প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর নিয়ে বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন
সমঝোতা-চুক্তি ইতিবাচক বাস্তবায়নে সক্ষমতা জরুরি
এ সফরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান এবং জনশক্তি রপ্তানির মতো বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পেয়েছে-মাহফুজুর রহমান * সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এ সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে -মুন্সী ফয়েজ আহমেদ
Advertisement
মুহম্মদ আকবর
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ৪ দিনের জাপান সফর শেষ করে ঢাকায় ফিরেছেন। এই সফরকে সফল ও সম্ভাবনাময় হিসাবে দেখছেন দেশের বিশিষ্টজনরা। তাদের মতে, এ সফরের মধ্য দিয়ে দুদেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদার হবে। এর পাশাপাশি বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হবে। ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সম্ভাবনা, দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সহযোগিতা সফরের উল্লেখযোগ্য অর্জন বলে মনে করছেন তারা। তবে এসব সমঝোতা ও উদ্যোগের বাস্তব সুফল পেতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি, দক্ষ জনবল, অবকাঠামোগত সক্ষমতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ৪ দিনের জাপান সফরকে সফল ও সুপরিকল্পিত বলে মনে করেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, সফরের আগে দুদেশের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা ও প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ায় এর ফলাফলও সুনির্দিষ্ট হয়েছে। তবে সফরে নেওয়া সিদ্ধান্ত ও সমঝোতাগুলোর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতা এবং জাপানের নীতিগত অবস্থানের ওপর।
এ সফরের মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, এই সফরের অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো জাপানের পক্ষ থেকে ভালো প্রস্তুতি ছিল। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও প্রস্তুতি ও আগ্রহের প্রতিফলন ঘটেছে।
ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর বেশকিছু পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে জাপান। এর মধ্যে আগের সরকারগুলোর সঙ্গে শুরু হওয়া কিছু উদ্যোগের ধারাবাহিকতাও রয়েছে। তিনি মনে করেন, এ সফর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান এবং জনশক্তি রপ্তানির মতো বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। সফর শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতেও জাপানের এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটেছে। সেখানে বাংলাদেশের আগ্রহের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হলেও পুরো সমঝোতার কাঠামো বা উপস্থাপনার ধরন অনেকটাই জাপানের কৌশলগত অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্থাৎ বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থানের বিষয়গুলোকে বৃহত্তর কৌশলগত সহযোগিতার কাঠামোর মধ্যে তুলে ধরা হয়েছে।
সফরের সামগ্রিক মূল্যায়নে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরটি যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ কারণে এর ফলাফলও তুলনামূলকভাবে সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবভিত্তিক হয়েছে। তবে সমঝোতা ও ঘোষণাগুলোর বাস্তবায়নই হবে পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ। সাবেক এই রাষ্ট্রদূতের ভাষ্য, কোনো কিছুই বাংলাদেশকে সরাসরি দেওয়া হয়নি। নিজস্ব সক্ষমতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই বাংলাদেশকে এসব সুযোগ অর্জন করতে হবে। যৌথ উদ্যোগে ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগের যে সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সক্ষমতা ও নীতিগত সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা গেলে এর চেয়েও বেশি বিনিয়োগ আসতে পারে। ফলে সফরের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সঙ্গে এসব সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদের মতে, জাপান সফরটিকে অত্যন্ত ইতিবাচক এবং দুদেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এ সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুদেশের সহযোগিতা বাড়াতেও এটি ভূমিকা রাখবে। তবে যেসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক হয়েছে সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি ও সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
তিনি বলেন, অনেক সময় আমরা বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করি, করতে চাই বলে জানাই। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যখন প্রকল্প আসবে, তখন আমাদের নিজেদের হোমওয়ার্ক সঠিকভাবে করতে হবে। আমাদের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি ভালো না থাকলে এবং প্রয়োজনীয় জনবলকে সুসংহত করতে না পারলে যে সুযোগগুলো আসছে, সেগুলো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। তার মতে, জাপানের সঙ্গে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্রগুলো কাজে লাগাতে হলে এখন থেকেই প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা, দক্ষ জনবল এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক প্রফেসর ড. এম জসিম উদ্দিন বলেন, এ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকেই জাপান বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সহযোগী। দুদেশের মধ্যে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর এসব সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের যে চেষ্টা করছে, জাপান সফর তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। বাংলাদেশ অন্য কোনো রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও সেই অবস্থান বজায় রাখা হয়েছে।
সফরের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন তুলে ধরে তিনি বলেন, দুদেশ কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করতে একমত হয়েছে। তিনি মনে করেন, বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক জাপানের ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ (বিগ-বি) উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। মাতারবাড়ীকেন্দ্রিক শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ লাভবান হতে পারে। বিশেষ করে জাপানের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে। সফরে ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ সম্ভাবনা, দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) দ্রুত কার্যকরের বিষয়ে আলোচনা ও সমঝোতা হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন তিনি।
বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরে এই বিশ্লেষক বলেন, সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় জাপানের বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতায় ১৩ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন ডলারের অনুদান চুক্তি একটি সুনির্দিষ্ট অর্জন। তবে নীল অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমি এবং সমুদ্রসম্পদ আহরণে প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে সামনে আনা প্রয়োজন ছিল।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সমুদ্রসম্পদ কাজে লাগানোর মতো প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। থাইল্যান্ড প্রতিবছর প্রায় ৭ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলারের মাছ রপ্তানি করলেও বাংলাদেশের সমুদ্র থেকে মাছ আহরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জাপানের সহযোগিতায় এ খাতে দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে সমুদ্রতলের সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং দক্ষ জনবল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর টয়োটা কারখানা পরিদর্শনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে টয়োটার কারখানা স্থাপিত হলে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি গাড়ি রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণ জরুরি। শুধু তৈরি পোশাক ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর না করে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প গড়ে তুলতে হবে।
সফরের সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ কীভাবে, কখন এবং কোন কোন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আসবে, তা আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। বিদেশি বিনিয়োগ বাস্তবায়নে বাংলাদেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারকে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
