টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনে তিন দলের প্রতিক্রিয়া
Advertisement
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
টিআইবির প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতা নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্য বন্ধসহ আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা বলেছেন। তাদের মতে, দলগুলো যখন বড় বড় কর্মসূচি পালন করে, জাতীয় নির্বাচনসহ স্থানীয় নির্বাচনে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে-তখন মানুষের মনে এমন প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। এর সঙ্গে মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ তো আছেই। এছাড়া রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন কমিশনে তাদের আয়-ব্যয়ের যে হিসাব দেয়, তাতে অনেক গরমিল আছে বলেও তারা মনে করেন। তারা বলেন, আয়-ব্যয়ের হিসাব আরও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে করা উচিত। কীভাবে অর্থের জোগান আসে, কারা অর্থ দেয়, তাও উল্লেখ থাকা জরুরি।
সোমবার যুগান্তরকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ক্কাফী রতন এসব কথা বলেন। আগের দিন রোববার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) দাবি করেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকাশিত আয়-ব্যয়ের হিসাবের সঙ্গে দল পরিচালনার সম্ভাব্য ব্যয়ের বড় পার্থক্য রয়েছে। দলের সদস্যদের নিয়মিত চাঁদা থেকে যে অর্থ পাওয়া যায়, তা সংগঠন পরিচালনার সম্ভাব্য ব্যয়ের তুলনায় অনেক কম।
‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়নে ব্যবসায়ী ও বিত্তবান ব্যক্তিদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায় করা হয়। আবার অনেকে দলীয় পদ, নির্বাচনি মনোনয়ন বা ভবিষ্যতে সুযোগ-সুবিধা লাভের প্রত্যাশায় বড় অঙ্কের অর্থ দেন। টিআইবি বলছে, এই অর্থ নির্ভরতার রাজনৈতিক দলে পৃষ্ঠপোষকতামূলক সম্পর্ক তৈরি করছে। ফলে অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রার্থী মনোনয়ন এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছে।
জানতে চাইলে মাহমুদুর রহমান মান্না এ প্রসঙ্গে বলেন, সাধারণ মানুষের একটি বদ্ধমূল ধারণা হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাবটি স্বচ্ছ নয়। বিশেষ করে, দলগুলো যখন বড় বড় কর্মসূচি পালন করে, জাতীয় নির্বাচনসহ স্থানীয় নির্বাচনে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে, তখন মানুষের মনে এমন প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। এর সঙ্গে মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ তো আছেই। তিনি বলেন, যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যায়, তারা তখন নানারকম ধান্দা শুরু করে, লুটপাটে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। ক্ষমতায় না থাকলেও তারা নানাভাবে অর্থ সংগ্রহ করে দলের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। টিআইবির প্রতিবেদনে এই বাস্তব চিত্রই উঠে এসেছে। তিনি আরও বলেন, এ অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা শতভাগ নিশ্চিত করা।
সাইফুল হক বলেন, টিআইবি তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে যা বলেছে, তা হিমবাহের খণ্ডাংশের চিত্র। এর বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ। আমরা এ কথা অনেক বছর ধরে বলে আসছি। কিন্তু উন্নতি নেই, অগ্রগতিও নেই। বরং পরিস্থিতি দিনকে দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। সততা, নীতি এবং আদর্শের বিপরীতে রাজনীতি এখন ধনিক শ্রেণির কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছে। অনেকের কাছে রাজনীতিই এখন বড় ধরনের ব্যবসা। দ্রুত অর্থবিত্ত গড়ে তোলার একমাত্র সুযোগ কিংবা হাতিয়ার। আর কোনো রাজনীতিক যদি সরকারি দলের সদস্য হন, তাহলে তো আর কোনো কথাই নেই। তিনি বলেন, বড় রাজনৈতিক দলের আয়-ব্যয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন দীর্ঘদিনের। এই দলগুলোতে অবিশ্বাস্য রকম মনোনয়ন বাণিজ্য চলে। জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে একেবারে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পর্যন্ত চলে টাকার খেলা। যত দিন যাচ্ছে মনোনয়ন বাণিজ্যের নামে এই লেনদেন বাড়ছেই। একসময় রাজনীতি ছিল দেশপ্রেমের জন্য, কল্যাণের জন্য। এখন রাজনীতি নিজের, নিজের পরিবারের ক্ষমতা এবং ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের একমাত্র পথ; যা ক্যানসারের মতো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। ক্ষমতাসীন দলের হলে এই ব্যাধি আরও বাড়তে থাকে। এ কারণে কেউ বিরোধী দলে থাকতে চান না।
সাইফুল হক বলেন, সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে এই ক্যানসারের মূলোৎপাটন করতে হবে। আদর্শিক রাজনীতির জাগরণ ঘটাতে হবে। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক দলসহ নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা। নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সত্যি সত্যি স্বাধীন করা। জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা। আব্দুল্লাহ আল ক্কাফী রতন বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন কমিশনে তাদের আয়-ব্যয়ের যে হিসাব দেয়, তাতে অনেক গরমিল আছে। এটি আরও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে করা উচিত। কীভাবে অর্থের জোগান আসে, কারা অর্থ দেয়, তা উল্লেখ থাকা জরুরি। তিনি বলেন, টিআইবি ঢালাওভাবে যেভাবে বলেছে তার সঙ্গে আমাদের দ্বিমত আছে। সিপিবির সদস্যরা তাদের উপার্জন থেকে একটি নির্দিষ্ট হারে টাকা পার্টির ফান্ডে জমা দেন। এছাড়া আমরা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চাঁদা তুলি। আমাদের কিছু শুভার্থীও আর্থিক সহায়তা করেন। সিপিবির আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রতিমাসে পার্টিতে উপস্থাপন করা হয়। আর সিপিবিতে মনোনয়ন বাণিজ্যের কোনো সুযোগও নেই।
