শুভ শক্তির প্রত্যয়ে মহাষ্টমী উদযাপন
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেবী দুর্গার মহিষাসুর বধের মুহূর্ত উদযাপন এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়ের প্রত্যয় নিয়ে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, গুলশান-বনানীসহ সারা দেশে উদযাপিত হলো মহাঅষ্টমী। সোমবার দুর্গাপূজার মহাঅষ্টমীতে সন্ধি পূজা ও কুমারী পূজা করা হয়। এদিনকে শারদীয় দুর্গোৎসবের সবচেয়ে শুভ ও কাঙ্ক্ষিত হিসাবে মনে করেন পুণ্যার্থীরা। এদিকে সোমবার ঢাকেশ্বরী মন্দিরে পূজা উদযাপন পরিদর্শন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে কুশল বিনিময় শেষে তিনি বলেছেন, আমাদের প্রথম পরিচয় আমরা বাংলাদেশি। ধর্ম আলাদা হতেই পারে, তবে রাষ্ট্র সবার।
অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হয় ‘সন্ধিপূজা’। সোমবার সকাল ৭টা ৫৫ মিনিট থেকে ৮টা ৪৩ মিনিট পর্যন্ত এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, এই বিশেষ আচারটি সেই মুহূর্তটিকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যখন দেবী দুর্গা চণ্ড ও মুণ্ড নামক দুই অসুরকে বধ করার জন্য ‘চামুণ্ডা’ রূপ ধারণ করেছিলেন। সারা দেশের কিছু মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘কুমারী পূজা’। এখানে একটি অল্পবয়সি অবিবাহিত বালিকাকে দেবী দুর্গা ও দিব্য নারীশক্তির প্রতীক হিসাবে পূজা করা হয়। রাজধানীর রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনে সকাল সাড়ে ৯টায় কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই আচারের অংশ হিসাবে ভক্তরা কুমারীর পায়ে জল, বস্ত্র, ফুল এবং স্বর্ণ ও রৌপ্য অলংকার নিবেদন করেন।
অন্যদিকে ভোর থেকেই বনানী ও গুলশানের আশপাশের অঞ্চল থেকে আসা মানুষের সমাগমে মুখরিত হয়ে ওঠে গুলশান-বনানী পূজামণ্ডপ। গুলশান-বনানী পূজামণ্ডপের পুরোহিত সুনীল চক্রবর্তী মহাঅষ্টমীর আচার অনুষ্ঠান নিয়ে বলেন, পঞ্জিকা ও শাস্ত্রীয় সময়সূচি মেনে সকাল ৭টা ৩৭ মিনিটের মধ্যেই দেবী দুর্গার মহাষ্টম্যাদি কল্পারম্ভ এবং মহাষ্টমীবিহিত পূজা সম্পন্ন হয়। এই পবিত্র সময়কে স্মরণ করে দেবীর চরণে ১০৮টি নীল পদ্ম নিবেদন করা হয়। এরপরই শুরু হয় অষ্টমীর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ পুষ্পাঞ্জলি প্রদান। সকাল ৭টা ৪০ মিনিট থেকে ৭টা ৫৫ মিনিট পর্যন্ত নির্ধারিত সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই ভক্তরা উপবাস থেকে শুদ্ধ বস্ত্রে দেবী দুর্গার চরণে পুষ্প ও বেলপাতা অর্পণ করেন।
মহাঅষ্টমীর মূল আকর্ষণ সন্ধিপূজা কেন্দ্র করে। যেটি সকাল ৭টা ৫৫ মিনিট থেকে ৮টা ৪৩ মিনিট পর্যন্ত ছিল। এ সময় মণ্ডপে উপস্থিত ছিলেন সর্বস্তরের পুণ্যার্থী। পুরোহিত সুনীল চক্রবর্তী বলেন, শাস্ত্রানুসারে, অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমী তিথির প্রথম ২৪ মিনিট এই বিশেষ ৪৮ মিনিটের সন্ধিক্ষণেই দেবী ললাট থেকে চামুণ্ডা রূপ ধারণ করে চণ্ড ও মুণ্ডকে বধ করেছিলেন। এই পবিত্র সময়কে স্মরণ করে সারিবদ্ধভাবে জ্বালানো হয় ৬৪টি মাটির প্রদীপ। সনাতনীরা বিশ্বাস করেন এ সময়ে আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে পুরো দেবীবাস।
মহাঅষ্টমীর আরও কার্যক্রম নিয়ে মণ্ডপের আরেক পুরোহিত হৃদয় চক্রবর্তী বলেন, অন্ন, বস্ত্র ও নানা উপচারের পাশাপাশি এদিন অনুষ্ঠিত হয় দেবীর দশ হাতে বিদ্যমান দিব্য অস্ত্রের বিশেষ পূজা। অশুভ শক্তির বিনাশ ও সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতীকী রূপ হিসাবে ভক্তরা অঞ্জলি প্রদান শেষে দেবী দর্শনে মগ্ন হন।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরে প্রধানমন্ত্রী : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সোমবার ঢাকেশ্বরী মন্দিরে পূজা উদযাপন পরিদর্শনে যান। সেখানে কুশল বিনিময় শেষে তিনি বলেন, আমাদের প্রথম পরিচয় আমরা বাংলাদেশি। ধর্ম আলাদা হতেই পারে, তবে রাষ্ট্র সবার। দেশে সবার অধিকার কর্তব্য সমান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে সবাই অংশ নিয়ে দেশকে স্বাধীন করেছেন। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানেও একই বিষয় ঘটেছে। তাই দেশে সবার অধিকার কর্তব্য সমান। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ধর্মের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য হবে না। তা বিএনপি বাস্তবায়ন করছে আর করবে। ধর্মীয় উপাসনালয়গুলো থাকবে স্বাধীন। রাষ্ট্র সবার, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার রয়েছে। তিনি জানান, এই বাংলাদেশ ধর্মীয় সম্প্রীতির দেশ, সব ধর্মের আচার অনুষ্ঠান পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে এই সরকার।
প্রীতি ও সম্প্রীতির পরিবেশ যেন বজায় থাকে : এদিন সকাল ৯টায় পূজামণ্ডপে সস্ত্রীক আসেন ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। সেখানে অঞ্জলি প্রদান শেষে তিনি বলেন, আমি এখানে ভারতীয় হাইকমিশনের প্রতিনিধি হিসাবে আসিনি। পরিবারের একজন সদস্য ও ভক্ত হিসাবে এসেছি। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলাদেশ, সবখানেই রয়েছে আমাদের অসামান্য শিল্পকলা। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আয়োজকদের অনেক ধন্যবাদ। দুর্গাপূজা বা অন্য উৎসবের মাধ্যমেই আমাদের শিল্পীরা তাদের দক্ষতা প্রমাণের বড় সুযোগ পান। এখানে এসে মনটা আনন্দে ভরে গেল। কী সুন্দর বানানো হয়েছে! এটাই তো হচ্ছে জীবন। অদ্ভুত, একদম অসাধারণ শিল্পকর্ম। দিনেশ ত্রিবেদী আরও বলেন, এই প্রীতি ও সম্প্রীতির পরিবেশ যেন কেবল উৎসবের দিনে নয়, প্রতিদিন বজায় থাকে। পুজোয় অঞ্জলি দেওয়ার প্রকৃত অর্থ হলো নিজের ইগো বা অহংকার ঈশ্বরের চরণে বিসর্জন দেওয়া এবং নিজেকে সমর্পণ করা। মহিষাসুর হলো মানুষের ভেতরের অশুভ ও হিংসাত্মক চিন্তাভাবনা। দৈনন্দিন জীবনে মানসিক হিংসা ও কুচিন্তাকে বা নিজের ভেতরের এই ‘মহিষাসুর’কে দমন করাই হলো পূজার প্রকৃত শিক্ষা।
