Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

নথির মারপ্যাঁচে কুড়িগ্রাম বালু গবেষণাকেন্দ্র

১৫ লাখ কর্মসংস্থানের আশা ফিকে

Icon

আহসান হাবীব নীলু, কুড়িগ্রাম

প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

১৫ লাখ কর্মসংস্থানের আশা ফিকে

কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র নদ ও তীরে গড়ে ওঠা বসতি। সম্প্রতি তোলা -যুগান্তর

Advertisement

৯০০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের খনিজ মেগা প্রকল্প ‘কুড়িগ্রাম বালু গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র’। এই প্রকল্পটি থেকে প্রতিবছর সরকারের রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। এটির বাস্তবায়ন হলে কুড়িগ্রামের অবহেলিত ১৫ লাখ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ মিলবে। কিন্তু বিপুল সম্ভাবনাময় প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখার আগেই ফাইলবন্দি হতে চলেছে। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে সচিবালয়ের তথ্যের সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।

জানা যায়, বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ১৯ জুলাই জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের এক অভ্যন্তরীণ সমন্বয় সভায় আকস্মিক বিপত্তি ঘটে। সভার কার্যবিবরণীর ১০ নম্বর আলোচ্যসূচিতে উল্লেখ করা হয়, ‘জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনে প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাব্য ব্যয়ের তুলনায় সরকারের প্রাপ্তি উল্লেখযোগ্য হবে না বলে অভিমত দেওয়া হয়েছে।’ তবে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে মেলে চাঞ্চল্যকর তথ্য। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন থেকে এমন কোনো নেতিবাচক বা ‘প্রকল্পবিরোধী’ প্রতিবেদন আদৌ পাঠানো হয়নি। মূলত গত বছরের ৫ মার্চ কুড়িগ্রাম সদর, চিলমারী ও রাজারহাট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তারা জমি অধিগ্রহণের যাবতীয় ইতিবাচক তথ্য-উপাত্ত ও নকশা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছিলেন। ফলে মন্ত্রণালয়ের নথিতে জেলা প্রশাসনের নামে এই কাল্পনিক বা বিকৃত নেতিবাচক বক্তব্য কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হলো, তা নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কারণ কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের পাঠানো কোনো নেতিবাচক চিঠি নেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে।

ব্রহ্মপুত্র-যমুনার বালুতে মূল্যবান খনিজ : বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের (জিএসবি) গবেষণায় দেখা গেছে, হিমালয় অববাহিকা থেকে কুড়িগ্রামের ওপর দিয়ে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীতে প্রতিবছর প্রায় এক বিলিয়ন টন নবায়নযোগ্য বালু আসে। এই বালু মূলত মূল্যবান খনিজ সম্পদের এক অফুরন্ত ভান্ডার। এখানকার বালুতে নানা মূল্যবান খনিজ পেয়েছে জিএসবি। খনিজগুলো হলো-গারনেট ও কোয়ার্টজ, ম্যাগনেটাইট, জিরকন, ইলমেনাইট ও রুটাইল। এসব খনিজ পদার্থ দিয়ে বিশ্বজুড়ে উৎপাদন হয় টাইটানিয়াম আকরিক, যা রং, ওষুধ, প্লাস্টিক এবং ওয়েল্ডিং রড তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া সিরামিক শিল্প, পারমাণবিক প্রযুক্তি, আধুনিক মহাকাশযান ও উচ্চ প্রযুক্তির ইলেকট্রনিক্সে ব্যবহৃত হয় এসব খনিজ উপদান। এছাড়া ইস্পাত কারখানা ও খনির যন্ত্রপাতি তৈরিতেও ব্যবহৃত হয় এসব খনিজ। এমনকি অলংকার শিল্প, ওয়াটার জেট কাটিং, কম্পিউটার মাইক্রোচিপ, ঘড়ি ও চিকিৎসা যন্ত্রাংশের অন্যতম কাঁচামাল এসব খনিজ থেকে আসে।

৫০ বছরের মহাপরিকল্পনা ও প্রস্তুতি : অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছরের ১১ জুন জিএসবিতে প্রকল্পটির ওপর একটি নীতিনির্ধারণী মতবিনিময় সভা হয়। সেখানে ২০২৬ থেকে ২০৭৫ সাল পর্যন্ত সুদূরপ্রসারী ৫০ বছরের একটি মহাপরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়। এর লক্ষ্য যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম খনিজ-প্রযুক্তি ও শিল্পভিত্তিক অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় ১৫ একর জমির ওপর একটি পাইলট রিসার্চ প্ল্যান্ট এবং রাজারহাট উপজেলার টগরাইহাট এলাকায় ১০ একর জমিতে মূল গবেষণা কেন্দ্রটি (মিনারেল স্যান্ডস রিসার্চ হাব) স্থাপনের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়। এতে রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস (বিরল মৃত্তিকা উপাদান) গবেষণা ছাড়াও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, স্কাডা, স্মার্ট মাইনিং এবং একটি সমৃদ্ধ ‘জিওলজিক্যাল বিগ ডাটা সেন্টার’ গড়ে তোলার বৈপ্লবিক উদ্যোগ যুক্ত ছিল। ইতোমধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তর প্রকল্পটির জমি জরিপ ও সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন শেষ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।

মুখোমুখি সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও জনপ্রতিনিধি : কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ মন্ত্রণালয়ের দাবিটি নাকচ করে দিয়ে বলেন, ‘আমার যোগদানের আগে সাবেক বালু গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সম্ভাব্য জমির তথ্য-উপাত্ত কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ১৯ জুলাইয়ের সভায় জেলা প্রশাসনের যে নেতিবাচক অভিমতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, এই ধরনের কোনো প্রতিবেদন কখনোই পাঠানো হয়নি। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নাগরিকদের আর্থসামাজিক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটবে।’

কুড়িগ্রাম গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল ফারুক বলেন, জমির সম্ভাব্যতা ও কার্যকারিতা যাচাই শেষ করে প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অনেক আগেই পাঠিয়েছি। জিএসবির উপপরিচালক (ভূতত্ত্ব) ড. সোহেল রানা বলেন, বালু থেকে হেভি ও লাইট মিনারেল আলাদা করতে পারলে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশে টাইটানিয়াম ও জিরকোনিয়াম-ভিত্তিক বিশাল ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে উঠবে। জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি শফিকুল ইসলাম বেবু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মেগা প্রকল্পটি শুরুই হলো না, অথচ মন্ত্রণালয় কীভাবে বলতে পারে লাভ না ক্ষতি হবে? আমরা দ্রুত এর বাস্তবায়ন চাই। খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের পালটাপালটি অবস্থানের বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের এমন সিদ্ধান্তের বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে বালু গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন নিয়ে যদি কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা তথ্যের বিভ্রান্তি থাকে, তা দ্রুত নিরসনের ব্যবস্থা নেব।’

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

তামাশার হটলাইন

তামাশার হটলাইন

নথির মারপ্যাঁচে কুড়িগ্রাম বালু গবেষণাকেন্দ্র ১৫ লাখ কর্মসংস্থানের আশা ফিকে

১৫ লাখ কর্মসংস্থানের আশা ফিকে

প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি ফ্লাইটে কারিগরি ত্রুটি বিতর্কিত দুই প্রকৌশলীর স্টেশন ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

বিতর্কিত দুই প্রকৌশলীর স্টেশন ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

‘বরিশল’ নামে নতুন উপজেলায় আপত্তি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাড়ে ৪ ঘণ্টা সড়ক-রেল অবরোধ, দুর্ভোগ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাড়ে ৪ ঘণ্টা সড়ক-রেল অবরোধ, দুর্ভোগ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম