আগামী ছয় মাসে ‘বিস্ময়কর’ গরমের আভাস, সাড়ে ৪ লাখ মৃত্যু শঙ্কা
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩৭ পিএম
সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আগামী ছয় মাসে ব্যাপক তীব্রতার এল নিনোর কারণে অতিরিক্ত তাপে বিশ্বজুড়ে চার লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন জলবায়ু বিজ্ঞানীরা।
জলবায়ু সংকটের কারণে ইতিমধ্যে বেড়ে যাওয়া তাপমাত্রার সঙ্গে যুক্ত হবে এই অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা। ইন্দোনেশিয়া থেকে ভারত, নাইজেরিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত বিশ্বজুড়েই এর প্রভাব পড়বে। এল নিনোর সঙ্গে যুক্ত খরা, দাবানল এবং বন্যার কারণেও আরও অনেক মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আঞ্চলিক পর্যায়ে এই তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা নিরূপণ করেছেন গবেষকরা। তাদের মতে, এই পূর্বাভাসের মাধ্যমে কোথায় মানুষকে রক্ষা করার ব্যবস্থা নিলে প্রাণ বাঁচানো সম্ভব, তা চিহ্নিত করা যাবে। এর মধ্যে থাকতে পারে উন্নত তাপ পূর্বাভাস ব্যবস্থা, মানুষের আশ্রয় নেওয়ার জন্য শীতাতপ কেন্দ্র, সবচেয়ে গরম সময়ে চিকিৎসাকেন্দ্রে বাড়তি জনবল এবং বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য সুরক্ষা ব্যবস্থা।
বর্তমানে বিশ্ব উষ্ণ করে তোলা এই এল নিনো সোমবার এই ঘটনার ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে, যা প্রত্যাশিত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর কয়েক মাস আগেই ঘটেছে। আগের ঘটনাগুলোর চেয়ে এই তাপ এতটাই বেশি যে বিজ্ঞানীরা একে ‘বিস্ময়কর’ এবং ‘গডজিলা-স্তরের’ বলে অভিহিত করেছেন। এল নিনো প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনা হলেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এর তীব্রতা আরও বাড়তে পারে।
এই প্রতিবেদনের সহলেখক এবং শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সহপ্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক মাইকেল গ্রিনস্টোন বলেন, ‘চার লাখ ৫১ হাজার মানুষের এই সংখ্যাটা এতটাই বড় যে এটা অনুভূতিশূন্য মনে হতে পারে। তবে এর মধ্যে আছেন বাবা-মা এবং সন্তানেরা, দাদা-দাদি এবং প্রতিবেশীরা, কর্মস্থলে যাওয়া মানুষ, পরিবারের যত্ন নেওয়া মানুষ, নিজেদের জীবনযাপন করা মানুষেরা।’
এই মৃত্যুর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ের জন্য, যেখানে শেষ হচ্ছে বর্তমান তাপমাত্রার পূর্বাভাস। তবে ২০২৭ সালের জুন বা জুলাই পর্যন্ত তাপজনিত মৃত্যুর উচ্চ হার অব্যাহত থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আগামী ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশ নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সুদান, ভারত এবং ব্রাজিল। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ২০টি দেশের তালিকায় আছে যুক্তরাষ্ট্রও, যেখানে অতিরিক্ত ৩ হাজার ৫০০ তাপজনিত মৃত্যুর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াও।
গবেষকদের মতে, এই এল নিনো একটি ‘ভবিষ্যতের পোস্টকার্ড’ও বটে। কারণ এটি তাপমাত্রাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে, যা জলবায়ু সংকট আগামী বিশ বছরে দেখাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কলে শাখার এই প্রতিবেদনের আরেক সহলেখক ড. তাম্মা কার্লেটন বলেন, ‘জরুরি প্রতিক্রিয়া বাড়ানো এবং আমাদের প্রচেষ্টাকে আরও সঠিকভাবে লক্ষ্যবস্তু করতে পারলে এই বছর অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। তবে বিশ বছর পর, যখন আজকের চরম তাপমাত্রাই স্বাভাবিক হয়ে যাবে, তখন আমরা যেন ক্রমাগত জরুরি অবস্থায় না থাকি। ভবিষ্যতে প্রাণ বাঁচাতে পারে এমন সরঞ্জাম নকশা, স্থাপন এবং মূল্যায়নের জন্য আমাদের এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।’
বিশ্বের ২৪ হাজার ৩৭৮টি অঞ্চলে তাপমাত্রা এবং অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর মধ্যে মাস-ভিত্তিক সম্পর্ক অনুসরণকারী পর্যালোচিত পদ্ধতি ব্যবহার করে এই পূর্বাভাস তৈরি করা হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে আগামী মাসগুলোতে এল নিনোর কারণে আরও তাপমাত্রা বৃদ্ধির পূর্বাভাস। ১৯৯৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গড় মাসিক তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যাকে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে।
গ্রিনস্টোন বলেন, ‘ফসলে কখন আঘাত আসতে পারে, তার পূর্বাভাস দেওয়া এবং আগাম সতর্কতা জানানো মানুষ আগে থেকেই করে আসছে। এই নতুন প্রতিবেদন আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে একই কাজ করার পথ খুলে দিচ্ছে, আমি বলবো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আর সেটা হলো মৃত্যু।’ এই প্রতিবেদনটি একটি পর্যালোচিত জার্নালে জমা দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। তবে পরিস্থিতির জরুরি অবস্থা বিবেচনায় এটি চেপে রাখা দায়িত্বজ্ঞানহীনতা হতো বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এল নিনোর প্রভাবে খাদ্য সরবরাহও ব্যাহত হবে। আগস্টে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করে জানিয়েছিল, এর প্রভাবে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ তীব্র ক্ষুধার মুখে পড়তে পারে এবং দাম বেড়ে যেতে পারে। ১৮৭৭-৭৮ সালের একটি বড় এল নিনোর কারণে খরা এবং দুর্ভিক্ষে পাঁচ কোটিরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, যেখানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ভারত, ব্রাজিল এবং চীন।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক ফ্রেডেরিকে অটো সোমবার গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘বর্তমান এই এল নিনো ঘটনাটি জলবায়ু ব্যবস্থায় শক্তির এক বিশাল পুনর্বণ্টন এবং এটি বিপজ্জনক। কারণ এটি ঘটছে এমন এক জলবায়ু ব্যবস্থার ওপর, যা মানুষের প্রভাবে ইতিমধ্যেই অনেক বেশি উষ্ণ হয়ে উঠেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাই বিশ্বের অনেক জায়গায় আমরা এমন সব তাপ চরম অবস্থা দেখবো, যা আগে কখনো দেখা যায়নি, স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পানির সংকটের ওপর যার সবরকম প্রভাব পড়বে। এল নিনো আসে এবং যায়, তবে যতদিন আমরা জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়াতে থাকবো, ততদিন এটি ক্রমশ উষ্ণতর একটি ভিত্তির ওপর ঘটতে থাকবে, যা কমিউনিটিগুলোর জন্য এর প্রভাব সামাল দেওয়া আরও কঠিন করে তুলবে।’
