ভোর থেকে দীর্ঘ লাইন
সিংড়ায় সারের জন্য কৃষকদের হাহাকার
৪ থেকে ১০ বস্তার বিপরীতে মিলছে দু-এক বস্তা * কৃষি কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া মিলছে না সার * সারের অভাবে জমি পতিত রেখেছেন অনেকে
Advertisement
সিংড়া (নাটোর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সারের জন্য ভোর থেকেই দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে কৃষকরা। সোমবার নাটোরের সিংড়া উপজেলার বামন মাঝগ্রামে -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শস্যভান্ডারখ্যাত হিসাবে পরিচিত সিংড়ার চলনবিলের কৃষকদের মাঝে সার নিয়ে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। রবি-বোরো মৌসুমের শুরুতেই কৃষককে এক বস্তা সারের জন্য ভোর থেকে সারা দিন লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এরপরও দিনশেষে অনেক কৃষক খালি হাতে বাড়ি ফিরছেন। তাদের অভিযোগ, টিএসপি সার যেন সোনার হরিণ! বিলে সরিষা, ভুট্টা, আলুসহ রবিশস্যের জমি চাষাবাদ শুরু করে সারের অভাবে অনেক কৃষক জমি পতিত ফেলে রেখেছেন। আর দেশীয় তৈরি ইউরিয়া সারের কোনো সংকট না থাকলেও এখন এক বস্তা সার নিতেও কৃষককে সারা দিন লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।
উপজেলার লালোর ইউনিয়নের বামন মাঝগ্রাম বাজারে মেসার্স এস.আর ট্রেডার্সের সামনে সোমবার সকাল ১০টায় পাঁচ শতাধিক কৃষকের এমন লম্বা লাইন চোখে পড়ে। সবাই সেখানে ইউরিয়া সার নিতে ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এক একজন কৃষকের ৪ থেকে ১০ বস্তা চাহিদার বিপরীতে এক থেকে দুই বস্তা ইউরিয়া সার দেওয়া হচ্ছে। অথচ কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী বাজারে কোনো ইউরিয়া সারের সংকট নেই।
লাইনে দাঁড়ানো বড়বারইহাটি গ্রামের কৃষক ইকবাল হোসেন বলেন, টিএসপি, ডিএপি, পটাশ ও ইউরিয়া এক বস্তা করে সার নিতে এসে কৃষককে পৃথক জায়গায় লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। আর ইউরিয়া সার তো দেশীয় পণ্য, এই সার নিতে কৃষকদের এত হয়রানি কেন? তিনি আরও বলেন, কৃষকের এখন প্রয়োজন সার। সময়মতো সার না পেলে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হবে। কৃষকের ঘরে কোনো অতিরিক্ত টাকা নেই যে, বেশি সার কিনবে কৃষক। কৃষকের প্রতি সুদৃষ্টি থাকলে কৃষক বাঁচবে। আর কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে।
আর মহনপুরের কৃষক আবুল খয়ের ও রফিকুল ইসলাম জানান, তিন দিন ঘুরেও কোনো সার পাননি। আজ (সোমবার) সকাল থেকে তাদের দুই বস্তা টিএসপি সারের জন্য বসিয়ে রেখেছেন স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা (বিএস)। লম্বা এই লাইনের কৃষকদের ইউরিয়া সার দেওয়া শেষ হলে তারপর তারা ওই সার পাবেন কিনা বলতে পারছেন না।
ডাকমন্ডব গ্রামের কৃষাণী নার্গিস বেগম ও দুলেনা বেগম বলেন, বাড়িতে কোনো ছেলেমানুষ নেই। তাই বাধ্য হয়ে তারাই সার নিতে এসেছেন। কিন্তু কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে এক বস্তা করে সার নিতে হচ্ছে। এমন হয়রানি দেখার মতো কেউ নেই।
সার নিতে লম্বা লাইনে দাঁড়ানো বড়বারইহাটি গ্রামের কৃষক আছের আলী, খোরশেদ আলম, মতিউর রহমান, হামির ঘোষ গ্রামের কৃষক জালাল উদ্দিন, হাপুনিয়া গ্রামের কৃষক আশরাফুল ইসলামসহ অন্তত ১৫ জন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কৃষি কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া কোনো ডিলার সার দিচ্ছেন না। এটা খুবই দুঃখজনক বিষয়। কৃষক তার প্রয়োজনমতো ডিলারের কাছ থেকে যখন খুশি সার নেবেন। আবার একজন কৃষক তার চাহিদামতো সব সার ডিলারের একই ঘর অথবা গুদাম থেকে পাবেন। কিন্তু সেখানেও এক বস্তা করে সার দেওয়া হচ্ছে, যা কৃষি কর্মকর্তারা সেই সার পৃথক ঘর থেকে একেক দিন দিচ্ছেন। এতে কৃষকের বাড়তি টাকা ও সময় অপচয় এবং ব্যাপক হয়রানি হতে হচ্ছে। এক বস্তা সারের জন্য সারা দিন কৃষককে ঘুরতে হচ্ছে ইউনিয়নের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত।
মেসার্স এস.আর ট্রেডার্সের ম্যানেজার জয়দেব সাহা ও মিন্টু সাহা বলেন, কৃষকদের হয়রানি হলেও তাদের কিছুই করার নেই। কারণ স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার অনুমতি ও নির্দেশনা মেনে কৃষকদের মাঝে সার বিতরণ করছেন। এর বাইরে কিছুই করার নেই। আর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুজন সার ডিলার বলেন, কৃষি কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া কৃষকদের সার দেওয়া নিষেধ রয়েছে।
স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বিনয় কুমার বলেন, কৃষকদের মাঝে সার সংকট দেখা দিতে পারে এমন ভীতি থেকে লম্বা লাইন অথবা ভিড় জমছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, কোনো সার যেন নয়ছয় না হয় সেজন্য ডিলারদের একটু চাপে রাখতে এমন নির্দেশনা দিয়েছেন। তবে সব কৃষক সার পাবেন। বরাদ্দ যেহেতু ধাপে ধাপে উত্তোলন করতে হচ্ছে সেহেতু ধাপে ধাপে সার দেওয়া হচ্ছে। অনেক কৃষক একসঙ্গে এলে এমন একটু সমস্যার সৃষ্টি হয়েই থাকে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ আল রিফাত বলেন, সার বিতরণে কৃষকদের হয়রানি করা হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন। আর স্থানীয় সংসদ-সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, সার নিয়ে কোনো অনিয়ম হলে প্রশাসনকে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
