শিল্প ও সেবা খাত চাঙা করতে ৬০ হাজার কোটি টাকা
প্রণোদনার ঋণ ছাড়ে গতি নেই ৪ মাসেও
মোট ঋণ ছাড় হয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ * বন্ধ শিল্প চালুর কোনো অর্থই ছাড় হয়নি
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শিল্প ও সেবা খাত সচল ও উৎপাদন বাড়াতে ৪ মাস আগে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু চার মাসে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের গতি অত্যন্ত ধীর। প্যাকেজ ঘোষণার প্রায় ৩ মাস পর তহবিল উৎস্য নিশ্চিত করতে ১৭ ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। প্যাকেজের বিভিন্ন তহবিল ব্যবহারের জন্য ৪ মাসেও সব ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করেনি। চুক্তি না করলে প্যাকেজের আওতায় ঋণ বিতরণ করতে পারবে না। মূল প্যাকেজ থেকে এখনো কোনো ঋণ বিতরণ হয়নি। তবে সহযোগী বিভিন্ন প্যাকেজ থেকে খুব সীমিত আকারে ঋণ বিতরণ শুরু হয়েছে। ব্যাংকগুলোর প্যাকেজের আওতায় ঋণ বিতরণের জন্য উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে আবেদনপত্র জমা নিচ্ছেন। এগুলো যাচাই-বাছাই করে তারা খুব কম আবেদনই কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠিয়েছেন। এর মধ্যে বন্ধ শিল্প চালুর বিষয়ে এখন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো কোনো আবেদনই কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠায়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, ২৩ মে বন্ধ ও আংশিক বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো চালু করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠন করে। এর মধ্যে ৪১ কোটি টাকা নেওয়া হবে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য থেকে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকার জোগান দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলো থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সময় লেগেছে। এখন ব্যাংকগুলো এই তহবিলের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করছে। এই চুক্তির পর তহবিল থেকে ঋণ বিতরণ করা হবে। এখনো সব ব্যাংক চুক্তি করেনি। আলোচ্য তহবিল থেকে সাধারণ ঋণ গ্রহীতারা ৬ শতাংশ সুদে, বড় শিল্প ৭ শতাংশ সুদে ও স্টার্টআপ উদ্যোক্তারা ৪ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন।
৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল থেকে গত আগস্ট পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। যা মোট প্রণোদনার ১০ শতাংশ। এসব ঋণ নিয়মিত উদ্যোক্তাদের মধ্যেই দেওয়া হয়েছে। নতুন উদ্যোক্তা বা বন্ধ কোনো শিল্প-কারখানায় দেওয়া হয়নি। যেসব শিল্প-কারখানা বন্ধ রয়েছে সেগুলোর প্রায় সবই খেলাপি। এ কারণে তারা নতুন ঋণ পাচ্ছে না। তবে বেশ কিছু বন্ধ কারখানা বিভিন্ন ব্যাংকে আবেদন করেছে। কিন্তু ঋণ খেলাপি থাকায় তাদের আবেদন ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠাচ্ছে না। ফলে বন্ধ কারখানাগুলো প্রণোদনার ঋণ পাচ্ছে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, যে কোনোভাবে টাকার সংস্থান করে খেলাপি ঋণ নবায়নের মাধ্যমে খেলাপি মুক্ত হতে হবে। তারপরই তারা প্রণোদনার ঋণ পেতে পারেন। ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলের বেশ কয়েকটি অংশ রয়েছে। এর মধ্যে ফ্রিশিপমেন্ট ক্রেডিট খাতে রয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল। তার মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের জন্য রয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল। এর মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে দেড় হাজার কোটি টাকা। সৃজনশীল অর্থনীতি গঠনের জন্য বরাদ্দ ৫০০ কোটি টাকার সিংহভাগই বিতরণ করা হয়েছে। স্টার্টআপ ফান্ডের ৫০০ কোটি টাকার বিপরীতে ২৬ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
বন্ধ ও আংশিক শিল্প-কারখানা চালু করতে ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল রয়েছে। এ তহবিল থেকে অর্থ বিতরণের জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে আবেদন সংগ্রহ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ১২২টি আবেদনপত্র জমা পড়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকগুলো পর্ষদে উপস্থাপন করতে পেরেছে মাত্র ৫৫টি। এর সবগুলো এখনো অনুমোদন হয়নি। পর্যদ সেগুলোর বিষয়ে আরও পর্যালোচনা করতে বলেছে। ফলে এ তহবিলের আওতায় এখনো কোনো অর্থ ছাড় করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এসব খাতের বেশিরভাগ শিল্প ঋণ খেলাপি। যে কারণে ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়া এগোচ্ছে না। এছাড়া ঋণ বিতরণের পর তা আদায়ের দায়িত্ব ব্যাংকগুলোর। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা রয়েছে খেলাপি ঋণ কোনোক্রমেই বাড়ানো যাবে না। বন্ধ কারখানায় ঋণ নিলে সেগুলো যদি ফের খেলাপি হয় তখন ব্যাংকগুলোর ওপরই চাপ বাড়বে। এ কারণে তারা এ তহবিলের ঋণ ছাড় করতে খুব সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছে।
ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে আবেদন সংগ্রহ করে সেগুলো নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করছে। দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে তারা কারখানা সচল করতে পারবে কিনা-সেটিও দেখা হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছে। বন্ধের কারণ জানতে চাচ্ছে। এর মধ্যে বেশ কিছু কারখানা বন্ধ হয়েছে মালিকানার জটিলতার কারণে। সেগুলো নিরসন করতে বলা হয়েছে। গ্যাস বিদ্যুতের জোগান নিশ্চিত করতে তার একটি পত্র ব্যাংকে দিতে বলা হয়েছে। এসব ঝুঁকি বিবেচনা করে যেসব প্রকল্প চালুর যোগ্য হবে, বিবেচিত হবে কেবল সেগুলোই ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠাবে। যে কারণে এ তহবিলের অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়াটি ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
ব্যাংকাররা জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তহবিল পেতে হলে অনেক শর্ত মানতে হয়। ব্যাংকগুলোর পক্ষে যেমন এসব শর্ত পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা কঠিন, তেমনি গ্রাহকরাও সব শর্ত বাস্তবায়ন করতে পারে না। যে কারণে এসব তহবিলের ঋণ বিতরণ বিলম্বিত হয়।
এছাড়া প্রণোদনার ঋণের বিষয়ে ব্যাংকগুলোর বাস্তব অভিজ্ঞতা ভালো নয়। কারণ করোনার সময় ও করোনার পরে বৈশ্বিক মন্দা মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রণোদনার যেসব ঋণ দেওয়া হয়েছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলোর অবস্থা ভালো নয়। খেলাপি হচ্ছে, বা খেলাপির আগে বিশেষ সুবিধায় নবায়ন করছে। কিন্তু ঋণ আদায় হচ্ছে না। নতুন প্রণোদনার ঋণ নিয়ে ব্যাংকগুলো এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে চাচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, প্রণোদনার আওতায় শুধু ঋণ দিলেই হবে না। এর সঙ্গে চলতি মূলধনের অর্থও দিতে হবে। ৬০ হাজার কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে কমপক্ষে ৩০ হাজার কোটি টাকার চলতি মূলধন ঋণ দিতে হবে। এতো ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা অনেক ব্যাংকেরই নেই। এতে হঠাৎ করে ঋণ প্রবাহ বেড়ে গিয়ে ব্যাংক খাতে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। ফলে সব বিষয়ই ব্যাংকগুলোকে ভাবতে হচ্ছে।
