জ্বালানি অনিশ্চয়তা ও ঋণের উচ্চ সুদসহ নানা কারণ
বিনিয়োগের ইঞ্জিন থমকে আছে
Advertisement
মনির হোসেন
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কোনো সুখবর নেই। বিনিয়োগ নিয়ে চারদিকে হাহাকার আর অনিশ্চয়তার কালো ছায়া। কোনো সূচকই ইতিবাচক নয়। এক কথায় থমকে আছে বিনিয়োগের ইঞ্জিন। নতুন কারখানা স্থাপন তো দূরের কথা, পুরোনো কারখানা টিকিয়ে রাখতে যুদ্ধ করছেন ব্যবসায়ীরা। স্থবির হয়ে পড়েছে নতুন কর্মসংস্থানের পথ। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি তলানিতে, ব্যাংকে টাকার পাহাড় থাকলেও উদ্যোক্তারা ঋণ নিচ্ছেন না। জ্বালানির ঘোর সংকট, ঋণের মাত্রাতিরিক্ত সুদ আর নীতিগত দোলাচলের চোরাবালিতে আটকে গেছে দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি বিনিয়োগ। এই বন্ধ্যাত্ব কাটাতে না পারলে সামনে খারাপ দিন অপেক্ষা করছে। ইতোমধ্যে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হচ্ছে চাপ। এ কারণে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের রিপোর্টে বলেছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসবে।
এদিকে বিনিয়োগে বাংলাদেশের চেয়ে প্রতিযোগী দেশগুলো অনেক এগিয়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই দুরবস্থার পেছনে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি কারণ রয়েছে। এগুলো হলো-জ্বালানি অনিশ্চয়তা, অর্থনীতিতে দুর্বল চাহিদা, ঋণের উচ্চ সুদ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা। এই অবস্থায় উদ্যোক্তাদের আস্থা বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যবসায়ীদের মতে, জ্বালানি সমস্যা না কাটলে বিনিয়োগ বাড়বে না।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে বিনিয়োগে চরম মন্দা চলছে। এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়েছে। অর্থনীতি এখন খাদের কিনারায়। তিনি বলেন, বক্তৃতা-বিবৃতিতে অনেক কথা বলা যায়। কিন্তু দেশের বিদ্যমান বাস্তবতা মানতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে স্থবির অর্থনীতি। বাজেটে সবচেয়ে বড় ব্যয় ঋণের সুদ পরিশোধ। পুঁজি সংগ্রহের খাতগুলো নষ্ট হয়েছে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীরা ভরসা পাচ্ছে না। এটি যে কোনো দেশের অর্থনীতির জন্য অস্বাভাবিক। এ অবস্থা চলতে থাকলে মহামুশকিলে পড়বে বাংলাদেশ।
এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, এ অবস্থায় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো সবচেয়ে জরুরি। তবে সরকারের বিদ্যমান নীতি-কাঠামো বজায় থাকলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে না। এটি একেবারে পরিষ্কার বিষয়। তিনি বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সরকারকে নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। প্রথমত বর্তমানে শিল্প ঋণের সুদের হার খুব বেশি। এই হারে সুদ দিয়ে মুনাফা সম্ভব নয়। ফলে মানুষ কেন বিনিয়োগ করবে? এছাড়াও সাধারণ মানুষের হাতে টাকা নেই। আর এই অবস্থা বহাল থাকলে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হবেন না, এটিই স্বাভাবিক। অবস্থার উত্তরণে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। সহজভাবে বললে সরকার নিজেই বিনিয়োগে নেতৃত্ব দেবে।
এদিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্স সেন্টারের (পিপিআরসি) প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের অর্থনীতি তিনটি কাঠামোগত ফাঁদে পড়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বিনিয়োগে স্থবিরতা। এ কারণে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। কর্মসংস্থানে বাড়ছে অনিশ্চয়তা। সংগঠনটির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বিনিয়োগের স্থবিরতার কথা স্বীকার করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, একদিকে মানুষের ঋণের বোঝা বাড়ছে। অন্যদিকে বিনিয়োগ হচ্ছে না। এর জন্য অর্থের সংকট নয়; বরং আস্থার সংকটই প্রধানত দায়ী। সংস্থাটির জরিপে উঠে আসা অন্য দুটি ফাঁদ হলো-পরিবারের আর্থিক দুর্দশা বাড়ছে এবং রাজনৈতিক-প্রশাসনিক শাসনব্যবস্থার ফাঁদ। পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এই তিন ফাঁদ অর্থনীতিকে গভীর সংকটে ফেলেছে। পিপিআরসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিন কোটি ১০ লাখ মানুষ এখন ‘ভঙ্গুর মধ্যবিত্ত’। দারিদ্র্যসীমার উপরে থাকলেও এই শ্রেণির মানুষদের ব্যয় করার সক্ষমতা কম। তাদের অর্ধেকের বেশি পরিবারের ঋণ সঞ্চয়ের চেয়ে বেশি।
এদিকে বছরের শুরুতে আইএমএফ বলেছিল, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। তিন মাস পর জুলাইয়ে তা কমিয়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশের কথা বলেছিল। সম্প্রতি দেওয়া পূর্বাভাসে তা আরও কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশের কথা বলা হয়েছে। এর মানে হলো ক্রমেই বাংলাদেশের অর্থনীতি নিম্নমুখী হচ্ছে। এর মূল কারণ দেশে বিনিয়োগ নেই। এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, পুরোনো কারখানা চালু করতে সরকার ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। কিন্তু সেখানে কঠিন শর্ত দেওয়া হয়েছে। ওই শর্ত মেনে ব্যবসায়ীরা ঋণ নিচ্ছেন না। ফলে এ পর্যন্ত মাত্র ছয় হাজার কোটি টাকা বিতরণ হয়েছে।
নতুন শিল্পের অন্যতম আগাম সংকেত মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি। চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ৫০ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৭৫ কোটি ৭ লাখ ডলার। এ হিসাবে কমেছে ৩২.৫ শতাংশ। একইভাবে ঋণের চাহিদাও নিস্তেজ। তবে এ সময়ে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ১৯ শতাংশ বেড়েছে। আবার ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ। একই সময়ে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ। চলতি বছরে আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। আগের বছরের আগস্টে ছিল ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ। টানা ছয় মাস প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২২.৪৮ শতাংশে নেমেছে। আগের বছর ছিল ২৩.৯৬ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ২৪.১৮ শতাংশ। অর্থাৎ ক্রমেই বেসরকারি বিনিয়োগ কমে আসছে।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, দেশে বিনিয়োগ নেই, জ্বালানি সংকট এবং বিশ্ব অর্থনীতি খারাপ অবস্থায় রয়েছে। সবাই এটি স্বীকারও করছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য বহুমুখী চেষ্টা চলছে। সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। বন্ধ কারখানা চালু করার জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল ঘোষণা করেছে। জ্বালানি সংকট কাটানোর চেষ্টা চলছে। বিকল্প উপায়ে কীভাবে জ্বালানি আনা যায় সে ব্যাপারেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আশা করছি সরকার ও বেসরকারি খাতসহ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) অবস্থা খারাপ। বর্তমানে জিডিপির তুলনায় এফডিআই মাত্র দশমিক ৪৫ শতাংশ। ইনভেস্ট বাংলাদেশের তথ্য অনুসারে চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ১২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেড়েছে। নতুন বিনিয়োগ ৫ শতাংশ কমেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশে নিট এফডিআই এসেছে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। এর মধ্যে ২৬ কোটি ৯ লাখ ডলারই এসেছে কোম্পানিগুলোর মুনাফা থেকে। এ সময়ে নিট ইক্যুইটি বিনিয়োগ হয়েছে সাত কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ কম। এর মানে হলো বাংলাদেশে যেসব কোম্পানি ব্যবসা করছে, তাদের মুনাফার টাকা পুনঃবিনিয়োগ হলেও নতুন বিনিয়োগ আসছে না। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ রিপোর্টকে অনেক গুরুত্ব দেয়। এই রিপোর্টের মূল কথা হলো সহজে ব্যবসা করার সূচক। বর্তমানে ১৯০টি দেশের মধ্যে এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৮তম। অর্থাৎ এখানে চাইলে সহজে ব্যবসা করা যায় না। এই রিপোর্টে বাংলাদেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে ছোট বড় ১৭টি প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে সবার আগে সামনে এসেছে দুর্নীতি। এছাড়াও উল্লেখযোগ্য হলো-প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি ও ঋণের উচ্চ সুদ; এরপরও পুঁজি মিলছে না। এছাড়া বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। কিন্তু এর কোনো সমস্যারই সমাধান হয়নি। বাংলাদেশের জন্য এটি অনেক পুরোনো গল্প। তবে সরকার এ অবস্থার পরিবর্তনের কথা বলছে। আর আগামী কয়েক বছরে জিডিপির ২.৭ শতাংশ এফডিআই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
প্রতিযোগীরা এগিয়ে : ভিয়েতনামে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে নন-স্টেট বিনিয়োগ বেড়েছে ১২.৮ শতাংশ। এফডিআইয়ের অর্থ ছাড় বেড়েছে ১১.২ শতাংশ। হয়েছে ১৩.০৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে নতুন নিবন্ধিত এফডিআই দাঁড়িয়েছে ৪০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি ৫৫.৪ শতাংশ। কম্বোডিয়ায় ২০২৫ সালে ৬৩০টি বিনিয়োগ প্রকল্পে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ অনুমোদিত হয়েছে। প্রকল্প বেড়েছে ৫২ শতাংশ, বিনিয়োগ ৪৫ শতাংশ। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে আরও ২৭৬টি প্রকল্পে প্রায় ৪.৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ নিবন্ধিত হয়েছে। বাংলাদেশে ২০২৫ সালের নিট এফডিআই ১.৭৭ বিলিয়ন ডলার, প্রবৃদ্ধি ৩৯.৩৬ শতাংশ। তবে নতুন ইক্যুইটি মূলধন বেড়েছে মাত্র ১.৮৪ শতাংশ। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফরে এক বৈঠকে ‘ওয়াল স্ট্রিটের’ ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এদিকে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে বিনিয়োগ বাড়াতে নানা পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই বৈশ্বিক সংকট সামনে আসে। এবারের বাজেটেও ইশতেহারের প্রতিফলন আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ৫০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিএনপি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতি ১ ট্রিলিয়ন ডলার বা এক হাজার বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটেও এই লক্ষ্য সামনে এনে বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রতি বছর গড়ে ৯ শতাংশের বেশি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সেটি একেবারে অসম্ভব। বিদায়ি বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে তা সাড়ে ৬ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নেও জিডিপির ২৫ শতাংশের উপরে বেসরকারি বিনিয়োগ দরকার।
