Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

সব অপকর্মই চলত নির্বিঘ্নে

উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার বাড়ি বলে কথা!

আয়োজকরা ডিআইজির বাড়ি উল্লেখ করে অনলাইনে ডিজে পার্টির টিকিট বিক্রি করতেন। অভয় দিতেন-এখানে পুলিশ রেইড হবে না * ৫০ গজের মধ্যে ছিল পুলিশ ফাঁড়ি, তবু নির্বিকার সবাই * ‘সিনিয়র স্যাররা দেখেন, আমাদের কিছুই করার নেই’

Advertisement

ইমন রহমান

ইমন রহমান

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার বাড়ি বলে কথা!

রাজধানীর পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি-১ এ অসামাজিক কার্যক্রম চলা পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের বাড়ি ‘গোল্ডেন সানরাইজ’। অদূরেই রয়েছে খিলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ি ভবন (ইনসেটে) -যুগান্তর

Advertisement

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের যে বাড়িতে অসামাজিক কার্যক্রম চলে আসছিল, এর ৫০ গজের মধ্যেই রয়েছে খিলক্ষেত থানার পুলিশ ফাঁড়ি। ৩০০ ফিট সড়কসংলগ্ন পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি (পিওএইচএস)-১-এ অবস্থিত ‘গোল্ডেন সানরাইজ’ নামের বিতর্কিত বাড়িটির সামনে দিয়ে সারাক্ষণ পুলিশের যাতায়াত। সবার চোখের সামনেই দিনের পর দিন সেখানে সংঘটিত হয়েছে অসামাজিক সব কর্মকাণ্ড। এয়ারবিএনবি ও ট্রাভেলা নামের অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ভাড়া নিয়ে উঠতি বয়সের নারী-পুরুষরা অসামাজিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল বাড়িটিতে। গভীর রাতে মাদকসেবন করে চলত অর্ধনগ্ন নৃত্য। উচ্চৈঃস্বরে মিউজিক বাজিয়ে ডিজে পার্টি করা হতো। তবে পুলিশের একজন অতিরিক্ত ডিআইজির বাড়ি বলে কথা! রেইড দেওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই-এমন প্রচারণাও চালানো হতো। ফলে সমাজের উচ্চবিত্ত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সন্তানরাই ছিল মূলত এসব পার্টির কাস্টমার। সোমবার রাতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ অভিযান চালিয়ে ওই বাড়ি থেকে গাঁজা, ইয়াবা, মদ, মাদক গ্রহণের সামগ্রী, কন্ডোমসহ ৮৫ জনকে আটক করে। পরে তাদের ডিএমপি অধ্যাদেশের অধীনে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

আটক ব্যক্তিদের ডিএমপির সামারি কোর্টের মাধ্যমে ছেলেদের এক মাসের কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাদের আরও ১৫ দিন কারাভোগের আদেশ দেওয়া হয়েছে। মেয়েদের ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাদের আরও তিনদিন কারাভোগের আদেশ দেওয়া হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছে পুলিশের এক কর্মকর্তার দুই মেয়ে, উচ্চপদস্থ আমলার দুই মেয়ে, সাবেক সেনা অফিসারের ছেলে, কর্মরত সেনা অফিসারের মেয়ে, ব্যাংকার এবং বিভিন্ন ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর সন্তান। ভুয়া জন্মদিনের অনুষ্ঠান সাজিয়ে ভাড়া নেওয়া হয়েছিল বাড়িটি। ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সোমবার রাতের জন্মদিনের পার্টিটি ভুয়া ছিল। তারা মূলত ডিজে পার্টির জন্য এটি ভাড়া নেয়। এখানে মূল ভূমিকায় ছিলেন সাদমান রাফিত, পৌরম গুহ ও নাইমুর রহমান রাহি। বাড়িটির কো-হোস্ট মাহবুবও সবকিছু জানতেন। পার্টির আয়োজন ঘিরে কাস্টমার সংগ্রহ করতে একটি বিজ্ঞাপনও দেয় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এয়ারবিএনবি। সেখানে বলা হয়েছে, ‘আগামী সোমবার, ১৯শে অক্টোবর আমরা একটি হাউজ পার্টি এবং রেইভের আয়োজন করছি! এটি একটি প্রাইভেট এবং আমন্ত্রণমূলক ইভেন্ট। তাই রেজিস্ট্রেশন করা বাধ্যতামূলক। রাত ৯টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত গান বাজবে, সুতরাং চমৎকার ভাইবসহ সারা রাত গান ও নাচে মেতে ওঠার জন্য প্রস্তুত হয়ে যান!’ আরও বলা হয়, ‘পার্টিটি একটি ট্রিপ্লেক্স হাউজে অনুষ্ঠিত হবে, যা পুলিশের একজন ডিআইজির মালিকানাধীন, তাই এখানে কোনো ধরনের পুলিশ রেইডের কোনো সম্ভাবনা নেই। আমাদের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ সদস্যরাও সেখানে উপস্থিত থাকবেন।’

ডিবি জানায়, অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের ভাড়া দেওয়া বাড়িতে প্রতি মাসে ২০ থেকে ২২টি ডিজে পার্টির আয়োজন করা হতো। ২০২৫ সাল থেকে এসব আয়োজন চলছিল। অনলাইন রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা এসব পার্টিতে যোগ দিতেন। এখান থেকে আয়ের ৭০ ভাগ যেত আব্দুল্লাহ আল জহিরের অ্যাকাউন্টে। আব্দুল্লাহ আল জহির বিগত আওয়ামী লীগ আমলেও প্রভাবশালী কর্মকর্তা ছিলেন।

এদিকে এ ঘটনার পর অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

অভিযানে নেতৃত্বদানকারী ডিএমপির গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির বুধবার তার কার্যালয়ে যুগান্তরকে বলেন, অভিযানে গিয়ে দেখা গেছে ডিজে পার্টি চলছে। বাড়িটির বাইরে বেশকিছু গাড়ি ছিল। ২৬টি মেয়ে ছিল ইয়াং, অধিকাংশের বয়স ২০ থেকে ২২ বছর। তারা বেশির ভাগই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের। একজন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। ব্যাংকার এবং ছাত্রও ছিল সেখানে। মূলত ডিজে পার্টির নামে সেখানে অর্ধ-উলঙ্গ নাচ চলছিল। শিশার ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ছিল পুরো পার্টি রুম। ৫টি রুমের মধ্যে মেয়ে-ছেলে ছিল। সেখানে গিয়ে বিভিন্ন ব্যান্ডের তিন বোতল মদ, কুশ (মাদক), ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। জন্মনিয়ন্ত্রণের বেশ কিছু সামগ্রীও পেয়েছি।

তিনি বলেন, বাড়িটির সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোর নিয়ন্ত্রণ ছিল খোদ অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির স্যারের কাছে। এ ঘটনায় আরও কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাচ্ছে। তাদের বিষয়ে তদন্ত চলছে।

বুধবার রাজধানীর খিলক্ষেত থানাধীন ৩০০ ফিট সড়কসংলগ্ন পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি (পিওএইচএস)-১-এ গিয়ে দেখা যায়, মূল সড়কের শেষ প্রান্তে দুই নম্বর প্লটের ‘গোল্ডেন সানরাইজ’ নামের বাড়িটির সামনে ৬টি প্রাইভেটকার রয়েছে। এগুলো আটক হওয়াদের বলে জানা গেছে। গাড়ির সামনের গ্লাসের স্টিকার দেখে বোঝা গেছে, তারা প্রভাবশালী ব্যক্তির সন্তান। এদিকে সাড়ে ছয় কাঠা জমির একপাশে ছোট্ট তিনতলা বাড়ি। বাড়িটির সামনে বেশ কিছু জায়গা ফাঁকা। সেখানে টেবিল-চেয়ার সাজানো। তবে মূল গেট তালাবদ্ধ। বাড়ির প্রধান ফটক বিভিন্ন ফুলের গাছে মোড়ানো। এরকম অপরূপ সাজে সজ্জিত বাড়িটিতে চলে আসছিল মাদক ও নারী নিয়ে অসামাজিক কর্মকাণ্ড।

এদিকে আলোচিত এই বাড়ির ৫০ গজের মধ্যেই খিলগাঁও থানার পুলিশ ফাঁড়ি। চলতি বছরের ৮ মে ছয়তলা ফাঁড়ি ভবনটির কার্যক্রম উদ্বোধন করেন আইজিপি আলী হোসেন ফকির।

কীভাবে পুলিশ ফাঁড়ির নাকের ডগায় এভাবে অসামাজিক কাজ চলতে পারে জানতে চাইলে ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই শরিফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘ফাঁড়িটি এখনো পুরোদমে চালু হয়নি। আর ওখানে সিনিয়র স্যারদের বাসা। এসপি স্যারদের নিচে কারও বাসা নেই। আমাদের এখানে কিছু করার সুযোগ নেই। বাসাগুলোয় কী হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্যও আমাদের কাছে থাকে না। সিনিয়র স্যাররাই বিষয়গুলো দেখেন।’

বাড়ির পাশেই হাউজিংয়ের নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মীদের চেকপোস্ট। সেখানে কথা হয় কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে। তারা জানান, প্রায়ই বেশকিছু গাড়ি বাড়িটির সামনে পার্কিং করা থাকে। এখানে রাতভর গানবাজনা চলে। বিষয়টি সবারই জানা ছিল।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস আজ প্রতিদিন ঝরছে ২২ প্রাণ

প্রতিদিন ঝরছে ২২ প্রাণ

ঢামেক হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট রোগী ঢুকতে পারলেও বেরোনো কঠিন

রোগী ঢুকতে পারলেও বেরোনো কঠিন

সড়কের সঙ্গে রেলপথের নিরাপত্তাও জরুরি লেভেল ক্রসিংয়ে উঠে পড়ছে যানবাহন

লেভেল ক্রসিংয়ে উঠে পড়ছে যানবাহন

যুগান্তরকে ইলিয়াস কাঞ্চন শুধু আইনে সড়ক নিরাপদ হবে না

শুধু আইনে সড়ক নিরাপদ হবে না

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম