Logo
Logo
×

Advertisement

শেষ পাতা

বরেন্দ্রভূমিতে প্রথম মিয়াওয়াকি ফরেস্ট

Advertisement

Icon

তানজিমুল হক, রাজশাহী

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বরেন্দ্রভূমিতে প্রথম মিয়াওয়াকি ফরেস্ট

নওগাঁর সাপাহারে পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল রানার বরেন্দ্র এগ্রো পার্কে বিলুপ্তপ্রায় বিভিন্ন জাতের গাছ। শুক্রবারের ছবি -যুগান্তর

Advertisement

একসময় গ্রামাঞ্চলে হরহামেশায় চোখে পড়ত ঘন জঙ্গল। এখন তেমন একটা দেখা মেলে না। বনাঞ্চল ধ্বংস করে খাদ্যের চাহিদা মেটাতে গড়ে উঠেছে কৃষিজমি। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য তৈরি হয়েছে সড়ক। কলকারখানা আর বসতবাড়ির জন্য উজাড় হয়েছে বন। এর ফলে উত্তরাঞ্চল ক্রমশ মরুভূমির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সাধারণত একটি দেশের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনাঞ্চল থাকা প্রয়োজন। তবে বর্তমানে দেশের মোট ভূমির ১৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ বনভূমি আছে। এর মধ্যে রাজশাহী বিভাগে বনভূমি সর্বনিম্ন অর্থাৎ মাত্র দুই শতাংশ। এমন ভয়াবহ প্রেক্ষাপটে ব্যক্তি উদ্যোগে বরেন্দ্রভূমিতে জাতীয় যুব পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল রানা নিয়েছেন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। নওগাঁর সাপাহার সদরে ‘বরেন্দ্র অ্যাগ্রো পার্ক’ মিশ্র ফলবাগানের পাশাপাশি তৈরি করেছেন মিয়াওয়াকি ফরেস্ট (কৃত্রিম বন)। ৫৫ শতাংশের এই কৃত্রিম বনে বিলুপ্ত প্রায় পাঁচ শতাধিক জাতের দুই হাজার ৭০০ গাছ ও লতাগুল্ম রোপণ করেছেন সোহেল।

এই মিয়াওয়াকি বন উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলার মধ্যে প্রথম। গাছের জাত বিবেচনায় এটি দেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ মিয়াওয়াকি বন। এগুলোর মধ্যে ফলদ, বনজ, ঔষধি, শোভাবর্ধক, বাঁশ, বিলুপ্তপ্রায়, কাটা নিষিদ্ধ, সংরক্ষিত, মহাবিপন্ন ঘোষিত নানা জাতের গাছ রয়েছে। জমি চাষ, জৈব সার, মাটি প্রস্তুত, চারা কেনা, বাঁশের খুঁটি, জৈব মালচিংসহ নানা প্রক্রিয়া শেষে অর্জিত জ্ঞান আর পরিশ্রম করে এ কৃত্রিম বন গড়ে তুলেছেন সোহেল।

সোহেল রানা উচ্চশিক্ষিত। তিনি ২০০৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ছয় বছর সাংবাদিকতা করেন ঢাকায়। কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে নিজ জেলায় ফিরে আসেন তিনি। এরপর সাপাহার উপজেলা সদরের গোডাউনপাড়া এলাকায় গড়ে তোলেন দেড়শ বিঘা আয়তনের বিশাল ‘বরেন্দ্র অ্যাগ্রো পার্ক।’

সোহেল রানা বলেন, ‘মিয়াওয়াকি ফরেস্ট পদ্ধতিতে চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে দেশের প্রথম কৃত্রিম বন তৈরি করা হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার মধ্যে আমিই প্রথম এ উদ্যোগ নিয়েছি। এর মাধ্যমে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সাধারণ বনের চেয়ে কৃত্রিম বনে গাছের বৃদ্ধির হার ১০ গুণ বেশি। এ বনের বিভিন্ন জাতের গাছের কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ ক্ষমতা অন্য গাছের তুলনায় ৩০ গুণ বেশি।’

মিয়াওয়াকি ফরেস্ট মূলত বনায়নের একটি পদ্ধতি। জাপানি উদ্ভিদবিদ ও উদ্ভিদ বাস্তুবিদ্যা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আকিরা মিয়াওয়াকি এই পদ্ধতির উদ্ভাবক। এর উদ্দেশ্য প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মাত্র ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে শতভাগ জৈব, ঘন ও বৈচিত্র্যময় বন তৈরি করা। এর মাধ্যমে ছোট জায়গায় কৃত্রিম বন তৈরি করা যায়। নির্দিষ্ট জলবায়ু পরিস্থিতি বিবেচনা করে শুধু স্থানীয় প্রজাতিগুলোই রোপণ করা হয়। উদ্ভিদ ও প্রকৃতি গবেষক মোকারম হোসেন বলেন, ‘দেশের বনাঞ্চল ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। বরেন্দ্র শুষ্ক এলাকা। এ অঞ্চলে ঘন করে বিলুপ্তপ্রায় দেশি গাছ দিয়ে বনাঞ্চল তৈরি করা যায়। এ ক্ষেত্রে মিয়াওয়াকি পদ্ধতি অত্যন্ত কার্যকর। বনাঞ্চল গড়ে উঠলে খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা মিটবে। মানুষের পাশাপাশি পাখি ও কীটপতঙ্গের খাদ্যসংস্থান হবে।’ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ও উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞ মনজুর হোসেন বলেন, ‘বরেন্দ্র অঞ্চলে মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে বনাঞ্চল গড়ে তোলা কঠিন। কারণ এ অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কম। তবে বনাঞ্চল গড়ে উঠলে গাছের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। বাড়বে বৃষ্টিপাত। এর ফলে এলাকাটি শুষ্কতা থেকে রক্ষা পাবে। কার্বণ শোষণ করবে। পরিবেশের ভারসাম্য তৈরি হবে।’

এদিকে মিয়াওয়াকি বনের গাছ অন্য গাছের তুলনায় ৩০ গুণ বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করায় এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও রয়েছে। এ অঞ্চলে কার্বন ক্রেডিট নিয়ে সাসটেইনেবল অ্যাগ্রিকালচার ফাউন্ডেশন (সাফ) নামে একটি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো. ফরহানুল হক বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কৃষকদের বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টিতে কৃত্রিম বনভিত্তিক কার্বন ক্রেডিট প্রকল্প বাংলাদেশের কৃষি খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। বিশেষ করে উত্তরের উৎপাদনসমৃদ্ধ অঞ্চলে এ ধরনের প্রকল্প টেকসই কৃষি উন্নয়ন ও জলবায়ু অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ সৃষ্টি করবে।’

সোহেল রানা বলেন, ‘মিয়াওয়াকি বন শুধু পরিবেশ সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধির মাধ্যম নয়, এটি ভবিষ্যতে কার্বন ক্রেডিট বিক্রিরও একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। এ বনের গাছ অন্য সাধারণ বনের থেকে অতি দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে পারে। এ কারণে মিয়াওয়াকি বন থেকে কার্বন বিক্রি করে আয়ের সুযোগ আছে। দেশে কয়েকটি সংস্থা কার্বন কেনাবেচা নিয়ে কাজ করছে।’

এই কৃষি উদ্যোক্তা বলেন, ‘মিয়াওয়াকি বন গাছের জীবন্ত জাদুঘর। ছুটির দিনে বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের এনে গাছ ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা আছে। পাশাপাশি এ অঞ্চলের কৃষি উদ্যোক্তা এবং প্রান্তিক কৃষকদেরও কৃত্রিম বন তৈরিতে যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে উৎসাহিত করা হবে। এর ফলে উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা কার্বন বিক্রি করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারবেন।’

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

তেল পেঁয়াজ ডাল চিনি ছোলা খেজুরের দাম বাড়ছে রোজার আগেই কারসাজি

রোজার আগেই কারসাজি

বরেন্দ্রভূমিতে প্রথম মিয়াওয়াকি ফরেস্ট

বরেন্দ্রভূমিতে প্রথম মিয়াওয়াকি ফরেস্ট

ঋণ নয় অনুদান চায় বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ জলবায়ু তহবিল

প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ জলবায়ু তহবিল

পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে উদ্যোগ কেনা হবে ৬,৬০৯ কোটি টাকার ৫,৮৩০ গাড়ি

কেনা হবে ৬,৬০৯ কোটি টাকার ৫,৮৩০ গাড়ি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম