ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধকরণে করণীয়
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভিটামিন ‘ডি’-এর অভাবে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়। মাতৃত্বজনিত জটিলতা, নবজাতকের সমস্যা এবং এমনকি হৃদরোগ, ডায়াবোটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বর্তমানে বাংলাদেশের শহর ও গ্রামে বসবাসরত জনগণের মধ্যে ভিটামিন ‘ডি’র ভয়াবহ ঘাটতি লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী এরকম পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম গ্রহণ করা অপরিহার্য। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় “ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধকরণ : সম্ভাবনা ও করণীয়” বিষয়ে আলোচনা করতে সম্প্রতি যুগান্তরের সভাকক্ষে এক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। দৈনিক যুগান্তর, প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) এবং ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে দেশের খ্যাতিমান বিশেষজ্ঞরা এ আলোচনায় অংশ নেন।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য
স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যেহেতু খাদ্যের ভূমিকা রয়েছে, তাই নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ সবার চাহিদা। এটি নিশ্চিতকরণে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘ডি’ সম্পৃক্তকরণে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একেযোগে কাজ করে চলেছে। ইতোমধ্যে যতটুকু কাজ হয়েছে, এর অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়েছে। লক্ষ্য ও সময় নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্টদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাকি কাজ সম্পন্ন করতে হবে। তেলে ভিটামিন ‘ডি’ যুক্ত করার যুক্তিযুক্ত কারণ রয়েছে। এর বিপণনব্যবস্থার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের মোকাবিলা করতে হবে। ব্যবসায়ীদের যৌক্তিক মুনাফা রেখে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে মানসম্মত পণ্য পৌঁছে দিতে হবে। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সচেতনতা নিশ্চিতকরণে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মো. সাইদুর রহমান
সচিব, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়
ফর্টিফিকেশনে ৩০-৪০ ন্যানোমোল পারলিটার ভিটামিন ‘ডি’ যোগ করতে হবে
যে শিশুরা মায়ের বুকের দুধ পান করে তাদের মধ্যে ‘ডি’ ভিটামিনের অপর্যাপ্ততা নেই। অর্থাৎ মায়েদের মধ্যে ভিটামিন ‘ডি’র স্ট্যাটাস ভালো রাখতে হবে। গত এক যুগের ব্যবধানে বাংলাদেশে ভিটামিন ‘ডি’র অভাবজনিত সমস্য বেড়েছে। বিশেষ করে শিশুদের এ সমস্যা বেশি দেখা দিয়েছে প্রাপ্তবয়ষ্কদের চেয়ে। জনসংখ্যার সঙ্গে এই সমস্যাও বেড়েছে। ২০২৫-এ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী, যেসব জনসংখ্যায় ভিটামিন ‘ডি’র অভাব রয়েছে, সে জনসংখ্যায় ‘ডি’ সাপ্লিমেনটেশন বা ফর্টিফিকেশন কাজ করবে। জনসংখ্যার শতকরা দুই দশমিক পাঁচ ভাগের বেশি ‘ডি’র অভাব থাকলে এ ফর্টিফিকেশন প্রয়োজন।
অধ্যাপক ডা. তাহমিদ আহমেদ
নির্বাহী পরিচালক, আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র (আইসিডিডিআর,বি)
জনগোষ্ঠীর প্রায় ৬৭ ভাগ ভিটামিন ‘ডি’র অভাবজনিত সমস্যায় ভুগছেন
ভিটামিন ‘ডি’র অভাবে শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশ ব্যাহত হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, হাড় ও দাঁতের সঠিক বৃদ্ধি হয় না, নবজাতকের রিকেটস, বয়স্কদের হাড়ের রোগ অস্টিওম্যালেশিয়া, মেনোপজ নারীদের অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ক্ষয় রোগ হয়। দেশব্যাপী সব বয়সি নারী ও পুরুষ এবং প্রবীণ মিলিয়ে ২৪৮১ জনের মধ্যে ২০২৫ সালে এক গবেষণায় ৬ থেকে ৯ বছর বয়সিদের মধ্যে ভিটামিন ‘ডি’ স্বাভাবিক (নরমাল) পাওয়া গেছে ৪.৯%, অপর্যাপ্ত (ইনসাফিসিয়েন্সি) ৩৬.৪% এবং অভাব (ডেফিসিয়েন্সি) ৫৮.৬%। ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সিদের মধ্যে ভিটামিন ‘ডি’ স্বাভাবিক পাওয়া গেছে ২.৮%, অপর্যাপ্ত ১৯.৪% এবং অভাব ৭.৮%। গর্ভবতীদের ভিটামিন ‘ডি’ স্বাভাবিক পাওয়া গেছে ৪.৬%, অপর্যাপ্ত ১০.৩% এবং অভাব ৮৩.৩%। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে স্বাভাবিক ভিটামিন ‘ডি’ পাওয়া গেছে ১২.৯%, অপর্যাপ্ত ১৪.৭% এবং অভাব ৭২.৪%। প্রবীণদের মধ্যে স্বাভাবিক পাওয়া গেছে ১৪.৮%, অপর্যাপ্ত ৩৪.৭% এবং অভাব ৫০.৫%। প্রমাণসাপেক্ষে ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধকরণের প্রস্তাব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে। ভিটামিন যেহেতু চর্বিতে দ্রবণীয়, তাই তেলে ফর্টিফিকেশন জরুরি।
ডা. রওশন জাহান আখতার আলো
উপপরিচালক, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান
শুধু রোদে গেলেই ভিটামিন ‘ডি’ শরীরে সক্রিয় হয় না
সূর্যের আলো ভিটামিন ‘ডি’র প্রভাবক হিসাবে কাজ করে বা ‘ডি’ তৈরিতে সাহায্য করে। তবে ভিটামিন ‘ডি’র বিপাকপ্রক্রিয়ার প্রধান তিনটি ধাপ হলো-প্রোভিটামিন ‘ডি’, প্রিভিটামিন ‘ডি’ এবং সক্রিয় ভিটামিন ‘ডি’। মানুষের ত্বকের উপরিভাগের স্তরে (এপিডার্মিসে) ৭-ডিহাইড্রোকোলেস্টেরল নামক একটি উপাদান থাকে। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে এটি প্রথমে প্রিভিটামিন ‘ডি’-তে রূপান্তরিত হয় এবং পরে তা ভিটামিন ‘ডি’ (কোলেক্যালসিফেরল)-এ পরিণত হয়। এরপর ভিটামিন ‘ডি’ যকৃতে গিয়ে ২৫-হাইড্রোক্সি ভিটামিন ‘ডি’-তে রূপ নেয়। পরবর্তী ধাপে কিডনিতে ১ ও ২৫ অবস্থানে হাইড্রক্সিলেশনের মাধ্যমে এটি শরীরের কার্যকর বা সক্রিয় রূপে পরিণত হয়। এর সক্রিয় রূপ শরীরে খুব অল্প সময় স্থায়ী হয়। তাই শরীরে ভিটামিন ‘ডি’র অবস্থা নির্ণয়ের জন্য সাধারণত ২৫-হাইড্রোক্সি ভিটামিন ‘ডি’ পরিমাপ করা হয়। ভিটামিন ‘ডি’ কিছু খাদ্য থেকেও পাওয়া যায়। উদ্ভিদজাত খাদ্যের মধ্যে বিশেষ করে মাশরুমে এবং প্রাণিজ উৎস যেমন ডিমের কুসুম, চর্বিযুক্ত মাছ ও দুধজাত খাদ্যে ডি ভিটামিন পাওয়া যায়। শুধু রোদে গেলেই সবার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি তৈরি হবে-এটা ঠিক নয়। ত্বকের রং, বয়স, সময়, সূর্যের আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি, স্বাস্থ্য, ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার-সবকিছুই এর উপর প্রভাব ফেলে।
অধ্যাপক ড. নাজমা শাহীন
সাবেক পরিচালক, পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ভিটামিন ‘ডি’ খুব কম বা খুব বেশি দেওয়া যাবে না
ভিটামিন ‘ডি’ একটি এন্টিঅক্সিডেন্ট যা এন্ডোথেলিয়ামের ওপর কাজ করে। এর অভাবে এন্ডোথেলিয়ামের উপরিভাগ নষ্ট হয়ে গিয়ে এর কার্যকারিতা হারায়। এ কারণেই করোনার সময় ফুসফুসের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভিটামিন ‘ডি’ সাপ্লিমেন্ট দেওয়া হয়েছে। এন্ডোথেলিয়ামের অকার্যকারিতার জন্য ডায়াবেটিস বেড়ে যায়, রেনিন এনজিওটেনসিন সিস্টেমের ওপর কাজ করে উচ্চরক্তচাপ সৃষ্টি করে। হৃদরোগেরও অন্যতম কারণ ভিটামিন ‘ডি’ স্বল্পতা। এর স্বল্পতার ফলে হার্টে অ্যারিথমিয়া হয় অর্থাৎ হার্টের বিটের ছন্দপতন ঘটে। ফলে অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন হয়। এর ফলে হার্ট, ব্রেইন ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় থ্রম্বোএম্বোলিজম বা রক্ত জমাট বেঁধে যায়। এন্ডোথেলিয়ামের অকার্যকারিতার জন্য রক্তের খারাপ কোলেস্টেরল এলডিএল বাড়ে। ভিটামিন ‘ডি’ শরীরে সক্রিয় বা একটিভ অবস্থায় পেতে হলে সূর্যালোকের সংস্পর্শে ১০-৩০ মিনিট করে সকাল ১০ থেকে বিকাল ৩টার মধ্যে হাত-পা, পেট ও মুখ উন্মুক্ত করে থাকতে হবে।
অধ্যাপক ডা. ধীমান বনিক
সিনিয়র কনসালট্যান্ট, কার্ডিওলজিস্ট ন্যাশনাল হার্ট
ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট
ভিটামিন ‘ডি’-এর অভাবে বিষণ্নতাও পরিলক্ষিত হচ্ছে
বাংলাদেশে অধিকাংশ মানুষ ভিটামিন ডি- এর ঘাটতিতে ভুগছে। এর কারণ ও ঝুঁকি হচ্ছে সূর্যালোকের অভাব, খাদ্যাভ্যাস, ত্বকের রং ও বায়ুদূষণ। নগরজীবনের ঘরকেন্দ্রিক জীবনযাপন, বহুতল ভবনে বসবাস এবং ঘরের বাইরে যাওয়ার প্রবণতা কমে যাওয়ায় পর্যাপ্ত রোদ শরীরে লাগে না। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় তৈলাক্ত মাছ, ডিমের কুসুম বা দুগ্ধজাত পণ্যের মতো ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ খাবার না খাওয়াও এই স্বল্পতার জন্য দায়ী। আবার চাহিদা অনুযায়ী ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণের পরও অনেক ক্ষেত্রে সূর্যালোকে না যেতে পারাও একটি সমস্যা। দক্ষিণ এশীয়দের গাঢ় ত্বকের পিগমেন্টেশন (মেলানিন) ও সূর্যালোক থেকে ভিটামিন ডি তৈরির প্রক্রিয়া ধীর করে দেয়। বায়ুদূষণের কারণে সূর্যের রশ্মি ত্বকে কম পৌঁছায়, ফলে ত্বকে ভিটামিন ডি তৈরিতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। এছাড়াও যাদের সূর্যের অলোর সংস্পর্শে যাওয়ার সুযোগ কম, তাদের চেষ্টা করতে হবে দিনের একটা সময় শরীরের কিছু অংশ অনাবৃত রেখে সূর্যালোকে থাকার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা। পাশাপাশি অতিরিক্ত ফাস্টফুড গ্রহণের ফলে স্থূলতা তৈরি হচ্ছে এবং স্থূল ব্যক্তিদের মধ্যে ভিটামিন ডি-এর অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। সঙ্গে উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, হাইপারথাইরয়েডিজম, পিসিওএসসহ নানা রোগের প্রবণতা বাড়ছে।
ছাঈদা লিয়াকত
পুষ্টিবিদ, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল
ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধকরণ সময়ের দাবি
ভিটামিন ‘ডি’ ঘাটতি খুব কমন ও উদ্বেগজনক সমস্যা হিসাবে দেখতে পাচ্ছি। শহর ও গ্রাম-উভয় পর্যায়ের রোগীদের মধ্যেই এ ঘাটতির হার বেশি। আমার কাছে বিভিন্ন ধরনের রোগীদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন, শিশুদের অপুষ্টি নিয়ে আসা রোগী উল্লেখযোগ্য। এ রোগীর বিভিন্ন উপসর্গ থাকে-যেমন দীর্ঘদিনের শরীর ব্যথা, কোমর ও হাঁটুর ব্যথা, সহজে ক্লান্ত হয়ে পড়া, পেশি দুর্বলতা, বারবার অসুস্থ হওয়া এমনকি মানসিক অবসাদ। এদের বড় একটি অংশেই ভিটামিন ডি-এর মাত্রা স্বাভাবিকের নিচে। আমি সম্প্রতি ৭৫০ জন নারীদের ওপর ভিটামিন ডি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করেছি। দেখতে পেয়েছি নারীরা সারা দিন ঘরের মধ্যে, অফিসে বসে কাজ করার কারণে সূর্যের আলো না পাওয়া এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ না করায় তাদের ভিটামিন ডি ঘাটতি মারাত্মক আকারে পাওয়া গেছে। অপরদিকে শিশুর মধ্যেও অনেকটা এমন যে তারা মাঠে খেলতে পারছে না, এজন্য সূর্যের আলো কম পাচ্ছে। নিম্ন-আয়ের মানুষের অথবা যারা গ্রামে বড় হচ্ছে, তাদের মধ্যেও ভিটামিন ডি কম পেয়েছি। ভিটামিন ডি যেসব খাবারে আছে, সেগুলো খুবই কম মাত্রায় পাওয়া যায় যেটা প্রতিদিনের প্রয়োজন মেটানো সবার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠছে না বা সবাই গ্রহণ করছেন না। অন্যদিকে প্রতিদিন রোদে থাকার সুযোগ সবাই পাচ্ছেন না। যার ফলে আমাদের মধ্যে এখনো ভিটামিন ডি ঘাটতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
সামিয়া তাসনিম
পুষ্টিবিদ, আনোয়ার খান মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হসপিটাল
আইন প্রণয়ন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় একযোগে কাজ করতে হবে
ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধ করা অপরিহার্য। রিফাইনারি কোম্পানিগুলো অনেক সময় খরচের কথা বলে। কিন্তু আসলে খরচ বেশি হয় না। আমরা মনে করি, আজ এই যে উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে, অর্থাৎ ভোজ্যতেল ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধকরণ, এটি করতে কিছু বাধা, কিছু চ্যালেঞ্জ আসবে। কিন্তু সরকার যেহেতু নাগরিকের সুস্বাস্থ্যের কথা বলে, সুতরাং এটি করা সম্ভব। আমরা ক্যাবের পক্ষ থেকে মানুষকে এ বিষয়ে সচেতন করার জন্য যে কাজ করা দরকার, সেটা নির্দ্বিধায় করব। তবে একটি কথা হলো-আইন হলে সেটা বাস্তবায়ন ও মনিটরিংয়ের দায়িত্ব সরকার যদি শক্তভাবে পালন না করে তাহলে আমরা যত আইনই করি, যত উদ্যোগই নিই না কেন, একপর্যায়ে গিয়ে এটার কোনো সুফল আমরা পাব না। ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধকরণ সফলতার সঙ্গে করতে হলে রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে কাজ করতে হবে। কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জনগণকে সচেতন করে তোলার কাজটি আমরা করে যাচ্ছি। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, আইন প্রয়োগে রাজনৈতিক ও কাঠামোগত বাধা দূর করতে হবে। তা না হলে সফলতা আসবে না।
অ্যাডেভোকেট হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া
সাধারন সম্পাদক, কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় যুগান্তর বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছে
সুষম ও বিশুদ্ধ খাদ্য জনগণের মধ্যে নিশ্চিত করা আমাদের সংবিধানে আছে। ২০০৮-২০০৯ সালে ভোক্তা অধিকার আইন দেশে চালু হয়। ২০১৩ সালে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠিত হয়। গোটা বিশ্ব থেকে ভিটামিন ‘এ’ প্রিমিক্স কিনে আমাদের প্রতিষ্ঠিত ৬-৭টি রিফাইনারি প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট পরিমাণে ‘এ’ ভিটামিন যুক্ত করার সক্ষমতা দেখাচ্ছে। এর বাইরে ১৫০-২০০ রিফাইনারি প্রতিষ্ঠান খুচরা পর্যায়ে কেনাবেচা করেন। ভোজ্যতেল খোলা অবস্থায় বাজারজাত করলে ভিটামিন ‘এ’ এর মান ক্ষুণ্ন হয়। বাইরের ধুলাবালির সংস্পর্শে তেল তার গুণগত মান হারায়। তাই তেলকে বোতলজাত করে মার্কেটিং করতে হবে। নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করার কমিটমেন্ট আমাদের আছে। এজন্য ভোক্তার অধিকার হচ্ছে নিরাপত্তা, তথ্য বা সচেতনতা ও পছন্দ। ভিটামিন ‘ডি’ ফর্টিফিকেশনে তিনটি মন্ত্রণালয় সম্পৃক্ত-স্বাস্থ্য, বাণিজ্য ও শিল্প। আইন তৈরি করে শিল্প মন্ত্রণালয়, দাম নির্ধারণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্যগত দিক দেখে থেকে। প্রতি লিটার প্রিমিক্সে দাম যোগ হয় ৫০-৭০ পয়সা আর বোতল করার জন্য অতিরিক্ত ২-২.৫ টাকা খরচ হয়। তাই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভিটামিন ‘ডি’ ফর্টিফিকেশনের সুফল অনেক বেশি।
ফকির মুহাম্মদ মুনাওয়ার হোসেন
পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ), জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ
সচেতনতা সৃষ্টি ও বাজার মনিটরিং নিয়ে কাজ করছি
দেশের মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাই হচ্ছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কাজ। আইন-বিধি প্রণয়ন ও প্রয়োগ করাও প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম কাজ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশিক্ষণ, মানুষকে সচেতন করা ও সঠিক তথ্য প্রচার করা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, গেইন, বিএসটিআই, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে আমরা কাজ করি এবং বাজার মনিটর করি। খাদ্যের উৎপাদন পর্যায় থেকে শুরু করে লেবেলিং পর্যন্ত খাদ্য নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সব বিষয় আমাদের কার্যপরিধির অন্তর্ভুক্ত। ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধকরণ জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি উন্নয়নের একটি সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ মানদণ্ড নির্ধারণ, বাজার তদারকি এবং আইন প্রয়োগের মাধ্যমে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমানে নিরাপদ খাদ্য প্রবিধানমালা-২০২৫ চূড়ান্ত করার পর্যায়ে রয়েছে। ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’, ‘ডি’সহ প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধকরণ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট উৎপাদক ও কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ ভোজ্যতেল নিশ্চিত করতে বাজার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রতিটি সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে আমরা ফর্টিফায়েডের পথে কথা বলি। এখন প্রয়োজন আইনের প্রয়োগ ও তার দ্রুত বাস্তবায়ন। জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি উন্নয়নে ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধকরণে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
ড. মোহাম্মদ মোস্তফা
সদস্য (জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি), বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ
বিএসটিআই-এর আঞ্চলিক ল্যাবের আধুনিকায়ন দরকার
২০১৩ সালে যখন ভিটামিন ‘এ’ ফর্টিফিকেশন হয়, তখন বিএসটিআই-এর জনবলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ফলে ভিটামিন ‘এ’ টেস্টিং, মনিটরিং ও আইন বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে। তবে কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো রয়েছে। মান নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির জন্য কেবল আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, বরং কারিগরি ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা অপরিহার্য। ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধকরণ হলে এর বাস্তবায়নের দায়িত্ব বিএসটিআই-এর ওপরই বর্তায়। ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধ ড্রামের তেলের উপাদান চিহ্নিত করাসহ অন্যান্য পণ্যের রিস্ক ফ্যাক্টর যাচাইয়ে বিএসটিআই’র আঞ্চলিক ল্যাবগুলো আধুনিকায়ন ও লজিস্টিক সাপোর্ট জরুরি। কর্মকর্তাদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, যাতে তারা বুঝতে পারেন উৎপাদনের কোন পর্যায়ে ভিটামিন যুক্ত করা হচ্ছে এবং নমুনা সংগ্রহের সঠিক পদ্ধতি কী।
শশী কান্ত দাস
সহকারী পরিচালক, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই)
তেলে ‘ডি’ সমৃদ্ধকরণ হবে একটি যুগান্তকারীপদক্ষেপ
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের টেকিনিক্যাল অ্যাডভাইজরি কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসারে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে জাতীয় পর্যায়ে ভিটামিন ‘ডি’-এর ওপর একটি সার্ভে করা হয়। জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে করা সার্ভের ড্রাফট গত বছরের অক্টোবরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখন শিল্প মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি সুপারিশমালা চেয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশেই ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়া চালু হয়ে গেছে। বাংলাদেশেও রিফাইনারি বা ভোজ্যতেলের ডিলাররা ভিটামিন ‘এ’র সঙ্গে ‘ডি’ প্রিমিক্স নিয়ে আসবে এবং একই পদ্ধতিতে একই মেশিনে তারা মিশ্রণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে। ভিটামিন ‘ডি’ সঠিক মাত্রায় আছে কি না, তা ৬ মাস থেকে ১ বছর পরপর মনিটর করবে। বাজারে ৬ মাসের বেশি ভিটামিন ‘ডি’ ফর্টিফিকেশনযুক্ত তেল থাকলে তার মান কমে যাবে।
ড. আশেক মাহফুজ
পোর্টফোলিও লিড, লার্জ স্কেল ফুড ফর্টিফিকেশন অ্যান্ড ভ্যালু চেইন, গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ইমপ্রুভড নিউট্রিশন (গেইন)
বিদ্যমান আইন সংশোধন করাই উত্তম
ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধকরণে আইনগত দিক নিয়ে দুভাবে এগিয়ে যাওয়া যেতে পারে। বিএসটিআই আইন ২০১৮ অনুযায়ী ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে বিএসটিআই যে কোনো খাদ্যপণ্য বা যে কোনো পণ্য প্রস্তুতে স্ট্যান্ডার্ড নিরূপণ করে থাকে। এক্ষেত্রে ন্যাশনাল টেকনিক্যাল কমিটির মাধ্যমে এ মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধকরণে একইভাবে এ কাজটি করা যাবে। তবে তা বাধ্যতামূলক হবে না, ঐচ্ছিক হবে। একটি আইন থাকলে বিএসটিআই কর্তৃক নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ডটি বাধ্যতামূলক হবে। যেমন হয়েছে লবণে আয়োডিন মিশ্রণ, ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ মিশ্রণ এবং পাকিস্তান আমলে করা পিউর ফুড অর্ডিন্যান্স, ১৯৫৯-এ উল্লিখিত ১০৭টি পণ্যের ক্ষেত্রে। জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় ভিটামিন ‘ডি’ মিশ্রণ বাধ্যতামূলক করতে চাইলে নতুন আইন প্রণয়ন বা বিদ্যমান আইন সংশোধন করার পথে যেতে হবে।
মুশতাক হাসান মুহ. ইফতিখার
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ
ভোজ্যতেলে ‘ডি’ সমৃদ্ধকরণ হবে সর্বজনীন ও ব্যয় সাশ্রয়ী
বর্তমানে দেশে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ভিটামিন ‘ডি’ ঘাটতি এবং এ সংক্রান্ত অসুস্থতা বাড়ছে। যেহেতু সব মানুষই কম-বেশি ভোজ্যতেল খেয়ে থাকেন, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক দিক থেকে ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধকরণ একটি সর্বজনীন এবং ব্যয় সাশ্রয়ী পদক্ষেপ হতে পারে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্ব সবার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একার পক্ষে এ দায়িত্ব সঠিকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। সব মন্ত্রণালয় যদি জনস্বাস্থ্যকে বিবেচনায় রেখে তাদের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে, তবে স্বাস্থ্য খাতের ওপর জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার চাপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে। সম্প্রতি অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছে। এটি দেশের ইতিহাসে অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) নিয়ন্ত্রণে সর্ববৃহৎ আন্তঃমন্ত্রণালয় উদ্যোগ। ভোজ্যেতেলে ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধকরণ এ উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
এবিএম জুবায়ের
নির্বাহী পরিচালক, প্রজ্ঞা
‘ডি’র অভাব বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার জন্য দায়ী
দেশে দুটি জাতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট স্ট্যাটাস সার্ভে পরিচালিত হয়েছে। বাংলাদেশে ভিটামিন ‘ডি’ ঘাটতির ব্যাপকতা ও এর স্বাস্থ্যগত প্রভাবের পাশাপাশি ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ, ডিসলিপিডেমিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগের সঙ্গে ভিটামিন ‘ডি’র ঘাটতির বৈজ্ঞানিক যোগসূত্র পাওয়া যায়। এ প্রেক্ষাপটে ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘ডি’ ফর্টিফিকেশন একটি প্রমাণভিত্তিক, কার্যকর ও সাশ্রয়ী জনস্বাস্থ্য হস্তক্ষেপ হিসাবে অভিহিত করা হবে। বিশ্বের ৪৪টি দেশে ভোজ্যতেল ভিটামিন দ্বারা সমৃদ্ধ করা হয়। বেশির ভাগ দেশেই ভিটামিন ‘এ’-এর সঙ্গে ভিটামিন ‘ডি’ যোগ করে সমৃদ্ধ করা হয়।
ইশরাত আজম ঈশিতা
পুষ্টিবিদ ও প্রকল্প কর্মকর্তা, লার্জ স্কেল ফুড ফর্টিফিকেশন কান্ট্রি অ্যাডভোকেসি বাংলাদেশ, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট
