গবেষণা প্রতিবেদন
সয়াবিন তেলে বিষাক্ত ধাতু
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রান্নার অন্যতম প্রধান উপকরণ সয়াবিন তেলে মিলেছে সিসা, আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম, পারদ ও নিকেলের মতো বিষাক্ত মৌল। ঢাকার বাজার থেকে সংগ্রহ করা ২১টি সয়াবিন তেলের নমুনা পরীক্ষা করে এমন উদ্বেগজনক চিত্র পেয়েছেন গবেষকরা। নমুনার ২০টিতে সিসার মাত্রা আন্তর্জাতিক খাদ্যনিরাপত্তা নির্দেশনার নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়েছে। সব নমুনায় প্রতি কেজিতে ক্রোমিয়ামের ঘনত্ব ১ দশমিক ১১০ থেকে ৫ দশমিক ৬৪৩ মিলিগ্রাম পাওয়া গেছে। আর্সেনিকের মাত্রাও নির্ধারিত আন্তর্জাতিক নির্দেশনার চেয়ে বেশি। অধিকাংশ নমুনায় নিকেলের মাত্রা এবং কয়েকটিতে তামার ঘনত্ব ছাড়িয়েছে প্রাসঙ্গিক সীমা।
‘ডায়েটারি এক্সপোজার টু টক্সিক ট্রেস এলিমেন্টস থ্রু সয়াবিন অয়েল কনজাম্পশন ইন বাংলাদেশ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটেড হেলথ রিস্কস’ শিরোনামে গবেষণা প্রতিবেদনে ভয়াবহ এ তথ্য উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস’-এর অনলাইনে ৮ অক্টোবর প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় ঢাকার চারটি বড় পাইকারি বাজার থেকে সংগৃহীত বাণিজ্যিক সয়াবিন তেলের ২১টি নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। এর মধ্যে ছয়টি ছিল ব্র্যান্ডেড বোতলজাত তেল এবং ১৫টি খোলা বা মূল প্রস্তুতকারকের পরিচয়বিহীন তেলের নমুনা। গবেষকরা উন্নত আইসিপি-এমএস পদ্ধতিতে আটটি বিষাক্ত বা অতি-স্বল্পমাত্রায় থাকা মৌল-সিসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক, পারদ, ম্যাঙ্গানিজ, নিকেল ও তামা পরিমাপ করেন।
সিসার মাত্রা সর্বোচ্চ ১৯ গুণ । গবেষণায় সিসার ঘনত্ব প্রতি কেজি সয়াবিনে শূন্য দশমিক ০৪৮ থেকে ১ দশমিক ৫২৯ মিলিগ্রাম পাওয়া গেছে। খাদ্যতেলে সিসার জন্য ব্যবহৃত প্রতি কেজিতে শূন্য দশমিক ০৮ মিলিগ্রামের আন্তর্জাতিক কোডেক্স সীমার তুলনায় ২১টির মধ্যে ২০টি নমুনায় মাত্রা বেশি। সর্বোচ্চ পাওয়া মাত্রা ওই সীমার প্রায় ১৯ গুণ। সিসার দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ স্নায়ুতন্ত্র, কিডনি এবং শিশুদের বিকাশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তবে এই গবেষণায় তেল খাওয়ার কারণে কারও নির্দিষ্ট রোগ হয়েছে-এমন তথ্য সংগ্রহ করা হয়নি।
পাওয়া গেছে আর্সেনিক বিষ : প্রতি কেজি সয়াবিনে আর্সেনিকের ঘনত্ব পাওয়া গেছে শূন্য দশমিক ১৫৫ থেকে শূন্য দশমিক ২৭৬ মিলিগ্রাম। গবেষকরা তুলনার জন্য প্রতি কেজিতে শূন্য দশমিক ১ মিলিগ্রামের আন্তর্জাতিক নির্দেশক ব্যবহার করেন। ২১টি নমুনার সবকটির মাত্রাই তার ওপরে। দীর্ঘমেয়াদি আর্সেনিক সংস্পর্শের সঙ্গে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা বলা হয়েছে গবেষণা প্রতিবেদনে।
নিকেল পাওয়া গেছে ২৩ গুণ বেশি । গবেষণায় বলা হয়েছে, সয়াবিন তেলে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে ২৩ গুণ বেশি নিকেল পাওয়া গেছে। প্রতি কেজিতে নিকেলের মাত্রা শূন্য দশমিক ০২৪ থেকে ২ দশমিক ৩৬৮ মিলিগ্রাম পাওয়া গেছে। গবেষণায় ব্যবহৃত প্রতি কেজিতে শূন্য দশমিক ১ মিলিগ্রামের কোডেক্সসীমা অধিকাংশ নমুনায় অতিক্রম করেছে। তামার মাত্রা পাওয়া গেছে শূন্য দশমিক ১০৭ থেকে শূন্য দশমিক ৮০৬ মিলিগ্রাম প্রতি কেজিতে। কয়েকটি নমুনায় তা প্রতি কেজিতে শূন্য দশমিক ১ মিলিগ্রামের তুলনামূলক সীমার ওপরে। ক্যাডমিয়ামের মাত্রা পাওয়া গেছে শূন্য দশমিক ০০৪ থেকে শূন্য দশমিক ০২৬ মিলিগ্রাম প্রতি কেজিতে; যা গবেষণায় ব্যবহৃত প্রতি কেজিতে শূন্য দশমিক ০৫ মিলিগ্রামের সীমার নিচে।
পারদ ও ক্রোমিয়ামেও উদ্বেগ : গবেষণায় প্রতি কেজি সয়াবিনে পারদের মাত্রা পাওয়া গেছে শূন্য দশমিক ১২২ থেকে শূন্য দশমিক ২৬৪ মিলিগ্রাম। গবেষকরা বলেছেন, ভোজ্যতেলে পারদের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক সীমা না থাকলেও পাওয়া মাত্রাগুলোর জন্য নজরদারি বাড়াতে হবে।
আর প্রতি কেজিতে ক্রোমিয়ামের মাত্রা পাওয়া গেছে ১ দশমিক ১১০ থেকে ৫ দশমিক ৬৪৩ মিলিগ্রাম। গবেষকরা বলছেন, ভোজ্যতেলে ক্রোমিয়ামের জন্য তুলনার উপযোগী প্রতিষ্ঠিত নিয়ন্ত্রক সীমা না থাকায় এ ফলকে সরাসরি সীমা লঙ্ঘন বলা যাচ্ছে না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো-ব্যবহৃত পরীক্ষা পদ্ধতিতে মোট ক্রোমিয়াম পরিমাপ করা হয়েছে; বিষাক্ত ক্রোমিয়াম-৬ এবং তুলনামূলক কম বিষাক্ত ক্রোমিয়াম-৩ আলাদা করে নির্ধারণ করা হয়নি।
গবেষকরা বাণিজ্যিক সয়াবিন তেলের নিয়মিত ঝুঁকিভিত্তিক পরীক্ষা, ব্র্যান্ডেড ও খোলা-উভয় ধরনের তেলের পর্যাপ্ত নমুনা সংগ্রহ, মাননিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপে দূষণের উৎস অনুসন্ধানের সুপারিশ করেছেন। সিসা ও আর্সেনিকের মতো মৌলের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সীমার সঙ্গে সামঞ্জস্য যাচাইয়ের পাশাপাশি ক্রোমিয়ামের রাসায়নিক রূপ আলাদা করে পরীক্ষা করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন।
