কৌতূহল থেকে নেশার জগতে
মাদকাসক্তির এক অবিশ্বাস্য কাহিনি
‘মায়ের সেই আক্ষেপের কথা মনে পড়লে চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না।’
Advertisement
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজশাহীর সিটি হার্ট মোড়ের গরুর কালা ভুনা আর কলাই রুটি ফেসবুকে ভাইরাল। এ সুবাদে দোকানের মালিক ইউনুস আলী মন্ডলের বেচাকেনাও প্রচুর। কিন্তু ব্যবসা ভালো হলেও পরিবারে শান্তি নেই তার। কারণ, বড় ছেলে মাদকাসক্ত। বর্তমানে সরকারি নিরাময়কেন্দ্রে তার চিকিৎসা চলছে। কিন্তু তেমন কোনো উন্নতি হচ্ছে না।
১৬ জুলাই রাজশাহী বিভাগীয় মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে গেলে রোগীর সঙ্গে প্রতিবেদকের কথা হয়। নিজের অভিশপ্ত জীবনের বর্ণনা দিয়ে তিনি যুগান্তরকে বলেন, মাদ্রাসায় লেখাপড়া করার পর স্থানীয় মসজিদেও তিনি ইমামতি করেছেন। কিন্তু অসৎ সঙ্গ আর কৌতূহলের বশে ধীরে ধীরে তিনি মাদকের জগতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আগে টুকটাক গাঁজা খেতাম। পরে ইয়াবা এবং ট্যাপেন্টাডল নামের আরেক ধরনের মাদকসেবন শুরু করি।
ইমাম হয়েও কেন মাদকের জগতে ঢুকে পড়লেন-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমার মতো লোক মাদকসেবন করে এমন কথা শোনার পর বাড়ির লোকজনও এটা বিশ্বাস করেনি।’ প্রথমে শুধু কৌতূহল থেকে মাদকসেবন শুরু করি। একপর্যায়ে নেশা আর পিছু ছাড়ে না। এখন অনেক চেষ্টা করেও মাদক থেকে মুক্তি হতে পারছি না।’
তবে এমন রোগী শুধু একজন নয়, রাজশাহী বিভাগীয় মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসা নিচ্ছেন পবিত্র কুরআনের এক হাফেজ। বাড়ি নওগাঁর আত্রাই থানায়। একাধিক মাদকে আসক্তির কারণে মাত্র ৩৫ বছর বয়সেই তার শরীরে নানা ধরনের রোগ বাসা বেঁধেছে।
তিনি যুগান্তরকে জানান, তিনিও মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। খুব ছোট বয়সেই তার হিফজ সমাপ্ত হয়। বাড়িতে ঝগড়া করে ২০০১ সালের দিকে তিনি রাজশাহী চলে আসেন। জীবিকার তাগিদে শহরের সাহেব বাজার এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে তিনি হোটেল বয়ের কাজ নেন। হোটেলের অন্য কর্মচারীদের সঙ্গে একই মেসে থাকতেন। মূলত তাদের সঙ্গে মিশতে গিয়ে মাদকের জগতে পা বাড়ান। প্রথমে গাঁজা সেবন করলেও পরে ইয়াবা এবং হেরোইনে আসক্ত হয়ে পড়েন তিনি।
তিনি জানান, শহরের শিরোইল এলাকায় তিনি দীর্ঘদিন বসবাস করছেন। বিয়ে করেছেন স্থানীয় এক মেয়েকে। কিন্তু রাজশাহীর অন্য এলাকার মধ্যে শিরোইলে মাদকাসক্ত লোকজনের সংখ্যা অনেক। বিভিন্ন ধরনের মাদক রীতিমতো বাজার বসিয়ে বিক্রি হয়। তার শ্বশুরসহ পরিবারের আরও বেশ কয়েকজন প্রকাশ্যে মাদকসেবন করেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার মায়ের বয়স এখন প্রায় ৭০ বছর। ছেলের মাদকাসক্ত জীবন দেখে তার খুব কষ্ট হয়। আফসোস করে একদিন মা বলেন, ‘কুরআনের হাফেজ হয়েও তুই এমন খারাপ কাজে কীভাবে জড়িয়ে পড়লি।’ আমি মায়ের এ প্রশ্নের উত্তর আজও দিতে পারিনি।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিরাময়কেন্দ্রের একজন চিকিৎসক যুগান্তরকে বলেন, সমাজের সর্বস্তরে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে। এ কারণে শিক্ষক, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে মসজিদের ইমাম কিংবা পবিত্র কুরআনের হাফেজও মাদকের আগ্রাসন থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। সরকারের কঠোর উদ্যোগ ছাড়া এমন ভয়ংকর অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
রাজশাহী বিভাগীয় নিরাময়কেন্দ্রের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জাকির হোসেন জানান, রাজশাহী অঞ্চলে মাদকাসক্তদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ২৫ শয্যার নিরাময়কেন্দ্রটিতে গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। বর্তমানে যে ১০ জন মাদকাসক্ত দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাদের ৮ জনই ইয়াবায় আসক্ত। বাকি ২ জন হেরোইন ও গাঁজা সেবন করেন।
