাতক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন।
আবেদনে আরও বলা হয়, আসামিরা ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর থেকে ২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর পর্যন্ত তারা তাদের দোসরদের নিয়ে সরকার ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং কুৎসামূলক প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন। তাদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এছাড়া মামলার অন্য আসামিদের শনাক্ত ও তাদের অবস্থান নির্ণয়, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল আলামত উদ্ধার, আসামিদের পরিচালিত অন্য ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজের তথ্য সংগ্রহ এবং মামলার মূল রহস্য উদঘাটনের জন্য তাদের সাত দিনের পুলিশ রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়। রিমান্ড শুনানিতে দেবাশীষ কুমার বড়ুয়ার পক্ষে অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মনসুর রিপন রিমান্ড বাতিল করে জামিন শুনানিতে বলেন, দেশে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি হয়, দেশ ডেসট্রো হয় এমন একটা শব্দ তার বিরুদ্ধে নেই। তিনি কি ঘটনাস্থলে ছিলেন, সেখানে থেকে জেনে-শুনে দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য সন্ত্রাসী কাজ করার কিছু করেছেন? রিমান্ড বাতিল করে তার জামিন প্রার্থনা করছি।
গুলশান আরার পক্ষে অ্যাডভোকেট মশিউর রহমান রিমান্ড বাতিল করে জামিন চেয়ে বলেন, তার মক্কেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, আর্মি অফিসারদের সঙ্গে যোগাযোগ। এটা তো থাকতেই পারে। কারণ তিনি সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছেন। এটা তো দোষের কিছু নয়। ফেসবুক পেজ খোলা, কনটেন্ট তৈরি করা কোনো অপরাধ নয়।
রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর হারুন-অর-রশীদ রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, দুই আসামি সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করছে। আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসিত করতে তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। দেশি-বিদেশি গুপ্তচরদের সঙ্গে যোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ বিষয় গুপ্তচরদের কাছে পাচার করছে। তাদের রিমান্ডে দিলে রাষ্ট্রদ্রোহিতার সঙ্গে কারা জড়িত, দেশি-বিদেশি কোন কোন গুপ্তচরদের যোগাযোগ তাদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করা সম্ভব হবে। তাদের সর্বোচ্চ রিমান্ড প্রার্থনা করছি।
ডিএমপি মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. আকতার হোসেন জানান, গ্রেফতার হওয়া সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে ডিবির নজরদারিতে ছিলেন। প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করে আসছিলেন। শুধু অপপ্রচারই নয়, তারা দেশের বর্তমান পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ রক্ষা করছিলেন। সাইবার অপরাধের মাধ্যমে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়ার পরই তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
