কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুন
পর্যটকদের বাঁচানোর প্রচেষ্টা নিয়ে প্রশ্ন
Advertisement
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর সময়মতো সতর্ক করা হলে হয়তো প্রাণে বাঁচতে পারতেন উখিয়ার ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে থাকা ১০ পর্যটক। কিন্তু আগুন লাগার পর তাদের সতর্ক করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আগুনের তীব্রতা বাড়লে রিসোর্টের মালিক তানভীর সুলতান মিয়া পোষা কুকুরসহ ১৯ কর্মচারীকে নিয়ে বেরিয়ে যান। তখনও ভেতরে পর্যটকরা ছিলেন বলে জানা গেছে। ১০ পর্যটকের মৃত্যুর পর তাদের উদ্ধারে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা, অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন না থাকার বিষয়গুলো সামনে এসেছে।
শনিবার সকালে উখিয়ার ইনানী এলাকার পাটুয়ারটেকের টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। এতে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় পুলিশ মামলা করেছে। রিসোর্টের মালিক, অংশীদার ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ আনা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে রিসোর্টের ব্যবস্থাপক জাহিদুল ইসলাম ওরফে সুমনকে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করেছে পুলিশ। প্রধান আসামি তানভীর সুলতান মিয়াসহ অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। স্থানীয় বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম ও মো. কায়সার জানান, আগুন লাগার পর রিসোর্টের কর্মীরা প্রথমে পানি দিয়ে তা নেভানোর চেষ্টা করেন। পরে আগুনের তীব্রতা বাড়লে মালিক তানভীর সুলতান মিয়া কর্মচারীদের সঙ্গে পোষা কুকুর নিয়ে বেরিয়ে যান। তখনও রিসোর্টের ভেতরে পর্যটকরা ছিলেন বলে দাবি তাদের। কেউ কেউ মনে করছেন, আগুন লাগার পরপরই পর্যটকদের সতর্ক করে কক্ষ থেকে বের করে আনার উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হতো। কারও কারও দাবি, পর্যটকরা গভীর ঘুমে থাকায় ডাকাডাকিতে সাড়া দেননি। ফলে তাদের কখন সতর্ক করা হয়েছিল, উদ্ধারে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং কর্মীরা কখন রিসোর্ট ছেড়েছিলেন-এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
মালিকসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা : রিসোর্টে আগুনের ঘটনায় শনিবার রাতে পুলিশ মামলা করেছে। মামলায় রিসোর্টের মালিক তানভীর আহমদ ও অংশীদার নেওয়াজ মোরশেদসহ ১৯ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাদের মধ্যে রিসোর্টের ব্যবস্থাপক জাহিদুল ইসলাম ওরফে সুমনও রয়েছেন। তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, রিসোর্টের মালিক, অংশীদার ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ আনা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যবস্থাপককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করা হয়েছে। তদন্তে কারও গাফিলতির প্রমাণ মিললে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তদন্ত কমিটি গঠিত, ঘটনাস্থল পরিদর্শন
অগ্নিকাণ্ডের কারণ, পর্যটকদের উদ্ধারে গাফিলতি এবং রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে রোববার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জেলা প্রশাসনের গঠিত সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি। সদস্যরা পুড়ে যাওয়া স্থাপনা ঘুরে দেখেন এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেন।
কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান বলেন, আগুন লাগার কারণ, প্রাণহানির ঘটনায় রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি, প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ও নথিপত্র এবং ভবনের অবকাঠামোগত সমস্যা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, প্রতিবেদন দিতে পাঁচ কার্যদিবসের বেশি সময়ও লাগতে পারে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কউক ও ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন ছিল না : রিসোর্ট নির্মাণে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) অনুমোদন নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। কউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন বলেন, রিসোর্টটির বৈধ অনুমোদন ছিল না। এ বিষয়ে আগে নোটিশ দেওয়া হলেও তা তোয়াক্কা না করে মালিকপক্ষ কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন বলেন, রিসোর্টটির ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন ছিল না। সেখানে অগ্নিনির্বাপণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও ছিল না।
মর্গে ১০ মরদেহ, পরিচয় নিশ্চিত হতে লাগবে দুই সপ্তাহ : অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা মরদেহগুলোর নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হবে। পরীক্ষার ফল পেতে কমপক্ষে দুই সপ্তাহ লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল।
নিহত ১০ জনের মধ্যে ছয়জনের প্রাথমিক পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। তারা হলেন-ঢাকা বনশ্রীর ইসরাত জাহান (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সি ফায়িজান আহম্মেদ। তবে লাশ পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়ায় কোনটি কার লাশ তা শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষা করা হচ্ছে।
বাকি চারজন যশোরের মণিরামপুরের নাহিদুর রহমান তুহিন, তার স্ত্রী আফসানা ও তাদের দুই সন্তান বলে ধারণা করছেন স্বজনরা। তাদের কয়েকজন স্বজন ইতোমধ্যে কক্সবাজারে পৌঁছেছেন।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল বলেন, কক্সবাজারের সিআইডি দল লাশগুলোর নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠাবে। নিহতদের স্বজনরাও নমুনা দিতে ঢাকায় সিআইডি সদর দপ্তরে গেছেন। পরীক্ষার ফল না পাওয়া পর্যন্ত লাশ মর্গে রাখা হবে। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। আগুনে ছয়জন দগ্ধ হন। তাদের চারজনকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। কক্সবাজারের সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, ডিএনএ পরীক্ষার জন্য কক্সবাজারের হাসপাতালগুলোতে নমুনা সংগ্রহ করা হবে। প্রয়োজনে ঢাকা থেকে সিআইডির বিশেষজ্ঞ দল এনে কক্সবাজারে ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। শনিবার রিসোর্টটিতে অগ্নিকাণ্ডের পর সাত ঘণ্টা উদ্ধার অভিযান চালায় ফায়ার সার্ভিস। দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে ১০টি পুড়ে যাওয়া বিকৃত লাশ উদ্ধার করা হয়।
