হুথি কারা যেভাবে উত্থান
Advertisement
ইয়েমেনের দুর্গম পাহাড়ি জনপদ থেকে উঠে এসেছে হুথিরা। সংগৃহীত ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইয়েমেনের দুর্গম পাহাড়ি জনপদ থেকে উঠে আসা হুথিরা আজ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী সশস্ত্র শক্তি। ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া এ গোষ্ঠী দীর্ঘ লড়াইয়ে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করেছে। ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও হুথিদের রয়েছে নিজস্ব রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা। লোহিত সাগরের গুরত্বপূর্ণ নৌপথ থেকে সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনা-সবখানেই তাদের তৎপরতা এখন আঞ্চলিক সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে।
হুথিদের আনুষ্ঠানিক নাম আনসার আল্লাহ, যার অর্থ ‘আল্লাহর সাহায্যকারী’ বা ‘আল্লাহর সমর্থক’। ১৯৯০-এর দশকে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে জাইদি সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে এ আন্দোলনের উত্থান। জাইদিবাদ শিয়া ইসলামের একটি শাখা। ইয়েমেনের ইতিহাসে এ সম্প্রদায়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্য রয়েছে। একসময় উত্তর ইয়েমেনে জাইদি নেতৃত্বাধীন ইমামত শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে উত্তরাঞ্চলের বহু জাইদি জনপদ অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা, রাজনৈতিক প্রান্তিকতা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরত্বের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। এ পটভূমিতে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় পুনরুজ্জীবিত করার আন্দোলন ধীরে ধীরে রাজনৈতিক রূপ নেয়। টাইমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইয়েমেনের মোট জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশ হুথি।
‘হুথি’ নামটি এসেছে আন্দোলনটির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুথির নাম থেকে। তার ভাই আবদুল মালিক আল-হুথি ২০০৪ সাল থেকে আন্দোলনটির কার্যত নেতা। তার নেতৃত্বে হুথিরা একটি স্থানীয় ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে শক্তিশালী সশস্ত্র সংগঠনে পরিণত হয়েছে। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে ইয়েমেনের তৎকালীন দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহের সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক বিদ্রোহে জড়িয়ে পড়ে হুথিরা। তাদের দাবির মধ্যে ছিল উত্তরাঞ্চলের মানুষের অধিকার, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং জাইদি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় পরিচয়ের সুরক্ষা। কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির অবসানও ছিল তাদের আন্দোলনের অন্যতম বিষয়। ইয়েমেনের সেনাবাহিনীর সঙ্গে কয়েক দফা সংঘর্ষে জড়ানোর পাশাপাশি সৌদি আরবের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাতেও অংশ নেয় তারা।
ইয়েমেনের সংগঠনটি গত তিন বছরে বিপুলসংখ্যক যোদ্ধা নিয়োগ দিয়েছে। বিবিসি জানায়, হুথিদের শক্তি ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৪ সাল নাগাদ তারা ৩ লাখ ৫০ হাজার পর্যন্ত যোদ্ধা নিয়োগ করেছে। ইয়েমেনের ভূখণ্ডের এক-চতুর্থাংশ থেকে এক-তৃতীয়াংশ এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যেখানে দেশটির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষ বসবাস করে।
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা গভীর
হুথিদের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ইরানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব ও পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ চলাকালে জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইরান হুথিদের কাছে ড্রোন, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র সরবরাহ করেছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের কিছু সামরিক বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে হুথিরা প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও অন্যান্য সহায়তা পেয়েছে বলে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন।
২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান এখন আগের মতো শুধু সম্পূর্ণ তৈরি অস্ত্র পাঠানোর পরিবর্তে ক্রমবর্ধমানভাবে অস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পাঠাচ্ছে, যেগুলো হুথিদের সহযোগীরা একত্র করে ব্যবহার করতে পারে। সেই সঙ্গে আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ভাগ করে নেওয়ার প্রবণতার কথাও প্রতিবেদনে উঠে আসে। হুথিরা ইরানের নেতৃত্বাধীন ‘প্রতিরোধ অক্ষে’র অংশ। এ জোটে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাকের বিভিন্ন ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং অতীতে সিরিয়ার বাশার আল-আসাদের সরকারও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদ সরকারের পতনের পর সেই সমীকরণে বড় পরিবর্তন আসে।
হুথিদের আসল লক্ষ্য কী
হুথিদের লক্ষ্য সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। শুরুতে আন্দোলনটির প্রধান বিষয় ছিল উত্তর ইয়েমেনের জাইদি জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়, রাজনৈতিক বঞ্চনা এবং আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন। কিন্তু ২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখল এবং পরবর্তী গৃহযুদ্ধের পর তাদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা আরও বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে তাদের অন্যতম লক্ষ্য সানাভিত্তিক শাসনব্যবস্থাকে স্থায়ী করা এবং ইয়েমেনের বৈধ সরকার হিসাবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করা।

