চট্টগ্রামের দুটি আসনে বিএনপির মনোনয়ন
আসলাম-আব্বাসের অনুসারীদের বিস্ময়
সীতাকুণ্ডে গণপদত্যাগের হুমকি নেতাকর্মীদের * তিন হেভিওয়েট নেতার ছেলের মনোনয়ন * ৬টি আসনে নেতাকর্মীরা উৎকণ্ঠায়
Advertisement
চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রাম জেলার ১৬টি আসনের মধ্যে ১০টিতে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এতে মনোনয়নপ্রাপ্ত নেতাদের অনুসারীরা উল্লাস-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। তবে ত্যাগী ও জেল-জুলুমের শিকার নেতারা মনোনয়ন না পাওয়ায় তাদের অনুসারীরা অবাক ও বিস্মিত হয়েছেন। কোথাও কোথাও তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে লায়ন আসলাম চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনে আলী আব্বাসের নাম বাদ পড়ায় অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। অনেকে আবার এ সিদ্ধান্ত মেনে নিতেও পারছেন না। আব্বাসের অনুসারীরা শান্ত থাকলেও আসলামের অনুসারীরা রাতেই রাজপথে নামেন। মহাসড়ক অবরোধ করে তারা বিক্ষোভ করেন। দলের দুঃসময়ে মাঠে ছিলেন না-এমন দুজনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেন।
আবার কোনো কোনো আসনে ত্যাগীরা মূল্যায়িত হওয়ায় ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন নেতাকর্মীরা। এ নিয়ে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় তুলেছেন। এদিকে যে ছয়টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি, সেসব আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। চট্টগ্রামের তিন হেভিওয়েট নেতার তিন ছেলে মনোনয়ন পেলেও একজনের ছেলে বাদ পড়েছেন। যেসব আসনে ত্যাগীরা বাদ পড়েছেন, তাদের ধারণা-কারও দ্বারা হাইকমান্ড কোনো না কোনোভাবে ভুল পথে পরিচালিত হয়েছে। তবে তাদের বিশ্বাস-বাদ পড়া ত্যাগীদের মনোনয়ন পুনর্বিবেচনা করবে দল। বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য লায়ন আসলাম চৌধুরী ফ্যাসিস্ট সরকারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামের অকুতোভয় সৈনিক ছিলেন। তৎকালীন প্রশাসনের প্রধান টার্গেটও ছিলেন তিনি। আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে ১৬ বছরে তিনি ৭৪টি মামলার আসামি হয়েছেন। একটানা ৯ বছর জেল খেটেছেন। ৫ আগস্ট সরকারের পট পরিবর্তনের পর চট্টগ্রাম কারাগার থেকে তিনি মুক্তি পান। নেতাকর্মীদের ধারণা ছিল আসলাম চৌধুরী মনোনয়ন পাবেন। কিন্তু চট্টগ্রাম-৪ আসনে (সীতাকুণ্ড) তার নাম না দেখে অনুসারীর বিস্মিত ও হতভম্ব হয়েছেন। তারা রাস্তায় নেমে আসেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে ও টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। তবে মধ্যরাতে আসলাম চৌধুরীর নির্দেশে সড়ক থেকে তারা চলে যান। মঙ্গলবার বিকালে সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা সমাবেশ করেন। সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ডা. কমল কদর জানান, আসলাম চৌধুরীর মনোনয়ন না দিলে কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি দেওয়া হবে। নয়তো তারা দল থেকে গণপদত্যাগ করবেন।
এ আসনে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম-আহ্বায়ক ও উপজেলা যুবদলের সাবেক সভাপাতি কাজী সালাহউদ্দিনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। আসলামের অনুসারী হিসাবে পরিচিত সালাহউদ্দিন। আসলামের সামনে সালাহউদ্দিন ‘কিছুই না’ বলে মনে করেন দলীয় নেতাকর্মীরা।
চট্টগ্রাম-১৩ আসনে (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) মনোনয়ন দৌড়ে আলী আব্বাস ছিলেন এক নম্বরে। এ আসনে সাবেক এমপি সরোয়ার জামাল নিজামের নাম ঘোষণায় আব্বাসের অনুসারী নেতাকর্মীরা এবং অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীরা অবাক হয়েছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ-এ আসন থেকে একাধিকবার বিএনপির টিকিটে নিজাম নির্বাচিত হলেও ১৬ বছর দলের দুঃসময়ে তিনি মাঠে ছিলেন না। ২০১৮ সালে দলের মনোনয়ন পেলেও কোনো কেন্দ্রে তার এজেন্ট খুঁজে পাওয়া যায়নি। অভিযোগ-প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের ‘বশ্যতা’ স্বীকার করে মাঠ থেকে নিজাম নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। নিজেই এলাকাছাড়া হয়েছিলেন। পট পরিবর্তনের পর ফিরে এসে মনোনয়নের জন্য লবিং করেন।
সূত্র জানায়, ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট ছিলেন সরোয়ার জামাল নিজাম। ১৯৯৬ সালে কর্নেল (অব.) অলি আহমদের হাত ধরে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯৬ সালে আনোয়ারা আসন থেকে নিজাম বিএনপির টিকিটে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালেও তিনি বিএনপির টিকিটে নির্বাচিত হন।
অপরদিকে আলী আব্বাস ছাত্রদল, যুবদল ও শ্রমিক দল হয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক হয়েছেন। ৩২ বছরের রাজনৈতিক জীবনে তিনি একদিনের জন্যও পদপদবিবিহীন ছিলেন না। এ আসনে বিএনপির দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিন, জিয়াউদ্দিন চৌধুরী আশফাক, মামুন মিয়া মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। মনোনয়নবঞ্চিত দুই প্রার্থীর অনুসারীরা জানান, কোনো না কোনোভাবে হাইকমান্ড ‘মিসগাইড’ বা ভুল পথে পরিচালিত হয়েছে। না হলে এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। ত্যাগীদের বাদ দিয়ে মাঠে ছিলেন না-এমন কাউকে মনোনয়ন দেওয়ার নীতি দলের নেই। মনোনয়নবঞ্চিত দুই প্রার্থীর প্রত্যাশা-মাঠ পর্যায়ে খোঁজখবর নিয়ে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হবে। এ আশায় বুক বেঁধেছেন তাদের অনুসারীরাও।
তিন নেতার ছেলের মনোনয়নে চমক : চট্টগ্রামের তিনটি আসনে বিএনপির তিন নেতার ছেলেরা মনোনয়ন পেয়েছেন। চট্টগ্রাম-৫ (হাটাহাজারী) আসনে সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও সাবেক সিটি মেয়র মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের ছেলে ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন মনোনয়ন পেয়েছেন। হেলাল বর্তমানে বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক। মাঠ পর্যায়ে কাজ করে সাংগঠনিকভাবে তিনি নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন।
চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে বিএনপির সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী মনোনয়ন পেয়েছেন। হুম্মাম গুম হয়ে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য হিসাবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। তার মনোনয়নে এলাকায় উল্লাস-উচ্ছ্বাস চলছে।
চট্টগ্রাম-১৬ আসনে (বাঁশখালী) সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর ছেলে মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা মনোনয়ন পেয়েছেন। এখানে তার বড় ভাই জহিরুল ইসলাম চৌধুরী আলমগরীও মনোনয়ন চেয়েছিলেন। পাপ্পা বর্তমানে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক। এ আসনে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম-আহ্বায়ক লিয়াকত আলী চেয়ারম্যানের নাম আলোচনায় ছিল। বহু মামলার আসামি ও নির্যাতনের শিকার হলেও তিনি মনোনয়ন না পাওয়ায় তার অনুসারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমানের ছেলে পাট শ্রমিক দলের সভাপতি সাঈদ আল নোমান তুর্য নগরীর চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-খুলশি) আসন থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। এ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) ও চট্টগ্রাম-১১ (পতেঙ্গা) আসনে কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। এর যে কোনো একটিতে সাঈদ আল নোমানকে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে-এমনটি আশা করছেন তার অনুসারীরা।
চট্টগ্রাম-৬ আসনে (রাউজান) মনোনয়নপ্রত্যাশীদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা : এ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় দুই নেতা গোলাম আকবর খোন্দকার ও গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। ৫ আগস্টের পর থেকে এ আসন সন্ত্রাসের জনপদে পরিণত হয়েছে। এখানে ১৪ মাসে ১৭টি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড হয়েছে। এসব খুনের ঘটনা দুই নেতার দ্বন্দ্বে ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। সূত্র জানায়, এ কারণে এ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি।
কোতোয়ালি আসনে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আবু সুফিয়ানের নাম ঘোষণা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে স্থগিত করা হয়। এ আসনে কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য শামসুল আলম, নগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর, সাবেক যুগ্মসম্পাদক আহমেদ উল আলম চৌধুরী রাসেল মনোনয়নপ্রত্যাশী। নাম ঘোষণা না করায় তারা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় আছেন।
চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ), চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা), চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক) এবং চট্টগ্রাম-১৫ আসনে (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) প্রার্থীর নাম ঘোষণা না করায় মনোনয়নপ্রত্যাশীরাও গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন।
