ধনীদের নিরাময়কেন্দ্রে কষ্টের গল্প
শত শত মেধাবী মুখ অন্ধকারে বন্দি
পুলিশ কর্মকর্তা, সচিব, শিল্পপতির সন্তানদের অনেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন গোপনে
Advertisement
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কেউ প্রকৌশলী। কেউ ব্যারিস্টার। কেউবা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্র। কিন্তু মাদকের ছোবলে থমকে গেছে তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, কোটিপতি ব্যবসায়ী কিংবা প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিকদের সন্তানরাও নেশার অন্ধকারে ডুবছে। রাজধানীর কয়েকটি অভিজাত নিরাময়কেন্দ্র রীতিমতো এসব ভিআইপি-সিআইপি রোগীতে ঠাসা।
চিকিৎসা নিচ্ছেন কারা : রাজধানীর উত্তরায় অবস্থিত আইকন কেয়ার নামের একটি অভিজাত নিরাময়কেন্দ্রে চলতি মাসে ভর্তি হয়েছেন ২৬ জন। তাদের মধ্যে আছেন একটি শিল্পগ্রুপের কর্ণধার এবং এফবিসিসিআই-এর পরিচালক। তিনি অ্যালকোহল ও ইয়াবায় আসক্ত।
চিকিৎসাধীন রয়েছেন ধনাঢ্য পরিবারের এক তরুণী। তার বয়স মাত্র ২৬ বছর। সদ্য লন্ডন থেকে ব্যারিস্টারি পাশ করে দেশে ফেরেন তিনি। কিন্তু মাদকাসক্তির কারণে তার পক্ষে আইন পেশা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে তাকে নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তি করেছে পরিবার। এছাড়া মাদকাসক্তির চিকিৎসায় ভর্তি রয়েছেন ৪৪ বছর বয়সি এক নারী। যিনি স্বামীর প্ররোচনায় অ্যালকোহলে আসক্ত হয়ে পড়েন।
চরম মাদকাসক্তির কারণে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা এক যুবক দীর্ঘসময় ধরে চিকিৎসাধীন। সম্ভাবনাময় এই মেধাবী ছাত্র চীনে ডাক্তারি পড়তে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানেই জড়িয়ে পড়েন মাদকে। ফলে লেখাপড়া শেষ হয়নি। চরম হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় ঢাকায় ফিরে এলেও নেশার ঘোর কাটেনি। এক পর্যায়ে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারান।
চিকিৎসাধীন এক মাদকাসক্ত প্রকৌশলীর অবস্থা করুণ। মাদকের প্রভাবে তার নানা ধরনের জটিল রোগ দেখা দিয়েছে। অথচ তিনি ইউরোপের নামকরা প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রিধারী। দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে বসবাস করেছেন। তিনি ফেডিডাস্ট, কোকেনসহ কয়েক ধরনের পাশ্চাত্য মাদকে আসক্ত। এছাড়া চিকিৎসাধীন রয়েছেন আলোচিত ট্রাস্ট কলেজের এক ছাত্র। তার বাবা একজন প্রতিষ্ঠিত গার্মেন্ট ব্যবসায়ী।
মাদকাসক্তির চিকিৎসায় ভর্তি হয়েছেন গাজীপুরের আইইউটি থেকে পাশ করা আরেক প্রকৌশলী। রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উঁচু পদে কর্মরত ছিলেন তিনি। কিন্তু গাঁজার নেশায় তার জীবন তছনছ। এছাড়া ইয়াবা আসক্ত এক তরুণ উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা দম্পতির সন্তান। বাবা পুলিশ কর্মকর্তা। মা ভূমি মন্ত্রণালয়ের অফিসার। কিন্তু মাদকের কারণে পরিবারটি আজ বিপর্যস্ত।
মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিতে ভর্তি হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এক যুবক। তিনি সে দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। কিন্তু মাদকে জড়িয়ে পড়ায় তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। চিকিৎসায় কিছুটা সুস্থ হলেও তার যুক্তরাষ্ট্রে ফেরা অনিশ্চিত। কারণ, ডোপ টেস্টে পুনরায় আসক্তি ধরা পড়লে দেশটিতে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ হতে পারেন তিনি।
ধানমন্ডির শুক্রাবাদ এলাকার এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান ইয়াবায় আসক্ত অবস্থায় ভর্তি হয়েছেন। তবে এর আগে তাকে একাধিকবার নিরাময়কেন্দ্রে রাখা হয়। কিন্তু এতে তেমন সুফল মেলেনি। চরম মাদকাসক্তির কারণে বর্তমানে তার শরীরে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিয়েছে।
রাজধানীর একটি নামকরা রিয়েল স্টেট কোম্পানির মালিকের একমাত্র ছেলেও মাদকাসক্ত। নিরাময়কেন্দ্রে তারও চিকিৎসা চলছে। ক্রমাগত মাদকসেবনের ফলে তিনিও মানসিক রোগে আক্রান্ত। সিজোফ্রেনিয়া বা চরম মানসিক বৈকল্য দেখা দিয়েছে তার।
চিকিৎসাধীন এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর জীবনকাহিনি যেন সিনেমার চিত্রনাট্য। তার মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ নিঃসঙ্গতা। দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে সন্তানের বাবা হতে পারেননি তিনি। এক পর্যায়ে দাম্পত্য কলহের জেরে স্ত্রীর সঙ্গেও বিচ্ছেদ ঘটে। চরম নিঃসঙ্গতায় নেশার জগতে ডুব দেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ক্রমশ বাড়লেও চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ কম। দেশে বর্তমানে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৮০ লাখের বেশি। কিন্তু ২০২০ থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্রগুলোয় চিকিৎসা নিয়েছেন মাত্র ২ লাখ ৩০ হাজার।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণে মাদকের বিস্তার বাড়ছে। এছাড়া শিক্ষার অভাব, মাত্রাতিরিক্ত স্বাধীনতা, একাকিত্ব এবং অঢেল অর্থবিত্তের প্রভাবে নেশার দিকে ধাবিত হচ্ছেন অনেকে। প্রযুক্তির প্রভাব এবং পারিবারিক বন্ধন কমে যাওয়াও মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ।
