Logo
Logo
×

Advertisement

শেষ পাতা

সমাপ্ত প্রকল্পের গাড়ি অপব্যবহার

চিঠি দিয়েই দায় সারছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়

শাস্তি নেই কারও বিরুদ্ধে, মোটা অঙ্কের টাকা গচ্চা সরকারের

Advertisement

Icon

বাহরাম খান

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

চিঠি দিয়েই দায় সারছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়

Advertisement

প্রকল্পের গাড়ির অপব্যবহার রোধে সব মন্ত্রণালয়ে শুধু চিঠি দিয়েই দায়সারা দায়িত্ব পালন করছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। কয়েক দফা চিঠি দিলেও গাড়ির অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। উলটো নির্বিঘ্নে চলছে গাড়ি ও এর জ্বালানি তেল নিয়ে নানা দুর্নীতি। সর্বশেষ গাড়ি অপব্যবহার রোধে গত বুধবার পঞ্চম দফায় চিঠি দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

দেশে একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। এসব প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালনায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের গাড়ি। প্রকল্প সমাপ্তি শেষে গাড়ি জমা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে। বিধান অনুযায়ী এসব গাড়ি চূড়ান্তভাবে সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরে জমা হওয়ার কথা। কিন্তু সেগুলো জমা না দিয়ে ব্যবহার করছেন অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। এসব গাড়ির পেছনে মাসে মন্ত্রণালয়ের বাজেট থেকে দেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকার জ্বালানি, ড্রাইভার ও ওভারটাইম খরচ।

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন গাড়ি ও জ্বালানির দুর্নীতি-অপব্যবহারের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, গাড়ির অপব্যবহারের বিষয়ে আমরা বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়ায় সেটা কমেছে। অনেক মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত পদক্ষেপের তথ্যও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে এসেছে। আরও কিছু পদক্ষেপ চলমান আছে। এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, যারা বিভিন্নভাবে গাড়ি ব্যবহার করছেন, তারাও তাদের যুক্তি দেখাচ্ছেন। এসব যাচাই করে দেখা হবে। যাদের জবাব সন্তোষজনক নয়, তাদের ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সরকারি গাড়ি ও জ্বালানি ব্যবহারের দুর্নীতি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। একসময় শুধু ক্যাডার অফিসাররা গোপনে এসব সুবিধা গ্রহণ করলেও এই রোগ নন-ক্যাডারদের মধ্যেও ছড়িয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হলেও কার্যত নেওয়া হয় না। শুধু চিঠি দিয়েই দায়িত্ব শেষ করছে বলে অনেকে অভিযোগ করেছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গাড়ি নগদায়ন নীতিমালার ব্যত্যয় হলে যারা ব্যত্যয় করছেন তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি পদক্ষেপ নেবে মন্ত্রণালয়। তা না করে দফায় দফায় চিঠি দিয়ে গাড়ির হিসাব চাওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা চিঠি দিয়ে জানানো হচ্ছে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনেক মন্ত্রণালয় আগের মতোই গাড়ি ও জ্বালানি ব্যবহার করছে। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে নিয়ম প্রতিপালনের কথা জানানো হচ্ছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একটি সূত্র যুগান্তরকে জানায়, গত আগস্টে সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের ড্রাইভার আশিক রহমানকে এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে গাড়ি-জ্বালানি ব্যবহার ও দুর্ঘটনার অপরাধে বরখাস্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে শত শত অফিসার বছরের পর বছর এর চেয়ে হাজার গুণ বেশি গাড়ি ও জ্বালানি অপব্যবহার করছেন। ড্রাইভারের শাস্তি হয়, কিন্তু অফিসারের শাস্তির পদক্ষেপ নেয় না জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

গত নভেম্বরে সড়ক পরিবহণ বিভাগের বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার গাড়ি ও জ্বালানি অপব্যবহার নিয়ে একটি প্রতিবেদন যুগান্তর প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, সড়ক বিভাগ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে গাড়ির ব্যবহার ঠিকমতো হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু এ মন্ত্রণালয়ের প্রায় সব অফিসারই গাড়ি জ্বালানি-অপব্যবহার করছেন, যা নীতিমালা অনুযায়ী দুর্নীতির শামিল।

সড়ক বিভাগের দায়িত্বশীল সূত্র এ প্রতিবেদককে জানায়, প্রতিবেদন প্রকাশের পর তথ্য কোথা থেকে প্রকাশ হয়েছে, তা নিয়ে তোলপাড় হলেও অনিয়ম বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এছাড়া করোনাকালে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গাড়ি ও জ্বালানি ব্যবহার নিয়েও একাধিক গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু সে বিষয়েও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া যুগান্তরকে বলেন, অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে সংশ্লিষ্ট অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হয়। গাড়ি ও জ্বালানি অপব্যবহারের কারণে কোনো কর্মকর্তাকে শাস্তি দেওয়ার কথা জানা যায় না। তাহলে অন্যরা কেন সেটা থেকে বিরত থাকবে? তিনি বলেন, সরকার আন্তরিক হলে এটা বন্ধ করা খুবই সহজ। কিন্তু সরকার আন্তরিকভাবে সেটা চায় কি না, তা বুঝতে হবে।

সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সেটি জমা দেওয়ার কথা সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরে। কিন্তু সেই নিয়মের ধারে-কাছেও থাকে না মন্ত্রণালয়গুলো। অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানায়, শেখ ইউসুফ হারুন জনপ্রশাসন সচিব থাকার সময় কিছু গাড়ি জমা পড়েছে। এরপর টুকটাক জমা পড়লেও প্রত্যাশা অনুযায়ী জমা পড়ছে না। এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে দফায় দফায় চিঠি দেওয়া হলেও কার্যত কোনো উন্নতি নেই। বরং আগের চেয়ে বেশি করে দুর্নীতি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গাড়ি নীতিমালা সংশোধন ও চিঠি দেওয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি পদক্ষেপে আছে। কিন্তু এ বিষয়ে কাউকে শাস্তি দেওয়া হয়নি। যারা অপব্যবহার করে সরকারের টাকায় কেনা ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য ৫০ হাজার টাকা নিচ্ছেন, আবার সরকারি গাড়িও ব্যবহার করছেন, তাদের বিষয়ে কাউকেই শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়নি। কারণ অনেক সচিবও এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত।

একের পর এক চিঠি : ২০২০ সালের ৯ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগে (আইএমইডি) চিঠি দিয়ে ‘প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম এবং গাড়ি সেবা নগদায়ন নীতিমালা’ অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে বলা হয়। সেই সঙ্গে ২০১১ সালের মার্চ থেকে বিভিন্ন প্রকল্পে কত গাড়ি ব্যবহার হয়েছে, তা ছক অনুযায়ী তালিকা করে পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু আইএমইডি থেকে শুধু নিজেদের অধীনস্থ প্রকল্পের গাড়ির তথ্য জনপ্রশাসনকে দেওয়া হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ৪ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে আবারও আইএমইডিকে চিঠি দেওয়া হয়। পরের মাসে ১৭ ফেব্রুয়ারি আরেক দফা চিঠি দেওয়া হয়। এতে অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগের আওতাধীন প্রকল্পের গাড়ির তথ্যও পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়। এতেও কোনো কাজ হয়নি। এরপর ২৫ মার্চ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গাড়ি সেবা শাখা থেকে মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ দপ্তর-সংস্থাগুলোয় গাড়ি ও জ্বালানি ব্যবহারের প্রাপ্যতা বিষয়ে চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হয়। এতেও কাজ না হলে ২৩ সেপ্টেম্বর আবারও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে আইএমইডি সচিব বরাবর চিঠি পাঠানো হয়। এতে আগের চিঠির চাহিদা অনুযায়ী তথ্য না পাওয়ার কথা জানিয়ে ‘জরুরি’ ভিত্তিতে তথ্য দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। আর তাতেও কোনো ফল আসার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র। আইএমইডি থেকে ১১ নভেম্বর তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ৮টি সেক্টর প্রধানকে চিঠি দিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে তথ্য দিতে অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় তথ্য পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন আইএমইডির দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা। তারা বলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নিজে থেকেই সব মন্ত্রণালয় থেকে এসব তথ্য সরাসরি চাইতে পারে। এ বিষয়ে আইএমইডিকে কেন বারবার চিঠি দেওয়া হচ্ছে, তা বোধগম্য নয়। তাদের মতে, এসব গাড়ির অবৈধ সুবিধাভোগী শীর্ষ কর্মকর্তারা। তাদের বিষয়ে জনপ্রশাসন পদক্ষেপ না নিয়ে আইএমইডিকে দিয়ে তথ্য চাওয়ার যৌক্তিকতা তারা বুঝতে পারছেন না।

Advertisement

প্রকল্প গাড়ি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়

Advertisement

আরও পড়ুন

এলো ইউরেনিয়ামের আরেকটি চালান রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে ২০ নভেম্বর

রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে ২০ নভেম্বর

পর্যটক বরণে প্রস্তুত সেন্টমার্টিন

পর্যটক বরণে প্রস্তুত সেন্টমার্টিন

গুরুদাসপুরে হামলায় ছাত্রদল নেতার মৃত্যু এমপি আজিজের ছেলে মিন্টু তিন দিনের রিমান্ডে

এমপি আজিজের ছেলে মিন্টু তিন দিনের রিমান্ডে

একজন নুরুল আমিন সাবরেজিস্ট্রারের চাকরি করে এত সম্পদ!

সাবরেজিস্ট্রারের চাকরি করে এত সম্পদ!

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম