এনইসি’র সেমিনারে তথ্যমন্ত্রী
স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে সোমবার ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল আয়োজিত ‘ফ্যাসিবাদ মোকাবিলায় মিডিয়ার ব্যর্থতা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তৃতা করছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, গণমাধ্যম সমাজ ও রাষ্ট্রের আয়না। সে কারণে এটিকে অবশ্যই নিখুঁত হতে হবে। গণমাধ্যমকে স্বচ্ছ ও নিখুঁত করে গড়ে তোলার দায়িত্বও গণমাধ্যমকেই পালন করতে হবে। এজন্য সব পক্ষের ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। সোমবার রাজধানীর রমনার সার্কিট হাউজ রোডের তথ্য ভবনের ডিএফপি সম্মেলন কক্ষে ‘ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল (এনইসি)’ আয়োজিত ‘ফ্যাসিবাদ মোকাবিলায় মিডিয়ার ব্যর্থতা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ১৬ জুন বাকশালী শাসনে সংবাদপত্র বন্ধের কালো দিবস উপলক্ষ্যে এ সেমিনার আয়োজন করা হয়।
এ সময় মন্ত্রী আরও বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের ওপর নির্ভর করে। বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গির ওপর দাঁড়াতে না পারলে ভবিষ্যতেও একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম কমিশন গঠন করা যাবে না।
এনইসির যুগ্ম আহ্বায়ক ও আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের সভাপতিত্বে এবং দৈনিক যুগান্তর সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদারের সঞ্চালনায় সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক মারুফ কামাল খান সোহেল। তথ্যমন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যম শক্তিশালী করতে সব উদ্যোগ সব আমলেই আংশিক ছিল। যেহেতু এটি কখনোই পূর্ণাঙ্গতা পায়নি এবং সে কারণেই বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তুলতে পারিনি। বিগত দিনের সব সরকারকেই এর দায়-দায়িত্ব বহন করা উচিত। তিনি আরও বলেন, এজন্যই যদি শুরুতেই আমাদের লক্ষ্যের ব্যাপারে ঐকমত্য তৈরি করতে না পারি এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীদারকে একই মঞ্চে দাঁড় করাতে না পারি, তাহলে এই কঠিন কাজটা অতীতে যে কারণে হয়নি, এবারও সে কারণে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, ভিন্নমত সম্মিলিতভাবে চর্চা করার যে সংস্কৃতি এবং তাকে কাঠামোবদ্ধ করার যে কাজ-সেটাকে কখনোই আমরা প্রাতিষ্ঠানিক করতে পারিনি। আমি খুবই আশাবাদী এবার আপনাদের এই (সেমিনারে দেওয়া) বক্তব্য এবং ইতোমধ্যে অন্য যার যার সঙ্গে আমি কথা বলেছি, তাদেরও যে লক্ষ্য এবং কনক্লুশন (উপসংহার)-আমি তার মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য খুঁজে পাইনি। তিনি বলেন, যদি সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে একটা কমিশন করতে পারি, তাহলেই সেটি সব সমস্যা সমাধানের একটা আশ্রয়স্থল হিসাবে কাজ করবে।
সভাপতির বক্তব্যে মাহমুদুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগের ইতিহাস হচ্ছে একনায়কতন্ত্র ও বাকশালের ইতিহাস। আওয়ামী লীগের ইতিহাস ফ্যাসিবাদ ও সংবাদপত্র দলনের ইতিহাস। সংবাদপত্রের কালো দিবস হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন। শেখ সাহেব সংবাদপত্র ধ্বংস করেছেন এবং শেখ হাসিনা কী করেছেন-সেটি আপনারা জানেন। টিউলিপও লন্ডনে এক সাংবাদিকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে। এটা আওয়ামী লীগের জিনের মধ্যে রয়েছে। তাই আওয়ামী লীগের সঙ্গে মানুষের অধিকার ছিন্ন করার ইতিহাসটা স্বাধীনতার পরবর্তীকাল থেকেই চলছে।
সেমিনারের উদ্দেশ্য নিয়ে আমার দেশ সম্পাদক বলেন, আমরা মিডিয়াকে কোটারিমুক্ত করে জাতীয় চরিত্র দিতে চাই। এজন্য আমাদের সংগঠনের নামে ‘ন্যাশনাল’ শব্দে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং এতে প্রথমবারের মতো ঢাকার বাইরের সম্পাদকরাও আছেন। মিডিয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা মিডিয়ার প্রকৃত স্বাধীনতা চাই। অর্থাৎ আমার মত যাতে আমি প্রকাশ করতে পারি, সেটির নিশ্চয়তা। আপনার যদি আমার মত পছন্দ না হয়, তাহলে আপনি লিখে আমার মতের প্রতিবাদ করবেন। তবে আমার কণ্ঠরোধ করবেন না, এটাই আমাদের চাওয়া। এটাই মিডিয়ার প্রকৃত স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে আমাদের অন্তত এই ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
ফ্যাসিবাদের সহযোগীদের সঙ্গে ঐক্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের সহযোগীরা আত্মশুদ্ধি করে আমাদের ঐক্যে আসতে চাইলে আপত্তি নেই। তবে যারা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বা গণহত্যাকে জায়েজ করেছেন-তাদের এই ঐক্যের মধ্যে নেওয়ার সুযোগ নেই। যারা ফৌজদারি অপরাধ করেছে, আমাদের সন্তানদের হত্যায় বৈধতা দিয়েছে-তাদের ক্রিমিনাল আইনে বিচার হতে হবে। মূল প্রবন্ধে মারুফ কামাল খান বলেন, মিডিয়া পুনর্গঠনে স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠন অপরিহার্য। এই কমিশন মিডিয়ার প্রতিটি ক্ষেত্রে বিরাজমান সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের পথ বাতলাবে। তারা নীতি, আইন ও কাঠামো প্রণয়ন করবে। মিডিয়া ও সাংবাদিকদের বিপথগামিতা এবং অপসাংবাদিকতার পথ বন্ধ করবে। সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধে প্রতিমাসে সরকারপ্রধান ও সম্পাদকদের মধ্যে বৈঠক হওয়ার প্রস্তাব করেন তিনি।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে জাতীয় প্রেস ক্লাব নানাভাবে বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত হয়েছে। শেখ হাসিনার ১৭ বছরের মিথ্যাচারের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার কথা বলেন তিনি।
সেমিনারে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী বলেন, শেখ মুজিবের সময়ে ১৬ জুন যদি গণমাধ্যমের কালো দিন হয়, তাহলে হাসিনার ১৭ বছরই ছিল গণমাধ্যমের কালো দিবস। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ফ্যাসিবাদের দোসররা ফিরে আসতে শুরু করেছে। তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে রাস্তায় নেমে কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলব। তবুও আপসকামিতা করব না।
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি ও দৈনিক মানবকণ্ঠ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বলেন, ১৯৭৫ সালে যে চারটি গণমাধ্যম রেখে সবগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, সে চারটি সংবাদপত্র ছিল না। সেগুলো ছিল সরকারের প্রচারমাধ্যম।
সেমিনারে অন্যদের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন নয়া দিগন্ত সম্পাদক সালাহউদ্দিন মোহাম্মদ বাবর, ওয়াদা সম্পাদক ও বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য উপদেষ্টা শফিকুল আলম, নিউ নেশন সম্পাদক মোকাররম হোসেন, বাংলাদেশের খবর সম্পাদক সৈয়দ মেছবাহউদ্দিন আহমেদ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি আবু সালেহ আকন, পিআইবি চেয়ারম্যান ফারুক ওয়াসিফ, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সালেহ নোমান, খুলনা মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন সভাপতি রাশেদুল ইসলাম এবং নিউ টাইমস সম্পাদক সাইফুল ইসলাম প্রমুখ। এছাড়া বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদক ও নির্বাহী সম্পাদকসহ সিনিয়র সাংবাদিকরা সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন।
