Logo
Logo
×

Advertisement

শেষ পাতা

ঋণ নয় অনুদান চায় বাংলাদেশ

প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ জলবায়ু তহবিল

Advertisement

Icon

আলমগীর মিয়া

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ জলবায়ু তহবিল

Advertisement

বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ দায়ী নয়। কিন্তু জলবায়ু বিপর্যয়ের চরম মূল্য দিতে হচ্ছে এ দেশকে। ঘন ঘন বন্যা, ঘূর্ণিঝড় আর নদীভাঙনে নিঃস্ব হচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। নষ্ট হচ্ছে কর্মদিবস, চাপে পড়ছে দেশের অর্থনীতি। এই সংকট কাটাতে প্রয়োজন বিপুল আন্তর্জাতিক অর্থায়ন। তবে ঋণ নয়, ক্ষতিপূরণ হিসাবে শিল্পোন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে অনুদান চায় বাংলাদেশ। আগামী ৯ নভেম্বর তুরস্কের আন্তালিয়ায় শুরু হতে যাওয়া জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে (কপ-৩১) এ বিষয়টিকেই সামনে রাখা হচ্ছে। এক্ষেত্রে ঢাকার স্পষ্ট বার্তা-কাগজে-কলমে ফাঁপা প্রতিশ্রুতি নয়, চাই পরিমাপযোগ্য বাস্তবায়ন। পাশাপাশি বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় টেকসই ‘সবুজ অর্থনীতিতে’ জোর দেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রওনাকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান খুবই সামান্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ও তাপপ্রবাহসহ বিভিন্ন জলবায়ুজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করে অভিযোজন ও জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে আসছে। তিনি বলেন, ঋণ নয়, ক্ষতিপূরণ হিসাবে শিল্পোন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে অনুদান চায় বাংলাদেশ। সারা বিশ্বে প্রয়োজন ৬শ বিলিয়ন ডলার। আমাদের হয়তো এই বরাদ্দ থেকে ০.৪ শতাংশ অর্থ পাওয়ার কথা, তাও দিচ্ছে না। কাজী রওনাকুল ইসলাম বলেন, এ বছর আসন্ন কপ সম্মেলনে আমরা তিনটি সাইড ইভেন্ট করব। আশা করছি কপ সম্মেলন থেকে আমরা ভালো কিছু ফল নিয়ে আসতে পারব। তিনি বলেন, বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় সবুজ অর্থনীতির দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এজন্য বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

পরিবর্তনের অভিঘাতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক চাপ : জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। পরিবর্তনের অভিঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক চাপ তৈরি করছে। বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে ফসল নষ্ট হলে কৃষকের আয় কমে, খাদ্য সরবরাহে চাপ তৈরি হয় এবং বাজারে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ে। নদীভাঙন ও লবণাক্ততার কারণে মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে নগরের আবাসন, পানি, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। তাপপ্রবাহ শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা কমিয়ে উৎপাদনশীলতা হ্রাস করে এবং বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ায়। ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টারের হিসাব অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গত ছয় বছরে বাংলাদেশের ৫৭ লাখ মানুষ বাস্তুহারা হয়েছেন। ঢাকার বস্তি এলাকায় বসবাসকারীদের প্রায় ৭০ শতাংশই পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে স্থানান্তরিত বলে জানিয়েছে অভিবাসনবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএমও। বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ক্লাইমেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশে মাঝারি মেয়াদে অন্তত ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত অর্থায়ন প্রয়োজন হতে পারে। যথাযথ অভিযোজন ও প্রশমন উদ্যোগ না নিলে কৃষি উৎপাদন, অবকাঠামো ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কাও রয়েছে।

আসন্ন কপ সম্মেলনে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার : সম্প্রতি দেশের ৩৩টি সংগঠন ‘রোড টু আন্তালিয়া’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বেশ কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরেছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্যারিস চুক্তির এক দশক পরেও বৈশ্বিক জলবায়ু কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গভীর সংকটের মুখোমুখি। যদিও এর মূল কাঠামোটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবুও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস, অভিযোজন, অর্থায়ন, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। বাংলাদেশ কয়েকটি বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছে। যেমন-বৈশ্বিক মনোযোগ কেবল অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির ওপর না রেখে, তা পরিমাপযোগ্য বাস্তবায়নের দিকে সরিয়ে নেওয়া দরকার। বাস্তবায়নকেই জলবায়ু নেতৃত্বের প্রকৃত মাপকাঠি হিসাবে গণ্য করা। এছাড়া বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে প্যারিস চুক্তির মূল স্তম্ভগুলোর ক্ষেত্রে অনুদান-ভিত্তিক সহায়তার নিশ্চয়তা প্রদান করা।

অনুদান চায় বাংলাদেশ : প্রতিবেদনে বলা হয়, এনডিসি ৩.০ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ৯০.২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আন্তর্জাতিক সহায়তা অবশ্যই শতভাগ অনুদান অর্থায়ন করতে হবে। এমন কোনো ঋণ পদ্ধতি ব্যবহার করা যাবে না, যা জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার মানুষের নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অর্থ ব্যয়ের চাপে ফেলে।

জলবায়ু ঝুঁকি নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেই : প্রতি বছর জাতিসংঘের আয়োজনে ‘কনফারেন্স অব দ্য পার্টিস’ (কপ) সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশসমূহের সরকার প্রধানরা এসে কার্বন নিঃসরণ ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ রাখা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণে প্রয়োজনীয় অর্থ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন। ২০২৪ সালে আজারবাইজানের বাকুতে জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে (কপ-২৯) উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে বার্ষিক ৩০ হাজার কোটি ডলার পাওয়ার প্রতিশ্রুতি মিলে। এই চুক্তি ২০৩৫ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করার কথা। এ অবস্থায় আগামী ৯ নভেম্বর থেকে তুরস্কের আন্তালিয়ায় জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন (কপ-৩১) শুরু হতে যাচ্ছে। যেখানে বিশ্বের ১৯০টির বেশি দেশ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের অঙ্গীকার করবে। মূল লক্ষ্য হলো, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহযোগিতা প্রদানে উন্নত দেশগুলোর দায়িত্ব নিশ্চিত করা। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, বাস্তবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি বা ঝুঁকি নিরসনে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রত্যক্ষ হয়নি বিগত কপ সম্মেলনগুলোতে।

সবুজ অর্থনীতির বিকাশ ঘটানো সম্ভব : জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর এনডিসি (জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান) ৩.০-এর অগ্রাধিকারসমূহ কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন বৃদ্ধি করতে হবে। অর্থায়নের নতুন সুযোগ কাজে লাগানো এবং জলবায়ু অগ্রাধিকারগুলোকে বাস্তবসম্মত ও বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্পে রূপান্তরের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা। তাদের মতে, বাংলাদেশ চাইলে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা এবং সবুজ অর্থনীতির বিকাশ ঘটাতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ থেকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শিল্পকারখানার জ্বালানি দক্ষতা থেকে পরিবেশবান্ধব কৃষি, সামাজিক বনায়ন থেকে সুন্দরবন সংরক্ষণ, প্রতিটি ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গে পরিবেশ রক্ষার সমন্বয় ঘটানো সম্ভব। বাংলাদেশের সামনে এখন তাই একটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলছে।

প্রাপ্য অর্থ আদায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো জরুরি : জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ২০২২ সালে তার জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ন্যাপ) চূড়ান্ত করে, যাতে ১৪টি জলবায়ু ঝুঁকি চিহ্নিত করে ২০৫০ সাল পর্যন্ত ১১০টি কর্মকৌশল প্রস্তাব করা হয়েছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজন ২৩০ বিলিয়ন ডলার, যার বেশির ভাগই আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। জলবায়ু সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী শিল্পোন্নত দেশগুলোর নৈতিক দায়িত্ব বাংলাদেশের মতো ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তা করা। ২০২৩ সালে কপ-২৮-এ গৃহীত লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে বাংলাদেশের প্রাপ্য অর্থ ত্বরিত আদায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো জরুরি।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আন্তর্জাতিক মহলের সহযোগিতা কামনা করেছেন। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে মন্ত্রী গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা এবং জ্বালানি খাতের চাপসহ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে জলবায়ু ঝুঁকি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

জলবায়ু পরিবর্তন ও কিয়ামতের আলামত

জলবায়ু পরিবর্তন ও কিয়ামতের আলামত

জলবায়ু সংকটে সবচেয়ে বড় বিপদে বাংলাদেশ

জলবায়ু সংকটে সবচেয়ে বড় বিপদে বাংলাদেশ

ঢাকার বাতাস আজ কতটা দূষিত?

ঢাকার বাতাস আজ কতটা দূষিত?

ধেয়ে আসছে ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ‘এল নিনো’

বিশ্বব্যাপী চরম আবহাওয়ার শঙ্কা ধেয়ে আসছে ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ‘এল নিনো’

‘সুপার এল নিনো’ নিয়ে নতুন সতর্কতা, যে সংকটের মুখোমুখি হতে পারে বিশ্ব

‘সুপার এল নিনো’ নিয়ে নতুন সতর্কতা, যে সংকটের মুখোমুখি হতে পারে বিশ্ব

‘বিশেষভাবে শক্তিশালী’ এল নিনো কবে শুরু হবে, জানাল জাতিসংঘ

‘বিশেষভাবে শক্তিশালী’ এল নিনো কবে শুরু হবে, জানাল জাতিসংঘ

আরও পড়ুন

তেল পেঁয়াজ ডাল চিনি ছোলা খেজুরের দাম বাড়ছে রোজার আগেই কারসাজি

রোজার আগেই কারসাজি

বরেন্দ্রভূমিতে প্রথম মিয়াওয়াকি ফরেস্ট

বরেন্দ্রভূমিতে প্রথম মিয়াওয়াকি ফরেস্ট

ঋণ নয় অনুদান চায় বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ জলবায়ু তহবিল

প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ জলবায়ু তহবিল

পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে উদ্যোগ কেনা হবে ৬,৬০৯ কোটি টাকার ৫,৮৩০ গাড়ি

কেনা হবে ৬,৬০৯ কোটি টাকার ৫,৮৩০ গাড়ি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম