সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নজরুলের বাড়িতে শোকের মাতম
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সৌদি আরবের মক্কায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া প্রবাসী যুবক নজরুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিরামপুরে চলছে শোকের মাতম। পরিবারের অভিযোগ, তাদের না জানিয়েই গত ১৪ অক্টোবর (বুধবার) অতি গোপনে নজরুল ইসলামের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি। নিহতের পরিবারের সদস্যসহ এলাকাবাসী দুই দেশের সরকারের কাছে সুবিচার প্রার্থনা করে তাদের প্রিয় সন্তানের লাশ রাষ্ট্রীয় খরচে দেশের মাটিতে ফিরিয়ে আনার দাবি জানান।
নজরুলের স্বজনরা জানান, ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের কৃষক পরিবারের যুবক নজরুল ইসলাম (২২)। সেখানে যাওয়ার ৬/৭ মাসের মাথায় মক্কা নগরীর একটি মসজিদে সুইটি আক্তার নামে এক তরুণীর সঙ্গে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগ এনে দুজনকে গ্রেফতার করে দেশটির পুলিশ। পরে তিন বছর তিন মাস জেলে বন্দি থাকার পর গত বুধবার এ দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে দেশটির সরকার।
নজরুলের মা রহিমা বেগম জানান, জেলে থাকার পরও প্রতি রোববার পরিবারের সঙ্গে কথা বলত নজরুল। কিন্তু হঠাৎ করে পরিবারের কাউকে না জানিয়ে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ না দিয়ে গত বুধবার তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। গণমাধ্যমের খবরে বুধবার পরিবারের সদস্যরা প্রথমে নজরুলের মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারেন। এর পর থেকে শোকে তারা বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন।
নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পাওয়ার পর থেকে গ্রামবাসী তাদের বাড়িতে নিয়মিত আসা-যাওয়া করছেন। তার এমন করুণ পরিণতিতে শোকস্তব্ধ তারা। গ্রামের বাসিন্দা রাহাত ও মাইনুদ্দিন বলেন, সৌদি আরব সরকার কট্টরনীতি থেকে উদারনীতিতে এসে সিনেমা হলসহ অনেক কিছুই উন্মুক্ত করে দিচ্ছে। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে এবং পরিবার ও বাংলাদেশ সরকারকে না জানিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন তারা। উপার্জনক্ষম সন্তান হারানো দরিদ্র কৃষক পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য দুই দেশের সরকারের কাছে তারা অনুরোধ জানিয়েছেন। নজরুল চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন।
নজরুলের বাবা আবদুল বাছির বলেন, ২০২২ সালে ৭ লাখ টাকা ঋণ করে নজরুলকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলাম। সেখানে যাওয়ার এক মাস পর মক্কার হারাম শরিফে সে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসাবে কাজ পায়। তবে ৭/৮ মাস পর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। আটকের প্রায় দেড় মাস পর নজরুল সেদেশের জেল থেকে আমাকে ফোন দিয়ে জানায়, সে সেখানে কারাবন্দি। তবে কী কারণে তাকে আটক করা হয়েছে সে এই বিষয়ে কিছু জানায়নি কিংবা আমরাও জানি না। তিন বছর তিন মাস ধরে সে কারাগারে ছিল। গত রোববার সে আমাকে ফোন দেয়। জানায় সে সমস্যার মধ্যে রয়েছে। এটাই তার সঙ্গে আমার শেষ কথা। গত বুধবার শুনলাম নজরুলকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আমি এ বিষয়ে আর কিছু বলতে পারি না। বাড়িতে এখন কান্নার রোল। আমার বোন আবেদা বেগম বাড়িতে এসে নজরুলের মৃত্যুর খবর শুনে হার্ট অ্যাটাকে মারা যায়। আমার ছেলেও গেল, বোনও গেল। সব হারিয়ে আমি এখন নিঃস্ব। আমি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাই আমার ছেলের লাশ যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
তিনি আরও বলেন, নজরুল কারাগারে থাকার সময় তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম-তার কাছে বাংলাদেশ কনস্যুলেট থেকে কেউ যোগযোগ করেছে কিনা। কিন্তু কেউ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রতিটি দেশের কনস্যুলেট জেলে থাকা তাদের নাগরিকদের খোঁজ খবর নেয়। অথচ আমাদের দেশের কনস্যুলেট থেকে তার কোনো খোঁজ নেওয়া হয়নি। আমরা কী দেশে বাস করছি। তিনি ও তার স্ত্রী বলেন, তাদের ছেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট।
জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ জানান, লাশ ফিরিয়ে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। লাশ দেশে ফিরলে ভুক্তভোগী পরিবারকে সহায়তা করা হবে।
তথ্যের ঘাটতি আছে, খতিয়ে দেখা হচ্ছে-পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী : কূটনৈতিক প্রতিবেদক জানান, সৌদি আরবে যে প্রক্রিয়ায় দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে তা দুঃখজনক উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, এটা অবশ্যই তথ্যের ঘাটতি এবং এই প্রক্রিয়ায় কোনো এক জায়গায় ঘাটতি রয়েছে। এটা খতিয়ে দেখার জন্য আমরা দুই পক্ষ কথাবার্তা বলছি। দুই দেশ সফর শেষে দেশে ফিরে সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।
হুমায়ুন কবির বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশেষ করে, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর একটা ভালো এবং গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ ও সৌদি আরব জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ। যে ঘটনা ঘটেছে, এখানে তথ্য বিনিময়ের ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, এটা অবশ্যই দুঃখজনক। অ্যালিগেশন এনে বা ক্রাইম অফেন্স এনে এক্সিকিউশনটা হলো, সেটা আমাদের জন্য হতাশার। হুমায়ুন কবির বলেন, আল্লাহর ঘরের পবিত্রতা এবং মক্কা যাওয়ার উদ্দেশ্য মানুষের পবিত্রই হয়। যেটা আমরা শুনলাম এটা যদি হয়ে থাকে তাহলে স্বাভাবিকভাবে এটা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কোনো সুযোগ আছে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, না, রায় কার্যকর হয়ে গেছে। হয়ে গেলে এটার আর সুযোগ থাকে না। এখন আমরা দেখব ঘাটতিটা কোথায়।
তিনি আরও বলেন, আল্লাহর ঘরে মানুষ পবিত্র নিয়তে যায়। ওখানে গিয়ে ওই ধরনের কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়া তো ঠিক না। কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য না। সুতরাং এখানে পরিষ্কার যদি ক্রাইম হয়ে থাকে এটার একটা আইন রয়েছে। তাদের লোকাল আইন রয়েছে, যে যায় সৌদি আরবে সে তা জানে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন অভিবাসী শ্রমিক, অন্যজন ওমরাহ যাত্রী : সৌদি আরবের মক্কায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশির একজন অভিবাসী শ্রমিক, অন্যজন ওমরাহ যাত্রী। তাদের একজনের বাড়ি বগুড়ায়, অন্যজন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা। এ তথ্য জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। সোমবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, আকাশ পথের যোগাযোগ ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তাদের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। মন্ত্রী বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে প্রবাসী কর্মীদের লাগেজ বহনের জন্য ১৫০টি ট্রলি হস্তান্তর করেন।
রায়ের কপি চেয়েছে বাংলাদেশ-শামা ওবায়েদ : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিচারিক রায়ের কপি চেয়েছে বাংলাদেশ। কপি হাতে আসার পর এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা করে লাশ ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হবে। সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।
