২১তম ব্যাচ
চার যুগ্মসচিবের পদোন্নতির সুপারিশ বিদ্যুৎমন্ত্রীর
Advertisement
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সরকারের একজন মন্ত্রী চার যুগ্মসচিবের পদোন্নতি বিবেচনার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে আধা-সরকারি পত্র (ডিও লেটার) দিয়েছেন। মন্ত্রী তার ডিও লেটারে কর্মকর্তাদের নাম, পদবি, ব্যাচ ও পরিচয়পত্রের ব্যক্তিগত নম্বর উল্লেখ করেছেন। ওই ডিও লেটার পাওয়ার পর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবকে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের সভাপতি হিসাবে কর্মকর্তাদের বিষয়টি সুবিবেচনার অনুরোধ করেন।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি গণকর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর পরিপস্থি। এছাড়া ২০১৮ সালের সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুসারে ওই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। মামলা দায়ের করে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তি নিশ্চিত করে তদবিরকারীর নাম-পদবি এবং যার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে, তার বা তাদের ডোসিয়ারে লিখে রাখার বিধান রয়েছে। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ রোববার সন্ধ্যায় মোবাইল ফোনে যুগান্তরকে বলেন, এ চার কর্মকর্তা আমার মন্ত্রণালয়ে কর্মরত। আমি তাদের এসিআর দিই। তাদের কাজ ভালো দেখেছি বলেই তাদের জন্য সুপারিশ করেছি। এতে কোনো সমস্যা আছে বলে মনে করি না।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী রোববার যুগান্তরকে বলেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী সুপারিশ করতেই পারেন। তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের বিষয়ে তিনি ইতিবাচক মন্তব্যও করতে পারেন। তবে তিনি সুপারিশ করলেই যে পদোন্নতি হবে, তা নয়। বরং সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) সদস্যরা ওইসব কর্মকর্তার জীবনবৃত্তান্ত দেখে পদোন্নতি বিবেচনা করবেন। সুপারিশ করা দোষের কিছু না।
সূত্র জানায়, ১৫ অক্টোবর মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহকে উদ্দেশ করে বলেন, দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়ন এবং তা নিশ্চিত করতে আপনার সর্বাত্মক সহযোগিতা আমাদের জন্য প্রেরণার উৎস। পত্রে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২১তম ব্যাচের চারজন কর্মকর্তা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন বলে জানান মন্ত্রী। তিনি তার ডিও লেটারে আরও বলেন, ‘দেশের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা আধুনিকায়নে তাদের অবদান প্রশংসনীয়। তাদের সততা, মেধা, পরিশ্রম এবং সৃজনশীলতা বিদ্যুৎ বিভাগের কার্যক্রমকে সমৃদ্ধ করেছে। ইতোমধ্যে তারা অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেছেন।’
ওই ডিও লেটারে ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন (১৫০০৮) মল্লিকা খাতুন (১৫০৭৬), মো. জাহিদুল ইসলাম (১৫১১০) এবং মো. মাহফুজুর রহমান (২০৩৯৯) ২১ ব্যাচের কর্মকর্তা হিসাবে উল্লেখ করা হয়। বর্তমানে তারা যুগ্মসচিব হিসাবে কর্মরত। ডিও লেটারে মন্ত্রী আরও বলেন, পদোন্নতি পেলে চাকরিজীবনে তাদের কর্মস্পৃহা আরও বাড়াবে এবং দায়িত্বপূর্ণভাবে দেশের জন্য কাজ করবেন। চারজন কর্মকর্তাকে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা হিসাবে উল্লেখ করে অতিরিক্ত সচিব পদে তাদের পদোন্নতি চান মন্ত্রী।
১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালায় যা আছে : ১৭ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাধারণ শাখা থেকে জারি করা পত্রে বলা হয়, সরকারি কর্মচারীরা কী ধরনের আচরণ করবেন, তা সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা-১৯৭৯-এ বলা আছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওই পত্রে আরও বলা হয়, সরকারি কর্মচারীদের কারও পক্ষে তাদের চাকরিসংক্রান্ত বিষয়ে নানাবিধ তদবির করার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ বিভিন্ন দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দ্বারস্থ হচ্ছেন, যা সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা ১৯৭৯-এর বিধি ২০-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এছাড়া সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮-এর ২(খ) অনুযায়ী অসদাচরণের শামিল।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওই পত্রে আরও বলা হয়, ‘কোনো সরকারি কর্মচারী তার পক্ষে কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের চাকরি সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত তদবির করলে তার বিরুদ্ধে সরকারি চাকরি বিধিমালা ২০১৮ অনুসারে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ধরনের যে কোনো তদবিরের বিষয়টি বিস্তারিত ডোসিয়ারে সংরক্ষণ করতে হবে।’ ওই পত্রের কপি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব, সব সিনিয়র সচিব ও সচিব, সব বিভাগীয় কমিশনার, সব জেলা প্রশাসক এবং সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রদান করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সাবেক জনপ্রশাসন সচিব এএফএম সোলায়মান চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, মন্ত্রীর ডিও লেটার দেওয়া বেআইনি। প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে যা লিখেছেন, তাও বেআইনি। তিনি আরও বলেন, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুসারে ওই চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার কথা। কেননা তাদের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।
সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া যুগান্তরকে বলেন, এ ধরনের সুপারিশ বিধিসম্মত নয়। সুপারিশ যেহেতু করা হয়েছে, সেহেতু এতে অসদাচরণের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। যাদের পক্ষে এ সুপারিশ করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে। তবে তারা (চার কর্মকর্তা) যদি প্রমাণ করতে পারেন এই ডিও লেটার দেওয়ার বিষয়ে তারা জানেন না, তাহলে তারা মুক্তি পাবেন।
অন্যথায় তাদের শাস্তি হওয়ার কথা। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের এ ধরনের সুপারিশ করা অনুচিত। এতে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা বিনষ্ট হয়। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

