সাঈদ খোকন পরিবারের ২৯৭ কোটি টাকা কর ফাঁকি
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কাগুজে কোম্পানি খুলে দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি ও জবরদখলের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ রাখতেন সেসব কোম্পানির অ্যাকাউন্টে। সময়-সুযোগ বুঝে সেই অর্থ অস্ট্রেলিয়ায় পাচার করে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। কর ফাঁকি দিতে নামে-বেনামে গুলশান-বনানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়েছেন বিশাল সাম্রাজ্য। স্ত্রী, মা-বোন এবং নিজে ১৪০ কোটি টাকা সাদা (অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ) করেছেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন ও তার পরিবারের কর ফাঁকি অনুসন্ধান করে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। প্রাথমিকভাবে সাঈদ খোকন পরিবারের ব্যাংক হিসাবে প্রায় দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকার লেনদেন ও প্রাথমিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ২৯৭ কোটি টাকা কর ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছে সংস্থাটি।
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের অক্টোবরে সাঈদ খোকন ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে কর ফাঁকির তদন্ত শুরু করেছে আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। এর আগে ওই বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি আদালতের নির্দেশে সাঈদ খোকন, তার মা শাহানা হানিফ, স্ত্রী ফারহানা সাঈদ ও স্বজন জাবেদ আহমেদের নামে থাকা ৭৯টি ব্যাংক হিসাব জব্দ করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
আয়কর গোয়েন্দার তথ্যমতে, ব্যক্তি সাঈদ খোকন ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ করবর্ষে অন্তত ৯৪ কোটি টাকা কর ফাঁকি দিয়েছেন। এ সময় স্থাপনা ভাড়া থেকে ২০ কোটি টাকা আয় কম দেখিয়েছেন। মেয়াদি আমানত ও সঞ্চয়ী হিসাবে সুদ গোপন করেছেন ৭ কোটি ১৩ লাখ টাকা। শেয়ারবাজারের ১০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা রিয়েলাইজড গেইন আয়কর রিটার্নে দেখাননি। অকৃষি জমিতে ৬২ কোটি টাকা বিনিয়োগ কম দেখিয়েছেন। মেয়াদি আমানত, সঞ্চয়ী এবং চলতি হিসাবে ২৩০ কোটি টাকা থাকলেও তা রিটার্নে উল্লেখ করেননি।
এছাড়া কালোটাকা সাদা ও সম্পদের তথ্য লুকাতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন সাঈদ খোকন। বনানীর কামাল আতাতুর্ক রোডে (বাড়ি- ৬৭বি এবং ৬৮, রোড-১৯ এবং ২১, ব্লক-বি) সাঈদ খোকন ‘অটোগ্রাফ’ নামে ১৯ তলার একটি বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করেন। আয়কর নথিতে যার ব্যয় দেখানো হয় ৫১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। গণপূর্ত অধিদপ্তর বলছে, এই ভবন নির্মাণে অন্তত ১১০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। অর্থাৎ ৫৯ কোটি টাকার বিনিয়োগ তথ্য লুকিয়েছেন সাঈদ খোকন। একইভাবে নিজস্ব ডেভেলপার কোম্পানি দিয়ে গুলশান-২ এ (বাড়ি নং ৪-জি, রোড নং-১০৪) ‘ওকউড’ নামে ১৪ তলা ভবন নির্মাণ করেন তিনি। আয়কর নথিতে যার ব্যয় দেখানো হয় ২৩ কোটি টাকা। প্রকৃতপক্ষে এই ভবন নির্মাণে আরও বেশি অর্থ খরচ হয়েছে।
সপরিবারে কালোটাকা সাদা : তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালোটাকা সাদা করার বিশেষ সুযোগ দিয়েছিল। সেই সুযোগ নেয় সাঈদ খোকন পরিবার। ২০২০-২১ করবর্ষে সাঈদ খোকন নিজে ৫ কোটি টাকা কর দিয়ে ৫০ কোটি টাকা সাদা করেন। একই করবর্ষে তার মা ৫ কোটি টাকা জমা দিয়ে ৫০ কোটি টাকা সাদা করেন। ২০২১-২২ করবর্ষে তার স্ত্রী ৪ কোটি টাকা দিয়ে ৪০ কোটি টাকা সাদা করেন।
পরিবারের কর ফাঁকি ২৯৭ কোটি টাকা : আয়কর গোয়েন্দার তথ্যমতে, সাঈদ খোকন পরিবার সব মিলিয়ে ২৯৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকা কর ফাঁকি দিয়েছে। একা সাঈদ খোকনের কর ফাঁকির পরিমাণ ৯৪ কোটি ২০ লাখ টাকা। তার স্ত্রীর ৪৯ কোটি ৯৫ লাখ, মায়ের ৪০ কোটি ৮৯ লাখ, বোনের ১৮ কোটি ৮০ লাখ, সাঈদ খোকন প্রোপার্টিজের ৭৩ কোটি ৩২ লাখ এবং আরা হসপিটালিটির ১৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এছাড়া আয়কর নথিতে ৩টি প্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করেছেন সাঈদ খোকন। সাঈদ খোকন প্রোপার্টিজ লিমিটেড, আরা হসপিটালিটি সার্ভিসেস লিমিটেড এবং ফোরএ প্রাইভেট লিমিটেড-এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাননি গোয়েন্দারা। সাঈদ খোকন প্রোপার্টিজের অপ্রদর্শিত অর্থ ৫০৫ কোটি, আরা হসপিটালিটির ২৬৩ কোটি এবং ফোরএ প্রাইভেট লিমিটেডের ৪৫৭ কোটি টাকা। প্রথম দুটি প্রতিষ্ঠান কয়েক বছর রিটার্ন দাখিল করলেও ফোরএ প্রাইভেট লিমিটেড রিটার্ন দাখিল করে না। ২০২৪-২৫ করবর্ষ পর্যন্ত ফোরএ’র ব্যাংক হিসাবে ৩৬৭ কোটি টাকা, বন্ডে ৬১ কোটি এবং অন্যান্য হিসাবে ২৯ কোটি টাকা স্থিতি পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তদন্তসংশ্লিষ্ট আয়কর গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, কর ফাঁকিতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন সাঈদ খোকন। এনবিআরের সাবেক একজন সদস্য তার কর পরামর্শক হিসাবে কাজ করায় অত্যন্ত সুকৌশলে সম্পদ লুকাতে পেরেছেন। ট্রেজারি বিল-বন্ড, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের তথ্য দেদার লুকিয়ে কর ফাঁকি দিয়েছেন। আবার কাগুজে কোম্পানি খুলে তাতে মোটা অঙ্কের ব্যাংক লেনদেন করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি ও জবরদখলের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ রাখতেন কোম্পানির অ্যাকাউন্টে। কর্মকর্তারা বলছেন, সাঈদ খোকনের ৩ মেয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করেন। তাদের বৈধভাবে কিছু অর্থ পাঠানো হলেও হুন্ডির মাধ্যমে নিয়মিত অর্থ পাঠানো হতো। সেই অর্থ দিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তিনি। এ কাজে তাকে সরাসরি সহযোগিতা করতেন তার ব্যক্তিগত সহকারী আরমিনা সুলতানা। তবে সাঈদ খোকন পরিবারের আয়কর ফাঁকির পূর্ণাঙ্গ তথ্য অনুসন্ধান চলমান আছে।
