Logo
Logo
×
   

শেষ পাতা

৫ বছরের সাজা দ্বিগুণ করতে উদগ্রীব ছিলেন ইকবাল মাহমুদ

খালেদা জিয়ার ১০ বছরের সাজার স্ক্রিপ্ট তৈরি হয় দুদকের টেবিলে

মিজান মালিক

মিজান মালিক

প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

খালেদা জিয়ার ১০ বছরের সাজার স্ক্রিপ্ট তৈরি হয় দুদকের টেবিলে

আদালতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

দুটি সাজানো মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে কোন প্রক্রিয়ায় সাজা দেওয়া হয়েছিল, এতে শেখ হাসিনার সরকার ও দুদকের কী ধরনের ভূমিকা ছিল, বিচারকরা কীভাবে রায় দিয়েছিলেন-সে বিষয়ে অজানা এবং গুরুতর তথ্য পেয়েছে যুগান্তর। ২০০৭ সালের জরুরি সরকার বেগম খালেদা জিয়ার নামে নাইকো, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা করেছিল।

একই সময়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও নাইকো, নভোথিয়েটার দুর্নীতিসহ একাধিক মামলা করেছিল ওই সরকার। তবে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনে জয় পেয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনাসহ তার দলের সবার মামলা প্রত্যাহার বা আদালতের মাধ্যমে খারিজ করে নেওয়া হয়। আইনজীবীরা বলেন, রাজনৈতিকভাবে হেনস্তা করার হীন উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনা সরকার বেগম খালেদা জিয়ার মামলাগুলো সচল রাখে।

সেই ধারাবাহিকতায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় সাজা দেওয়া হয়েছিল। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায় হয়। এ রায় ঘোষণার আগের দিন ৭ ফেব্রয়ারি বেগম খালেদা জিয়া সাংবাদিক সম্মেলন করে দেশবাসীর উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আপনাদের খালেদা জিয়া কোনো অন্যায় করেনি। দুর্নীতি করেনি। ট্রাস্টের একটি টাকাও তছরুপ হয়নি। বরং সুদাসলে দ্বিগুণ হয়েছে।

এ মিথ্যা মামলায় ন্যায়বিচার হলে আমি খালাস পাব। আমাকে জেল বা সাজার ভয় দেখিয়ে লাভ হবে না। আমি মাথানত করব না। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি থেকে পিছ-পা হব না।’ এ মামলায় অন্যরকম রায় হলে দেশে ‘কলঙ্কের ইতিহাস’ তৈরি হবে বলেও সেদিন বলেছিলেন তিনি।

বেগম খালেদা জিয়া রায় ঘোষণার আগের দিন যে আশঙ্কা করেছিলেন, অন্যরকম রায় হলে সেটি হবে কলঙ্কের ইতিহাস-বলা চলে ৮ ফেব্রুয়ারির রায়টি তেমনই হয়। ওই রায়ে বেগম খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের সাজা দেন বিচারক ড. আক্তারুজ্জামান। মামলায় অন্য ৫ জনকে দেওয়া হয়েছিল ১০ বছর করে সাজা। রায়ের দিন বকশীবাজার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ আদালতে উপস্থিত ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। জেলে যাওয়ার আগে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, সাজানো একটি রায় দিয়েছে সরকার। দেশবাসী এ অন্যায়ের বিচার করবে।

সাজা যেভাবে ৫ বছর থেকে ১০ বছর : সাজানো ও মিথ্যা অভিযোগে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ে বেগম খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের সাজা দেওয়া হলে, এই রায়ের বিরুদ্ধে তার পক্ষে নিয়োজিত আইনজীবীরা উচ্চ আদালতে আপিল করেন। এই আপিলের রায় হওয়ার আগেই দুদকের টেবিলে সাজা দ্বিগুণ অর্থাৎ ১০ বছর করার স্ক্রিপ্ট তৈরি হয়। বিষয়টি এতদিন আড়ালে ছিল।

মঙ্গলবার এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে সাজানো রায়ের সত্যতা মিলেছে। সূত্র বলছে, খালেদা জিয়া রায়ের আগেই বলেছিলেন, এটা মিথ্যা মামলা। ন্যায়বিচার পেলে তিনি খালাস পাবেন। কিন্তু ন্যায়বিচার নিশ্চিত না করে উলটো তাকে বিচারিক আদালত থেকে ৫ বছর, পরে হাইকোর্ট থেকে ১০ বছরের সাজা নিশ্চিত করে তৎকালীন সরকার।

দুদকের তৎকালীন মহাপরিচালক (লিগ্যাল) মাইদুল ইসলামের কাছে প্রশ্ন ছিল বেগম খালেদা জিয়াকে এ মামলায় সাজা দেওয়া ঠিক ছিল কিনা-যেখানে ট্রাস্টের কোনো টাকা খোয়া যায়নি বা দুর্নীতি হয়নি, বরং এখনো সোনালী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখায় সুদে-আসলে গচ্ছিত আছে।

দুদক থেকে ৫ বছরের সাজা ১০ বছর করার বিষয়টি আসলে কি ছিল-মাইদুল ইসলাম বলেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ৫ বছরের সাজা সম্ভবত তৎকালীন সরকারের মনঃপূত হয়নি। দুদকের আইনজীবী খুরশিদ আলম এ মামলায় সাজার মেয়াদ ১০ বছর করতে দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের কাছে আবেদন করেন। সেই আবেদনটি চেয়ারম্যান আমার টেবিলে পাঠান। তিনি চেয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়ার সাজা ১০ বছর হোক। সে সময় তিনি আমাদের ধারণা দিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রী চান, তাই এটি করতে হবে। এমতাবস্থায় আমার টেবিলে সেটি এলে তা চেয়ারম্যানকে ফরোয়ার্ড করি।

আপনি তখন এতে দ্বিমত করেছিলেন কিনা-এমন প্রশ্নে মাইদুল ইসলাম বলেন, আমি উনাকে (চেয়ারম্যান) মৌখিকভাবে বলেছি। যেহেতু তিনি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের বরাত দিয়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাই এর চেয়ে বেশিকিছু বলতে পারিনি। ইকবাল মাহমুদ আমাদের কথা শোনেননি।

কেন এটি করা হলো-এ প্রশ্নে মাইদুল ইসলাম বলেন, ইকবাল মাহমুদের আচরণে মনে হয়েছিল, সরকার চায় খালেদা জিয়া যেন দুই টার্ম নির্বাচনে অযোগ্য হন সেটা নিশ্চিত করতেই এমনটি করা হয়ে থাকতে পারে।

দুদকের তৎকালীন পিপি খুরশিদ আলমের অতি উৎসাহের কারণ কি ছিল-এ প্রশ্নে মাইদুল ইসলাম বলেন, আমার ধারণা তাকে অ্যাটর্নি জেনারেল করার টোপ দিয়েছিল সরকার। তাই তিনি হয়তো অতি উৎসাহী হয়ে সরকারের পক্ষ হয়ে দুদক চেয়ারম্যানের কাছে সাজা দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করেন। কমিশনের অনুমোদন পেয়ে খুরশিদ আলম সাজার মেয়াদ ১০ বছর করার জন্য হাইকোর্টে আপিল করেন। তখন তিনি বলেছিলেন, খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে পারবেন না।

জানা গেছে, হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ বেগম খালেদা জিয়ার আপিল অগ্রাহ্য করে দুদকের পক্ষে ২০১৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি দুদকের পিপির করা আবেদন আমলে নিয়ে সে আলোকেই ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর রায় দেন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ। অন্যদিকে বেগম খালেদা জিয়ার আপিল আবেদন খারিজ করে দেন।

এছাড়া, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় বেগম খালেদা জিয়াকে ৭ বছরের সাজা দিয়েছিলেন বিশেষ জজ আদালতের সেই বিচারক ড. আক্তারুজ্জামানই। আইনজীবীরা জানান-ড. আক্তারুজ্জামান ছিলেন সাবেক প্রধান বিচরপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর ভাই আবু বকর সিদ্দিকীর ভায়রা। আত্মীয় সূত্র এবং তৎকালীন সরকারকে খুশি রাখতে বেগম খালেদা জিয়াকে সাজা প্রদানকারী বিচারক পরে হাইকোর্টের বিচারপতি হন।

বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে আইনি লড়াই করেছেন এমন একাধিক আইনজীবী বলেন-মিথ্যা, বানোয়াট ও কাল্পনিক দুর্নীতির অভিযোগে করা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়েছিল শেখ হাসিনার সরকার। শেখ হাসিনা এ মামলার রায় উল্লেখ করেই ম্যাডামকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে কথা বলতেন। তার কথাবার্তার মধ্যে ছিল নিষ্ঠুরতা। ম্যাডামের চিকিৎসআ নিয়েও তিনি অন্যায় আচরণ করেছেন। তার আইনমন্ত্রী বিচার নিয়ন্ত্রণ করতেন।

ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, বেগম খালেদা জিয়া ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন ও মিথ্যা মামলার রায় দিয়ে অনেক বিচারক পদোন্নতিসহ সরকারের কাছ থেকে নানা সুবিধা নিয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়াকে তার বাড়ি থেকে উচ্ছেদের মামলার রায় দিয়ে বিচারপতি খায়রুল হক হয়ে যান প্রধান বিচারপতি। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে নেন মোটা অঙ্কের অনুদান। এমনকি অবসরের পরও তাকে অনেক বছর আইন কমিশনের চেয়ারম্যান পদে রাখা হয়। বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় দ্বিগুণ সাজা দিয়ে ইনায়েতুর রহিম হন আপিল বিভাগের বিচারপতি। ড. আক্তারুজ্জামানসহ নিু আদালতের দুজন বিচারক হন হাইকোর্টের বিচারপতি। এগুলো ছিল শেখ হাসিনা সরকারের উপঢৌকন।

ব্যারিস্টার মাহবুব বলেন, ম্যাডাম বলতেন, ‘খোকন আমার নামে অভিযোগ আনলো এতিমের টাকা আত্মসাতের। আর কিছু পেল না। খুব কষ্ট লাগে। আমি কখনো এমন চিন্তাও করিনি। খুব খারাপ লাগে।’ খালেদা জিয়া তার বড় ছেলে তারেক রহমানের নামে মিথ্যা মামলার খবরেও খুব কষ্ট পেতেন।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম