১৪০ কিমি.র ইঞ্জিন-কোচ চলে ৫০ কিমি.তে
গতিহীন উচ্চগতির রেল
Advertisement
শিপন হাবীব
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কাগজে-কলমে ১৪০ কিলোমিটার গতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে আওয়ামী আমলে ৭০টি উচ্চগতির ইঞ্জিন ও ৮০০টি যাত্রীবাহী কোচ কিনেছিল বাংলাদেশ রেলওয়ে। তবে বাস্তবায়নে দেখা গেছে উলটো চিত্র-এসব ইঞ্জিন-কোচ ৫০ থেকে ৬৭ কিলোমিটারের বেশি গতি তুলতে পারছে না; কোনো কোনো সেকশনে তা নেমে আসছে ৫ থেকে ১০ কিলোমিটারে। ২০ থেকে ২৫ বছর আয়ুষ্কাল বলা হলেও এসব ইঞ্জিনের প্রায় অর্ধেকই ক্রয়ের দুই-তিন বছরের মধ্যে অচল হয়ে পড়েছে। রেলের কিছু অসাধু কর্মকর্তার অনিয়ম-দুর্নীতি এবং সড়ক পরিবহণ খাতের প্রভাবশালী লবির চক্রান্তে হাজার হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও ইঞ্জিন ও কোচের তীব্র সংকটে রেলে গতি আসেনি; বরং বন্ধ হয়ে গেছে অন্তত ৭৭টি ট্রেন। আর ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিনগুলো মাঝপথেই বিকল হয়ে চরম ভোগান্তিতে ফেলছে যাত্রীদের।
জানা যায়, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রোলিংস্টক (ইঞ্জিন ও কোচ) ক্রয়ে ব্যয় হয়েছে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা। অথচ এর বিপরীতে অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৯ গুণ বেশি (৯২ হাজার কোটি টাকা)। কমলাপুর স্টেশনের ৭টি প্ল্যাটফর্ম দিয়ে বর্তমানে ৬০টি ট্রেন চলছে। অথচ এ অবস্থায়ই আরও দ্বিগুণের বেশি ট্রেন চালানো সম্ভব। তাছাড়া আরও অন্তত ১০টি প্ল্যাটফর্ম বাড়ানোর পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে। সেক্ষেত্রে প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০০ ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব। কিন্তু শুধু ইঞ্জিন ও কোচের অভাবেই তা হচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব যুগান্তরকে বলেন, বর্তমান সরকার রেল উন্নয়নে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। ইঞ্জিন-কোচ সংকটের কারণে পর্যাপ্ত ট্রেন চালানো যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে ৩০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন ক্রয়ের অনুমোদন পাওয়া গেছে। আগামী ২-৪ বছরের মধ্যে সংকট নিরসন হবে। আমরা আরও নতুন ট্রেন চালাতে পারব। যাত্রীসেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরে কেনা ৭০টি ইঞ্জিন ও ৮০০ কোচ নিয়ে রয়েছে পাহাড়সম দুর্নীতির অভিযোগ। চুক্তি অনুযায়ী, হুন্দাই রোটেমের সরবরাহ করা ৩০টি ইঞ্জিনে নির্দিষ্ট মডেলের যন্ত্রাংশ (অল্টারনেটর, ট্রাকশন মোটর ইত্যাদি) দেওয়া হয়নি। প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন (পিএসআই) ছাড়াই ইঞ্জিনগুলো খালাস করা হয়। ফলে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে আনা এসব ইঞ্জিন ২ বছরের মাথায় বিকল হতে শুরু করে; অথচ এগুলোর আয়ুষ্কাল ছিল ৩০ বছর। বর্তমানে এর ১৯টিই পড়ে আছে অকেজো হয়ে। অন্যদিকে ২০২১-২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা ৪০টি ইঞ্জিনের ১৩টিই বিকল। আখাউড়া-সিলেট রুটে ওজন বেশি হওয়ায় ৩০০০ সিরিজের ইঞ্জিনগুলো চালানোই যাচ্ছে না। রেলওয়ে সূত্র জানায়, ওই সময় কেনা মোট ৭০টি নতুন ইঞ্জিনের মধ্যে ৩২টি বিকল। বাকি ৩৮টি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। চলন্ত অবস্থায় মাসে গড়ে ৬০-৬৫ বার ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা ঘটছে। ভৈরব, আখাউড়াসহ বিভিন্ন সেকশনে ব্রিজে ওঠার সময় ইঞ্জিনগুলো চলন্ত অবস্থায় বিকট শব্দে বিকল হয়ে পড়ছে।
রেলওয়ে পরিবহণ দপ্তর সূত্র বলছে, সচল ইঞ্জিনগুলোর বেশির ভাগই ৪টির বদলে মাত্র ২টি ট্রাকশন মোটর নিয়ে চলছে। ফলে এসব ইঞ্জিনে পর্যাপ্ত গতি নেই। ১৪০ কিলোমিটার গতি তো দূরের কথা-এর অর্ধেক গতি নিয়ে ট্রেন চললেই লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটছে। কিছু কিছু সেকশনে গতি ৪০-৫০ ওঠাতে গেলেই বিপতে পড়তে হয়। সম্প্রতি জামালপুরগামী অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস এবং তিস্তা এক্সপ্রেস চলন্ত অবস্থায় বিকল হয়ে পড়ে। এতে চরম ভোগান্তির শিকার হন যাত্রীরা। কোনো কোনো মাসে এই একটি রুটেই ১৫ থেকে ১৮টি ট্রেন বিকলের রেকর্ড রয়েছে। চট্টগ্রামের কালুরঘাট সেতুর ওপর দুই পাশে ৫ কিলোমিটার গতি নামিয়ে আনতে হয়। ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র সেতু, ঈশ্বরদীর গার্ডার ব্রিজ, পাবনার বাউনজান রেলসেতু, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও তিস্তা রেলসেতু এলাকায় ত্রুটিযুক্ত ইঞ্জিন-কোচ দিয়ে নামমাত্র গতি ওঠানো সম্ভব হয়। সিলেট রুটে (পাহাড়ি ও আঁকাবাঁকা সেকশন) ৫ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চালাতে হচ্ছে। পশ্চিমাঞ্চলের ৪৪৯ কিলোমিটার ট্র্যাকে (পাকশী ও লালমনিরহাট বিভাগ) ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চালাতে হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে রেলে মাত্র ২৭০টি ইঞ্জিন রয়েছে, যার ৭৭ শতাংশেরই আয়ুষ্কাল (২০ বছর) শেষ। যাত্রীবাহী কোচের ৭০ শতাংশও মেয়াদোত্তীর্ণ। ভারত থেকে ২০০ কোচ আসা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি ১৯টি কোচ রেল বহরে যুক্ত হয়েছে। চলতি বছরের মধ্যেই বাকি কোচগুলো রেলবহরে যুক্ত হবে। কিন্তু ইঞ্জিন নেই। চুক্তি অনুযায়ী, নতুন ইঞ্জিন দেশে আসতে আরও দুই বছরের বেশি সময় লাগবে। ওই সময়ের মধ্যে চলমান ইঞ্জিনের আরও অনেকগুলো অকেজো হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নতুন ইঞ্জিন ছাড়া এই দুর্দশার অবসান হবে না।
অনিয়ম-দুর্নীতির দায়ে মামলা : ইঞ্জিন ক্রয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির দায়ে রেলের ৩ শীর্ষ কর্মকর্তা-সাবেক মহাপরিচালক মো. শামসুজ্জামান, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মঞ্জুরুল আলম চৌধুরী এবং সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ হাসান মনসুরের বিরুদ্ধে দুদকে মামলা রয়েছে। তাছাড়া কোচ-লাগেজভ্যান ক্রয়েও ব্যাপক দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে দুদক। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ৮০০ কোচ ক্রয় করে রেল। ২০১৭ সালে ইন্দোনেশিয়া থেকে ২০০ কোচ কেনায় বড় অঙ্কের ঘুস লেনদেনের প্রমাণ পায় দুদক, যা বিদেশে পাচার হয়েছে বলে তদন্তে উঠে আসে। পূর্ব অভিজ্ঞতার শর্ত শিথিল করে এই দুর্নীতি করা হয়। এছাড়া ২০২০ সালে প্রাক-সমীক্ষা ছাড়াই ২৫৮ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি করে ১২৫টি লাগেজভ্যান কেনায় সাবেক ডিজি শামসুজ্জামানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে দুদক মামলা করেছে।
নেপথ্যে পরিবহণ লবি : বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, রেল হলো দুর্নীতি আর লুটপাটের কারখানা-যা দুদকও বলছে। রেলওয়ের বিভিন্ন বৈঠকে বহুবার প্রমাণসহ বলেছি, রেলের একশ্রেণির কর্মকর্তা সড়ক ও আকাশযান মালিকদের সঙ্গে অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ কামাচ্ছেন। তিনি বলেন, ঢাকা-কক্সবাজার রুটে অন্তত ৩০টি ট্রেন চালানো সম্ভব হলেও চলছে মাত্র ২টি।
রেলওয়ে বিপণন ও করপোরেট পরিকল্পনা দপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, প্রভাবশালী সড়ক পরিবহণ লবি কখনোই চায় না রেল লাভজনক গণপরিবহণ হিসাবে দাঁড়াক। কারণ রেল শক্তিশালী হলে বাস ও বিমান ব্যবসায় ধস নামবে।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, সড়ক পরিবহণ লবি অত্যন্ত শক্তিশালী। তারা কিছুতেই রেলপথকে লাভজনক হতে দিচ্ছে না। রেল হচ্ছে সাশ্রয় ও নিরাপদ বাহন-তাহলে এটি কী করে বছরের পর বছর লোকসান দিচ্ছে। তিনি বলেন, এখন প্রয়োজন অনেক ইঞ্জিন, অনেক কোচ, ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো, যাত্রীসেবার মান বাড়ানো। জনস্বার্থেই এখানে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার।
বুয়েট অধ্যাপক ড. এম সামছুল হক বলেন, উচ্চমূল্যের ইঞ্জিন-কোচ এনে মান্ধাতার আমলের মতো চালানো হচ্ছে। দিন দিন এর কঙ্কালসার চেহারা ভেসে উঠছে। রেলের অনিয়ম-দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক সিন্ডিকেট ভেঙে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. নাজমুল ইসলাম এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিংস্টক) ফকির মো. মহিউদ্দিন জানান, নতুন ইঞ্জিন ও কোচ এলে বন্ধ ট্রেনগুলো চালু করা সম্ভব হবে। সরকার অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি দ্রুত রোলিংস্টক সামগ্রী সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিংস্টক) ফকির মো. মহিউদ্দিন বলেন, বর্তমানে মাত্র ২৭০টি ইঞ্জিন রয়েছে, ভারত থেকে কোচ আসছে। নতুন করে আরও ৩০টি ইঞ্জিন ক্রয় করা হচ্ছে।
রেলওয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. নাজমুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আমরা প্রস্তুত। ইঞ্জিন-কোচ হলে নতুন ট্রেন চালাতে পারব। সরকার প্রকল্প নিচ্ছে। আশা করি যথাসময়ে ইঞ্জিন-কোচ পেলে সমস্যার সমাধান হবে।
