Logo
Logo
×

Advertisement

আন্তর্জাতিক

বিশ্বব্যাপী চরম আবহাওয়ার শঙ্কা

ধেয়ে আসছে ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ‘এল নিনো’

Advertisement

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০১:৫০ পিএম

ধেয়ে আসছে ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ‘এল নিনো’

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

প্রশান্ত মহাসাগরে দ্রুত ঘনীভূত হতে থাকা একটি শক্তিশালী ‘এল নিনো’ জলবায়ু পরিস্থিতি আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ধরণ ওলটপালট করে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন আবহাওয়াবিদরা। তাদের মতে, এটি ইতিহাসে রেকর্ডকৃত অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো ইভেন্টে রূপ নিতে পারে। 

নিউইয়র্ক স্টেট ইউনিভার্সিটির বায়ুমণ্ডলীয় ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক পল রাউন্ডির মতে, ‘গত ১৪০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।’ 

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, খুব শিগগিরই এই পরিস্থিতি স্পষ্ট হয়ে উঠবে এবং তা অন্তত আগামী শীতকাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এর তীব্রতা ও স্থায়িত্বের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, বন্যা, তীব্র তাপপ্রবাহ এবং খাদ্য ও পানি সরবরাহে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটতে পারে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস একে একটি জরুরি জলবায়ু সতর্কতা হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘এল নিনো পরিস্থিতি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করবে।’ 

‘এল নিনো’ কী? 

এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র, যা সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পর পর দেখা দেয়। ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিয়ত বায়ু (ট্রেড উইন্ড) দুর্বল হয়ে পড়লে মহাসাগরের উপরিভাগে উষ্ণ পানি জমতে শুরু করে—যার ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

উষ্ণায়নের এই অঞ্চলটি আকারে প্রায় আমেরিকার মূল ভূখণ্ডের সমান এবং এটি নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলেই ঘটে থাকে। তবে এর প্রভাব অনুভূত হয় বিশ্বজুড়ে।

নাসা-র গডার্ড ইনস্টিটিউট ফর স্পেস স্টাডিজের পরিচালক গ্যাভিন স্মিডট জানান, ‘ক্রান্তীয় অঞ্চলের বায়ুমণ্ডলের এই পরিবর্তন হাজার হাজার মাইল দূরের মধ্য-অক্ষাংশের আবহাওয়ার ওপর প্রভাব ফেলে। এটি আসলে একটি বৈশ্বিক চেইন রিঅ্যাকশন বা প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, যেখানে এল নিনো হলো প্রথম ডমিনো (ঘুঁটি) যা পুরো আবহাওয়া চক্রকে ভেঙে ফেলে।’ 

জলবায়ুতে কী ধরনের প্রভাব পড়বে?

এল নিনোর প্রভাব অঞ্চলভেদে চরম ও ভিন্ন রকম হতে পারে। কোথাও দেখা দেবে ভয়াবহ খরা, আবার কোথাও দেখা দেবে নজিরবিহীন বন্যা।

খরা ও পানির সংকট: মধ্য আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার কিছু অংশ এল নিনোর কারণে তীব্র গরম ও শুষ্ক হয়ে ওঠে। এর ফলে কৃষি, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে। ইতোমধ্যে হন্ডুরাসের প্রায় ৭৫টি পৌরসভা মারাত্মক খরা পরিস্থিতির মুখোমুখি এবং রাজধানী তেগুসিগালপায় পানি ব্যবহারের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।

বন্যা ও ফসলের ক্ষতি: বিপরীত চিত্র দেখা যাবে দক্ষিণ আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে। সেখানে এল নিনোর প্রভাবে মুষলধারে বৃষ্টি ও বিধ্বংসী বন্যা হতে পারে। ২০১৫-২০১৬ সালের এল নিনোর সময় ফসলহানির কারণে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ খাদ্য সহায়তার মুখোমুখি হয়েছিল।

দাবানল: বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে এল নিনোর কারণে সৃষ্টি হওয়া তীব্র তাপ ও খরা পরিস্থিতি অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র এবং আমাজন রেইনফরেস্টে ভয়াবহ দাবানলের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে। 

সামুদ্রিক ঝড়, প্রবাল প্রাচীর এবং আটলান্টিক হারিকেন

ক্রান্তীয় অঞ্চলের ঝড় সৃষ্টিতেও এল নিনো বড় ভূমিকা পালন করে।

আটলান্টিক মহাসাগর: আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর বায়ুর গতিবেগের তারতম্য (উইন্ড শিয়ার) বাড়িয়ে দেয় এল নিনো, যা ঝড় বা হারিকেন সৃষ্টিতে বাধা দেয়। 

আবহাওয়া বিজ্ঞানী ব্রায়ান ট্যাং জানান, প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে আটলান্টিকে মেঘ, বজ্রঝড় ও ঘূর্ণিঝড় কমে যায়। তবে ঝড় কম হলেও বিপদের আশঙ্কা কম নয়; কোনো ঝড় একবার শক্তিশালী হারিকেনে রূপ নিলে তা মারাত্মক ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে।

প্রশান্ত মহাসাগর: প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনোর প্রভাব সম্পূর্ণ উল্টো। এখানে এটি আরও ঘন ঘন এবং শক্তিশালী ঝড় তৈরিতে জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।

বাস্তুতন্ত্র ও কৃষি: সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে প্রবাল প্রাচীরগুলো হুমকির মুখে পড়ছে এবং ‘কোরাল ব্লিচিং’ বা প্রবাল বিবর্ণ হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। অন্যদিকে, ভারতের আম চাষিরা জানিয়েছেন যে অস্বাভাবিক আবহাওয়ার কারণে আমের মুকুল ও ফলন ব্যাহত হয়েছে, যা তাদের উৎপাদনে বড় ধস নামিয়েছে। 

বিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এল নিনো নিজে শক্তিশালী হচ্ছে—এমন কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নেই। তবে জলবায়ু পরিবর্তন এল নিনোর প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। 

জার্মানির ন্যাশনাল ওসিয়ানিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী মাইকেল ম্যাকফ্যাডেন বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক এল নিনোর খরাকে চরম খরায় রূপান্তর করতে পারে।’ উষ্ণ বায়ুমণ্ডল বেশি জলীয় বাষ্প ধরে রাখতে পারে বলে চরম বৃষ্টিপাত ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ে, আবার উচ্চ তাপমাত্রা মাটির আর্দ্রতা দ্রুত শুষে নিয়ে খরাকে তীব্র করে তোলে।

প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ 

এল নিনোর একটি ইতিবাচক দিক হলো—এটি অত্যন্ত ধীরগতিতে তৈরি হয় এবং কয়েক মাস আগেই এর পূর্বাভাস পাওয়া যায়।

তাই বিজ্ঞানীরা সমুদ্রের তাপমাত্রা এবং বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সরকারকে আগে থেকেই সতর্ক করতে পারেন। ম্যাকফ্যাডেন জানান, দীর্ঘমেয়াদী আবহাওয়ার পূর্বাভাসের কারণে কোন অঞ্চলে খরা বা বন্যা হবে তা আগে থেকেই জানা সম্ভব। ফলে ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে এবং ফসল রক্ষা বা বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পাওয়া যায়।

লেখক: জশ এক্সেলরড, রিপোর্টার, ডয়চে ভেলে 

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

তাপে পুড়বে বিশ্ব, তাণ্ডব শুরু ডিসেম্বরে

তাপে পুড়বে বিশ্ব, তাণ্ডব শুরু ডিসেম্বরে

জলবায়ু পরিবর্তন ও কিয়ামতের আলামত

জলবায়ু পরিবর্তন ও কিয়ামতের আলামত

বিশ্বে এল নিনোর প্রভাবে আগামী ৬ মাসে প্রাণ হারাতে পারে সাড়ে ৪ লাখ মানুষ

বিশ্বে এল নিনোর প্রভাবে আগামী ৬ মাসে প্রাণ হারাতে পারে সাড়ে ৪ লাখ মানুষ

জলবায়ু সংকটে সবচেয়ে বড় বিপদে বাংলাদেশ

জলবায়ু সংকটে সবচেয়ে বড় বিপদে বাংলাদেশ

আগামী ছয় মাসে ‘বিস্ময়কর’ গরমের আভাস, সাড়ে ৪ লাখ মৃত্যু শঙ্কা

আগামী ছয় মাসে ‘বিস্ময়কর’ গরমের আভাস, সাড়ে ৪ লাখ মৃত্যু শঙ্কা

শীতের মৌসুমেও তীব্র গরমে পুড়বে গোটা বিশ্ব, ডব্লিউএমওর হুঁশিয়ারি

শীতের মৌসুমেও তীব্র গরমে পুড়বে গোটা বিশ্ব, ডব্লিউএমওর হুঁশিয়ারি

আরও পড়ুন

আলজাজিরার বিশ্লেষণ ৭ অক্টোবরের পর মধ্যপ্রাচ্যে কে শক্তিশালী, কে দুর্বল?

৭ অক্টোবরের পর মধ্যপ্রাচ্যে কে শক্তিশালী, কে দুর্বল?

বিশ্বসেরার মুকুট হারাল লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর

বিশ্বসেরার মুকুট হারাল লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর

হুথির হামলায় রিয়াদ বিমানবন্দরে উড়োজাহাজে আগুন

হুথির হামলায় রিয়াদ বিমানবন্দরে উড়োজাহাজে আগুন

নভেম্বরের আগে ইরানে হামলা করবে না যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্প

নভেম্বরের আগে ইরানে হামলা করবে না যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্প

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম