সাড়ে ৪ ঘণ্টায় ১৩ স্থান পরিদর্শন
এমন প্রধানমন্ত্রীই চান জনগণ
হাসপাতালের অব্যবস্থাপনায় ক্ষুব্ধ, কোয়ার্টার পরিষ্কারে ২ সপ্তাহের সময় * চিকিৎসক সাময়িক বরখাস্ত, ফুটপাত ও নাগরিক সেবায় সরাসরি নজরদারি * পরিচ্ছন্ন নগরী গড়তে প্রশাসনের পাশাপাশি সবাইকে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান * প্রধানমন্ত্রী নিজে রাস্তায় নেমে আসবেন, তা কল্পনাও করিনি : মিরপুরে পথচারী
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শনিবার ঢাকায় কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল পরিদর্শনে -পিআইডি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সরকারি দপ্তরের প্রতিবেদন নয়, এবার সরেজমিন নিজেই দেখলেন নাগরিক সমস্যার চিত্র। কোথাও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। কোথাও সমস্যা সমাধানে বেঁধে দিলেন সময়। আবার কোথাও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিলেন। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি আবাসিক এলাকা থেকে শুরু করে হকারমুক্ত ফুটপাত-সবখানেই ছিল তার নজর। শনিবার মাত্র সাড়ে ৪ ঘণ্টায় রাজধানীর ১৩টি স্থানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আকস্মিক পরিদর্শনে ফুটে উঠেছে জনমুখী নেতৃত্বের প্রত্যাশিত চিত্র।
এদিন প্রধানমন্ত্রী কথা বলেন হাসপাতালের রোগী ও তাদের স্বজন, চিকিৎসক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাধারণ পথচারীদের সঙ্গে। নাগরিক সেবার ঘাটতি নিজের চোখে দেখে সংশ্লিষ্টদের দেন প্রয়োজনীয় নির্দেশনা। একই সঙ্গে তিনি পরিচ্ছন্ন ও সবুজ বাংলাদেশ গড়তে নাগরিকদেরও দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানান।
আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে এক চিকিৎসককে নিজের কক্ষে ধূমপান করতে দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সরকারপ্রধান। এ ঘটনায় তিনি তাৎক্ষণিক সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। উত্তরার কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থার উন্নয়নে কর্তৃপক্ষকে ৭ দিনের সময় বেঁধে দেন প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে আজিমপুর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কোয়ার্টারের অপরিচ্ছন্নতা দেখে পুরো এলাকা পরিষ্কার করতে বেঁধে দেন ২ সপ্তাহ। বাসিন্দাদের অভিযোগ শুনে আবাসিক এলাকার নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়নেরও নির্দেশ দেন। মিরপুর-১০ নম্বরে হকারমুক্ত ফুটপাতের পরিস্থিতিও তিনি ঘুরে দেখেন। পথচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানতে চান, ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় চলাচলে কতটা সুবিধা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই মাঠপর্যায়ের তৎপরতা নিয়ে সাধারণ মানুষ ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, এমন প্রধানমন্ত্রীই চান। তাদের মতে, জনগণের সমস্যা জানতে এবং সমাধানের উদ্যোগ নিতে সরকারপ্রধানের সরাসরি মাঠে আসা জরুরি। তবে এই উদ্যোগের সুফল কতটা স্থায়ী হয়, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কার্যকর পদক্ষেপ ও নিয়মিত তদারকির ওপর।
ইমেরিটাস অধ্যাপক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী মনে করেন, রাজধানীর পরিচ্ছন্নতা, জনস্বাস্থ্য ও নাগরিক সেবার মান উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্তরিক। জনগণের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়তে সরকারের উদ্যোগে মানুষের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ভালোবাসার প্রতিফলন ঘটছে। তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গ্রামবাংলার পথে-ঘাটে হেঁটে মানুষের কাছে যেতেন। তাদের সুখ-দুঃখের কথা শুনতেন। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতেন। তারেক রহমান এখন যে উদ্যোগ নিচ্ছেন, সেটিও জনগণের প্রত্যাশার জায়গা।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর অভিভাবক মো. আলাউদ্দিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী হঠাৎ হাসপাতালে আসেন। আগে থেকে কেউ বুঝতে পারেননি। কোনো ধরনের প্রটোকল ছাড়াই তিনি রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন। চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। বিগত সরকারের আমলে এমন দৃশ্য কখনো দেখেননি।
মিরপুর-১০ নম্বরে এক পথচারী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজে রাস্তায় নেমে আসবেন, তা কল্পনাও করিনি। তিনি সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেছেন। তাদের প্রত্যাশার কথাও শুনেছেন। প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব হাসান শিপলু ও সহকারী প্রেস সচিব একেএম নাজমুল হক পরিদর্শনের বিভিন্ন তথ্য জানান।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানায়, শনিবার সকালে রাজধানীর গুলশানের বাসা থেকে বেরিয়ে প্রথমে উত্তরার কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে যান তারেক রহমান। সেখানে চিকিৎসাধীন রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন। হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র (আইসিইউ), অস্ত্রোপচারকক্ষসহ বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখেন। সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতার পরিস্থিতি দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। ৭ দিনের মধ্যে পরিবেশের উন্নতি নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। এরপর রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে যান প্রধানমন্ত্রী। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) ও স্কাউট সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন।
পরে তিনি মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ, পাইকপাড়া স্টাফ কোয়ার্টার ও সরকারি বাংলা কলেজ পরিদর্শন করেন। এরপর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল ঘুরে দেখেন। মোহাম্মদপুরে নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজেও যান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ সুরক্ষা ও বৃক্ষরোপণে তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। এরপর তিনি ধানমন্ডি সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়, কলাবাগান স্টাফ কোয়ার্টার ও আজিমপুর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কোয়ার্টার পরিদর্শন করেন। সবশেষে মিরপুর-১০ নম্বরে হকারমুক্ত ফুটপাতের পরিস্থিতি সরেজমিন দেখেন।
এদিকে, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট পরিদর্শনের সময় সহযোগী অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলামের কক্ষে গিয়ে তাকে ধূমপান করতে দেখেন প্রধানমন্ত্রী। কক্ষের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশও তার নজরে আসে। হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে একজন চিকিৎসকের এমন আচরণে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব একেএম নাজমুল হক জানান, এ ঘটনায় হাসপাতালের পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. একেএম আজিজুল হককে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। পরে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
এছাড়া পরিদর্শনের বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। ডেঙ্গু প্রতিরোধ, বায়ুদূষণ মোকাবিলা ও নগরীর পরিবেশ উন্নয়নে তরুণদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি। রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় প্রতিরোধ। এজন্য চারপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। এ কাজে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা চান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা বিশাল জনবহুল শহর। সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নিয়মিত কাজ করলেও তাদের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই শুধু সিটি করপোরেশন বা প্রশাসনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। নাগরিকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে।
ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপকালে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টানেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, তরুণদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব, তা ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। তবে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। দেশ পুনর্গঠন ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার কাজেও তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ‘তোমরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তোমাদের কাছে আমার দুটি আবেদন-দেশকে পরিষ্কার রাখবে এবং বেশি বেশি গাছ লাগাবে। এটা তোমাদেরই দেশ, এর দায়িত্বও তোমাদের।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বিপুলসংখ্যক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়লে সবাইকে চিকিৎসা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও ওষুধের ব্যবস্থা করা কঠিন হবে। তাই মানুষকে সুস্থ রাখতে পরিবেশ পরিষ্কার রাখা জরুরি।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে কোথাও যেন পানি জমে না থাকে, সেদিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। রাস্তা, খাল, নদী ও জলাশয়ে ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে বলেন। ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানোর ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
বৃক্ষরোপণে অতীত উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে প্রতিষ্ঠিত একটি সংগঠনের মাধ্যমে ২০০৪-০৫ সালের দিকে শুধু ঢাকা শহরেই প্রায় ৮০ হাজার নিমগাছের চারা রোপণ করা হয়েছিল। এবার তিনি শিক্ষার্থীদের আরও বেশি গাছ লাগানোর আহ্বান জানান। আজিমপুর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কোয়ার্টার পরিদর্শনকালে এলাকার অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে প্রধানমন্ত্রী অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি পরিচ্ছন্নতার ঘাটতির কারণ জানতে চান। পুরো এলাকা পরিষ্কার করে বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে ২ সপ্তাহের সময় দেন। এ সময় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম উপস্থিত ছিলেন।
মিরপুর-১০ নম্বরে হকারমুক্ত ফুটপাত পরিদর্শনকালে পথচারীদের সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদের পর তাদের চলাচলে কতটা সুবিধা হয়েছে, তা জানতে চান। পাশাপাশি নগরীর ফুটপাত ও সড়ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো ভোগান্তি হচ্ছে কিনা, সে বিষয়েও খোঁজ নেন। পথচারীদের স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল নিশ্চিত করতে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশনা দেন তিনি। এ সময় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
