পর্যটক বরণে প্রস্তুত সেন্টমার্টিন
Advertisement
নাছির উদ্দীন রাজ, টেকনাফ (কক্সবাজার)
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বঙ্গোপসাগরের নীলজলে জেগে ওঠা বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সেন্টমার্টিন। বঙ্গোপসাগরের নীলজলে জেগে ওঠা বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। মাত্র ৮ বর্গকিলোমিটারের দ্বীপটি স্থানীয়দের ভাষায় নারিকেল জিঞ্জিরা নামে পরিচিত। ১২ হাজার মানুষের বসবাসের এই দ্বীপে ১টি ইউনিয়ন, ১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১টি উচ্চ বিদ্যালয়, ৩-৪টি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ১টি পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে। এখানে রয়েছে ১৫৪ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল, ৬৮ প্রজাতির প্রবাল এবং বিভিন্ন প্রকার সামুদ্রিক প্রাণী। এখানে চুনাপাথর রয়েছে। দ্বীপটির ভূতাত্ত্বিক গঠন চুনাপাথরসমৃদ্ধ। বাংলাদেশ ওয়ানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী সেন্টমার্টিন দ্বীপসংলগ্ন সমুদ্র এলাকার তলদেশে বিভিন্ন ধরনের ভারী খনিজ উপাদানের উপস্থিতি রয়েছে। এই দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও স্বচ্ছ নীল জলরাশির টানে প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটক ছুটে আসেন। পর্যটকদের থাকার জন্য এখানে রয়েছে ১০০ থেকে ১৫০টির মতো হোটেল ও রিসোর্ট।
টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনের দূরত্ব ৯ কিলোমিটার হলেও কক্সবাজার থেকে ১০০ কিলোমিটার। তবে সেন্টমার্টিনে সড়কপথে যাওয়া যায় না। যেতে হয় বিশাল জলরাশি পেরিয়ে। যাওয়ার পথে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরে মিলনস্থল পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। পাশাপাশি ওখানকার স্বচ্ছ নীলজল, সারি সারি নারিকেল গাছ এবং চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভ্রমণকারীদের মুগ্ধ করে।
টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন যেতে ৩টি ঘাট রয়েছে। এগুলো হলো-দমদমিয়া জেটি, টেকনাফ কাইয়ুকখালী জেটি ঘাট ও শাহপরীর দ্বীপ জেটি ঘাট। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আগামী ১ নভেম্বর থেকে নতুন করে সেন্টমার্টিন যাওয়ার অনুমতি মিলেছে। ১৫ মার্চ পর্যন্ত দ্বীপটি ভ্রমণ করা যাবে। তবে ভ্রমণে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তাহলো-দিনে ৩৫০০ জনের বেশি পর্যটক ভ্রমণ করতে পারবেন না। পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণে পর্যটকদের প্রত্যেককে দিতে হবে ১০০ টাকা করে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ১২ অক্টোবরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দ্বীপটিতে দিনে গিয়ে ওইদিনই ফেরার নির্দেশনা ছিল। কিন্তু সোমবারের (২৭ আক্টোবর) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন সেখানে রাত্রিও যাপন করা যাবে। অর্থাৎ পর্যটকরা পুরো সময় দ্বীপে অবস্থান করতে পারবেন।
এদিকে দীর্ঘ ৯ মাস পর সেন্টমার্টিনে পর্যটক যাতায়াতের অনুমতি দেওয়ায় আনন্দ মিছিল করেছেন দ্বীপবাসী। তাদের কয়েকজন বলেন, ‘এখানকার অধিবাসীদের ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার খরচ, জীবনসংসার, চিকিৎসাসহ অনেক কিছুই পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সেই ব্যবসা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় আমাদের সবকিছু বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ সেন্টমার্টিনে পর্যটক আসার সুযোগ করে দেওয়ায় আমরা দ্বীপবাসী আনন্দিত এবং সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়জুল ইসলাম বলেন, ‘পর্যটক আসার সুযোগ করে দেওয়ায় আমরা দ্বীপবাসী সরকারকে স্বাগত জানাই। তবে দ্বীপ যেন বর্ষা মৌসুমে ভেঙে না যায়, সেজন্য দ্বীপের চারপাশে বেড়িবাঁধ নির্মাণে সরকারের প্রতি দাবি জানাচ্ছি।’
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, ‘আমরা সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের বরণে প্রস্তুত। ইতোমধ্যে আমরা সেন্টমার্টিন হোটেল মালিক, পর্যটন ব্যবসায়ীসহ অনেকের সঙ্গে মতবিনিময় করেছি, যাতে পর্যটকরা সেন্টমার্টিনে এসে নিরাপদে ভ্রমণ করতে পারেন। পাশাপাশি দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তৈরি করা হয়েছে।’
নেই ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ও সি অ্যাম্বুলেন্স : এই দ্বীপে পর্যটকদের জন্য ১৫০টির মতো উন্নত মানের হোটেল-রিসোর্ট রয়েছে। আছে অসংখ্য দোকানপাট। কিন্তু নেই ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ও সি অ্যাম্বুলেন্স। তাই অগ্নিদুর্ঘটনা হলে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না দ্বীপবাসী। এ নিয়ে স্থানীয়সহ অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। চলতি মৌসুমে পর্যটক যাওয়ার আগে হলেও একটি ফায়ার সার্ভিস অফিস স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন তারা। এদিকে সেন্টমার্টিনে উন্নত চিকিৎসা না থাকায় পর্যটক ও স্থানীয়দের কেউ অসুস্থ হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকনাফ নিতে সি অ্যাম্বুলেন্স দরকার। কিন্তু এই ব্যবস্থা দ্বীপে নেই। যে কারণে অনেক রোগী ও প্রসূতি মায়ের মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সৈয়দ আজিম বলেন, ‘এই দ্বীপকে কেন্দ্র করে অনেকে ব্যবসা করেন। কিন্তু এখানকার মানুষের নিরাপত্তার কথা কেউ চিন্তা করেন না। কোনো কারণে কারও ঘর, হোটেল, রিসোর্ট বা দোকানে আগুন লাগলে সব পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। তাই সরকারের কাছে দাবি-এই দ্বীপে যেন ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন করা হয়।’
সেন্টমার্টিনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়াজুল ইসলাম বলেন, সামনে পর্যটন মৌসুম। ফলে নতুন করে পর্যটকরা আসবেন। হঠাৎ যদি কোনো পর্যটক কিংবা স্থানীয় কোনো বাসিন্দা অসুস্থবোধ করেন, তাহলে তাকে উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার জন্য টেকনাফ নিতে এখানে সি অ্যাম্বুলেন্স নেই। স্বাভাবিক বোটে করে টেকনাফ চিকিৎসার জন্য যেতে হলে সাগরের জোয়ার-ভাটার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। ততক্ষণে রোগীর অবস্থার আরও অবনতি হয়। তাই আমরা সরকারের কাছে দাবি করছি অন্ততপক্ষে পর্যটন মৌসুমে হলেও একটি সি অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ দেওয়া হয়। কারণ আমাদের যে ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে তা উন্নত নয়।
