Logo
Logo
×

Advertisement

গোলটেবিল বৈঠক

উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি

প্রযুক্তি দক্ষতা ও জ্বালানিতে বড় বিনিয়োগ জরুরি

Advertisement

Icon

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

সস্তা শ্রমের ওপর ভর করে অর্থনীতির পথ আর বেশি দূর এগোনো যাবে না। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশকে কম সময়ে, কম খরচে এবং ভালোমানের পণ্য ও সেবা দিতে হবে। আর এর মূল বিষয় হলো উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। কিন্তু এ পথে বড় বাধা হয়ে আছে প্রযুক্তির ঘাটতি, দক্ষ শ্রমিকের অভাব, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সংকট, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা ও অবকাঠামোগত সমস্যা। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি শিল্পে আধুনিক প্রযুক্তি ও উৎপাদন ব্যবস্থার ব্যবহার এখনো সীমিত। ফলে শ্রম ও পুঁজি থাকলেও কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন হচ্ছে না। তবে সম্ভাবনাও কম নয়। দক্ষতা উন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, শিল্পের আকার বাড়ানো, গবেষণা ও উদ্ভাবন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি এবং সরকারি প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে উৎপাদনশীলতায় বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। ‘জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবস’ উপলক্ষ্যে ১ অক্টোবর গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ন্যাশনাল প্রোডাক্টিভিটি অরগানাইজেশন (এনপিও) ও যুগান্তর যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনে কক্ষে এ আয়োজনের বিষয় ছিল : ‘বাংলাদেশে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি : চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয়।’ তাদের মতে, শুধু নতুন যন্ত্র কিনলেই হবে না; প্রযুক্তির সঙ্গে দক্ষতা, ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার সমন্বয় করতে হবে। একই সঙ্গে ছোট শিল্পকে বড় হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। অপচয় কমিয়ে, সময় বাঁচিয়ে এবং কাজের পদ্ধতি বদলে বাংলাদেশকে উৎপাদনশীলতার নতুন পথ তৈরি করতে হবে। অনুষ্ঠান সঞ্চালন করেন যুগান্তরের বিজনেস এডিটর মনির হোসেন

বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে উৎপাদনশীলতা বাড়াতেই হবে : খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় একই পণ্য নিয়ে টিকে থাকতে হলে উৎপাদনশীলতা বাড়াতেই হবে। কারণ কোনো পণ্য প্রতিযোগিতামূলক না হলে অন্য পণ্যই বাজার দখল করবে। বাংলাদেশের পক্ষে বৈশ্বিক অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার সুযোগ নেই। তাই উৎপাদনশীলতা এখন শুধু শিল্পের বিষয় নয়, দেশের অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তার সঙ্গেও এটি যুক্ত। উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়েও একই উদ্দেশ্যে আলাদা প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে কাজের পুনরাবৃত্তি বা ওভারল্যাপ আছে কিনা, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একই ধরনের কাজ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে হলে সম্পদের অপচয় হতে পারে এবং কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে। প্রকল্পগুলোর সফট কপি পর্যালোচনা করে একই ধরনের উদ্দেশ্যের প্রকল্পগুলো চিহ্নিত করা গেলে সরকারের কাজের দক্ষতা দুই অঙ্ক পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। শিল্পমন্ত্রী বলেন, উৎপাদনশীলতা কোনো নির্দিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়; এটি একটি সংস্কৃতি। ঘরের কাজ থেকে শুরু করে অফিস, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও কারখানা-সব জায়গায় সময় ও সম্পদের সঠিক ব্যবহার করতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে একই সময়ে কম শ্রমঘণ্টায় বেশি উৎপাদন করা সম্ভব। তবে প্রযুক্তির কারণে কোনো কোনো খাতে কর্মসংস্থান কমতে পারে। তাই প্রযুক্তি গ্রহণের পাশাপাশি শ্রমিকদের নতুন দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

কারখানার আসল বাধা আগে চিহ্নিত করতে হবে : আব্দুন নাসের খান

বিশেষ অতিথি শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান বলেন, উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর আগে কারখানাগুলোর প্রকৃত সমস্যা কোথায়, তা চিহ্নিত করতে হবে। সমস্যা প্রযুক্তিতে, দক্ষতায়, ব্যবস্থাপনায়, অর্থায়নে, লজিস্টিকসে নাকি বিধিবিধানে-তা শিল্প খাতের কাছ থেকেই জানতে হবে। নীতিনির্ধারকদের কাছে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে, কারখানার উৎপাদন ব্যবস্থায় বাস্তব সমস্যা তার চেয়ে ভিন্ন হতে পারে। তিনি বলেন, দ্রুত প্রযুক্তি পরিবর্তন, দক্ষ জনবলের ঘাটতি, উৎপাদনশীলতা পরিমাপের সীমাবদ্ধতা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে উৎপাদনশীলতার চর্চার ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে। শুধু কম মজুরির শ্রমিকের ওপর নির্ভর করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে না। শ্রমিকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা ও পণ্যের মূল্য সংযোজন বাড়াতে হবে। তার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, রোবটিকস এবং স্মার্ট বা ডিজিটাল ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের কাঠামো বদলে দিচ্ছে।

শুধু মেশিন কিনলেই উৎপাদন বাড়বে না : মো. ফজলুল হক

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, উৎপাদনশীলতার জন্য আধুনিক মেশিনের পাশাপাশি উৎপাদন পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা, দক্ষ শ্রমিক এবং শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে শিল্পের চাহিদার সমন্বয় প্রয়োজন। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে দেশের তুলনায় উৎপাদনশীলতার দিক থেকে এগিয়ে থাকা খাত হিসাবে বিবেচনা করা হলেও আন্তর্জাতিকমানের তুলনায় এখনো ঘাটতি রয়েছে। তার মতে, একই পদ্ধতিতে কাজ করতে করতে সাধারণত ২ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত উন্নতি সম্ভব। কিন্তু বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হলে বড় উদ্যোগ প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ পরিকল্পনা করে দিলেও উৎপাদন পর্যায়ে নতুন পদ্ধতি গ্রহণে অনীহা থাকে।

প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার জরুরি : আবদুল হাই শিকদার

যুগান্তর সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একদিকে বড় সুযোগ, অন্যদিকে বড় চ্যালেঞ্জ। মেশিন ও এআই মানুষের অনেক কাজ করে দিচ্ছে। ফলে মানুষের কাজের ধরন বদলে যাচ্ছে। তবে প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকার সুযোগ নেই। বরং মানুষের সক্ষমতা বাড়াতে প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। তিনি বলেন, উৎপাদনশীলতার অর্থ হলো একই শ্রম, সময়, অর্থ ও কাঁচামাল ব্যবহার করে বেশি এবং ভালোমানের পণ্য বা সেবা দেওয়া। অপচয়, সময় ও খরচ কমানোর পাশাপাশি মান ধরে রাখতে হবে। শুধু সস্তা শ্রম দিয়ে বাংলাদেশকে আর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার চেষ্টা করলে হবে না। দক্ষতা, প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা ও অপচয় কমানোর ওপর জোর দিতে হবে।

ছোট শিল্পকে বড় করার সুযোগ দিতে হবে : ড. নাজনীন আহমেদ

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ক্ষুদ্র শিল্পগুলোকে ছোট অবস্থায় আটকে না রেখে মাঝারি ও বড় শিল্পে পরিণত করার সুযোগ তৈরি করতে হবে। বড় প্রতিষ্ঠানের গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগের সক্ষমতা থাকে। ছোট প্রতিষ্ঠানের সেই সক্ষমতা সীমিত। তাই প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও উদ্ভাবনে সহায়তা দিতে হবে। এনপিও, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ইন্ডাস্ট্রি স্কিলস কাউন্সিল ও হাইটেক পার্কের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। এসএমই ফাউন্ডেশনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। তিনি বলেন, প্রযুক্তি ব্যবহার করে শুধু শ্রমিকের সংখ্যা কমানো নয়, দক্ষ ও নতুন ধরনের কর্মসংস্থান তৈরির দিকেও নজর দিতে হবে। কর্মরত নারীদের প্রশিক্ষণের জন্য কর্মঘণ্টার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা দরকার। উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সঙ্গে অর্থায়নের সম্পর্কও তৈরি করা যেতে পারে।

প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোর ঘাটতি : অধ্যাপক নাফিস আহমেদ

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাকসন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক নাফিস আহমেদ বলেন বাংলাদেশের শ্রমিকরা পরিশ্রমী নন-এমন ধারণা ঠিক নয়। প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তিনি বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, দক্ষ জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত অবকাঠামো প্রয়োজন। কিছু গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনশীলতা সূচকে ভিয়েতনাম বাংলাদেশের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ এবং চীন চার থেকে পাঁচ গুণ এগিয়ে। তৈরি পোশাকের একজন অপারেটরের উৎপাদনশীলতাও ভিয়েতনামের তুলনায় ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ কম বলে তিনি উল্লেখ করেন। এর পেছনে প্রশিক্ষণ, ব্যবহারিক শিক্ষা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে।

উৎপাদনশীলতা মাপতে হবে সময় দিয়ে : ড. আশির আহমেদ

জাপানের কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব ইনফরমেশন সায়েন্স অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. আশির আহমেদ বলেন, উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে সময়। একটি কাজ সম্পন্ন করতে কত সময় লাগছে, তা নির্ধারণ করে এক বছরের মধ্যে সময় কতটা কমানো সম্ভব-এর লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। তবে শুধু সময় কমালেই হবে না। সেবার মানও একই সঙ্গে পরিমাপ করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবার মতো ক্ষেত্রে দ্রুত সেবা দেওয়ার পাশাপাশি সেবার গুণগত মান ঠিক রাখা জরুরি। তাই প্রতিটি কাজের নির্দিষ্ট ধাপ ও পরিমাপযোগ্য সূচক নির্ধারণ করে উৎপাদনশীলতা মূল্যায়ন করতে হবে।

৯০ শতাংশ শিল্পই ক্ষুদ্র ও কুটির : ড. এ কে এনামুল হক

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ শিল্প কুটির ও ক্ষুদ্রশিল্প। এর বড় অংশ গত ১০ থেকে ১৫ বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়নি। ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত শ্রম উৎপাদনশীলতার গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে এ প্রবৃদ্ধি মূলত রপ্তানিমুখী খাতে কেন্দ্রীভূত ছিল; অভ্যন্তরীণ বাজারমুখী শিল্পে উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম। তিনি বলেন, করোনার আগে শিল্পের সক্ষমতা ব্যবহারের হার ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ। ২০২৩ সালে তা নেমে প্রায় ৭১ শতাংশে দাঁড়ায়। ৮৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠান মূলধনের সংকটকে বড় সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করেছে। অভ্যন্তরীণ শিল্পে পুঁজি ও উৎপাদনের অনুপাত কমছে। উচ্চ সুদের হার এর একটি কারণ হতে পারে। তিনি ছোট শিল্পকে বড় করার ওপর জোর দিয়ে বলেন, শিল্পায়নের কৌশল নতুন করে ভাবতে হবে।

শুধু জমি দেওয়ার পরিবর্তে প্রস্তুত শিল্প অবকাঠামো বা রেডি-বিল্ট শিল্প-স্পেস তৈরি করা দরকার। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা ও শিল্পের চাহিদার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চ দক্ষতার কর্মী নিয়োগে সমস্যায় পড়ে। তাই তাদের বড় হওয়ার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

পোশাকে প্রযুক্তি বাড়লেও নারী শ্রমিকের অংশ কমছে : ইনামুল হক খান

তৈরি পোশাক খাতের মালিক পক্ষের সংগঠন বিজিএমইএ’র সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, শুধু মেশিন কিনলে উৎপাদনশীলতা বাড়ে না। প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, দক্ষতা, উৎপাদন পরিকল্পনা এবং ব্যবসার পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সময়মতো পণ্য সরবরাহ, প্রযুক্তি, টেকসই উৎপাদন ও দক্ষতা এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি বলেন, তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৩৮ লাখ শ্রমিক কাজ করছেন। এর মধ্যে নারী ৫৮ শতাংশ। একসময় এ খাতে নারী শ্রমিকের অংশ ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমবাজারেও পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে নারী শ্রমিকদের নতুন প্রযুক্তির উপযোগী প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এআই, ডিজিটালাইজেশন ও তথ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি শ্রমিক, টেকনিশিয়ান ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে দক্ষতা বাড়ানো দরকার।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য চ্যালেঞ্জ আরও বেশি। তিনি জ্বালানি সংকট দূর করে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো এবং সমুদ্রভিত্তিক গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্ব দেন। পণ্যের বৈচিত্র্য ও মূল্য সংযোজন বাড়ানোরও আহ্বান জানান।

উৎপাদনশীলতার তথ্যে ঘাটতি, পরিমাপও জরুরি : মোহা. নায়েব আলী

ন্যাশনাল প্রোডাক্টিভিটি অর্গানাইজেশনের (এনপিও) মহাপরিচালক মোহা. নায়েব আলী বলেন, উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর অন্যতম বড় বাধা হলো তথ্যের ঘাটতি। খাতভিত্তিক উৎপাদনশীলতা কত, তা নিয়মিত পরিমাপ করতে হবে। গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শসেবা বাড়াতে হবে। তিনি জানান, ২০২৬ অর্থবছরে ছয়টি গবেষণা প্রকল্প ও আটটি খাতভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। এআই, আইওটি, অটোমেশন ও ডেটা অ্যানালিটিকসে প্রাথমিক বিনিয়োগ বেশি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতিও রয়েছে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সঙ্গে শিল্পের প্রয়োজনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। ক্ষুদ্র শিল্পে লিন, ফাইভ এস, কাইজেন ও গ্রিন প্রোডাক্টিভিটির ব্যবহারও সীমিত। জাতীয় উৎপাদনশীলতা মাস্টার প্ল্যান ২০২১-২০৩০ বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও কারিগরি সহায়তা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

উৎপাদনশীলতা শুধু শিল্পের বিষয় নয়; দেশের প্রতিটি নাগরিক, প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। তাই উৎপাদনশীলতার কার্যক্রম জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত করতে হবে।

অপ্রয়োজনীয় বিধিবিধানও বাধা : দৌলত আক্তার মালা

ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সভাপতি দৌলত আক্তার মালা বলেন, ব্যবসা ও উদ্যোক্তাদের জন্য অপ্রয়োজনীয় অনেক বিধিবিধান উৎপাদনশীলতার পথে বাধা তৈরি করছে। আইন ও বিধিবিধানের কাঠামোর মধ্যে থাকা অপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলো চিহ্নিত করে বাদ দিতে হবে। তিনি বলেন, অনেক সময় সমস্যা চিহ্নিত হলেও তা দূর করার উদ্যোগ যথেষ্ট হয় না। সরকারি সংস্থা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থার ঘাটতিও রয়েছে। উৎপাদনশীলতা নিয়ে আরও গবেষণা ও তথ্য প্রকাশ দরকার। শিক্ষা কারিকুলামেও উৎপাদনশীলতার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে হবে। তিনি বলেন, দক্ষ তরুণদের একটি অংশ বিদেশে চলে যাচ্ছে। কতটি ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান বাজারে ঢুকছে, কতটি বের হয়ে যাচ্ছে এবং নারী উদ্যোক্তাদের কতজন ব্যবসা থেকে সরে যাচ্ছেন-এসব তথ্যও প্রয়োজন।

সরকারি তথ্যপ্রবাহ সহজ না হলে গণমাধ্যমেও উৎপাদনশীলতা নিয়ে কার্যকর গবেষণা করা কঠিন।

প্রযুক্তি সম্পর্কে উদ্যোক্তাদের ধারণা বাড়াতে হবে : খালিদ মাহমুদ খান

এসএমই ফাউন্ডেশনের পরিচালক এবং কে ক্রাফটের ম্যানেজিং পার্টনার খালিদ মাহমুদ খান বলেন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ও সক্ষমতা উন্নয়ন সম্পর্কে সচেতনতা এখনো কম। তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী তথ্য, প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিতে হবে। তিনি বলেন, কোন খাতের সম্ভাবনা বেশি, কোন খাত দ্রুত বড় হতে পারে এবং কোন প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কী ধরনের সমস্যা রয়েছে-তা নির্ধারণে কার্যকর ডায়াগনস্টিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমেও এ কাজ করা সম্ভব। বিশ্ববাজারের পরিবর্তন, নতুন প্রযুক্তি ও জ্ঞান সম্পর্কে উদ্যোক্তাদের তথ্য দিতে হবে। প্রযুক্তি ও জ্ঞান কাজে লাগাতে পারলে রপ্তানি সক্ষমতা এবং স্থানীয় বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা দুটোই বাড়তে পারে।

সস্তা শ্রম দিয়ে আর প্রতিযোগিতা সম্ভব নয় : রাশিদুল করিম মুন্না

বাংলাদেশ জুট ডাইভার্সিফাইড প্রোডাক্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. রাশিদুল করিম মুন্না বলেন, সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘদিন শিল্পে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব হবে না। একই কাজ চীন কম শ্রমিক দিয়ে করতে পারে। তাই প্রযুক্তি, দক্ষতা, নকশা, পণ্যের সঠিক নির্বাচন ও যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তিনি স্থানীয় পর্যায়ে মেশিন মেরামত ও প্রযুক্তিগত সেবা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। ২০৩০ সালের মধ্যে জেলাভিত্তিক শিল্প কৌশল তৈরি করা দরকার। পাট ও পাটজাত বহুমুখী পণ্যে নকশা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।

কাইজেন ও ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে : ফারজানা খান

এসএমই ফাউন্ডেশনের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারজানা খান বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এসএমই খাতের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো জরুরি। এসএমই খাত দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ জিডিপিতে অবদান রাখে এবং শিল্প খাতের প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু প্রযুক্তি দিয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব নয়। ব্যবস্থাপনা, পরিচালন পদ্ধতি, সরবরাহব্যবস্থা ও মান নিয়ন্ত্রণ উন্নত করতে হবে। কাইজেন পদ্ধতি অনুসরণ, ডিজিটালাইজেশন এবং আন্তর্জাতিকমানের সঙ্গে সামঞ্জস্য বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন ও ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য বিধিবিধান সহজ করতে হবে।

এসএমই ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমের তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, প্রায় ৫০০ উদ্যোক্তাকে কাইজেন বিষয়ে সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩৯ জন পূর্ণাঙ্গ কাইজেন সনদ পেয়েছেন। এছাড়া ৬০টি এসএমইকে ফুড সেফটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফএসএমএস) সনদ ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে।

বিদেশে পণ্য পরীক্ষা বন্ধে দেশেই সক্ষমতা দরকার : আশরাফুল ইসলাম

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের হেড অব কমপ্লায়েন্স মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, কিছু পণ্যের পরীক্ষা এখনো বিদেশে, বিশেষ করে ইউরোপে করতে হয়। দেশে প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগার সক্ষমতা তৈরি করা গেলে সময় ও খরচ দুটোই কমবে। একই সঙ্গে রপ্তানি বাড়ানোর পথও সহজ হবে। তিনি বলেন, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং, উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা, কমপ্লায়েন্স এবং সময়মতো পণ্য পাঠানো-সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। রপ্তানি বাজারের নিয়ম ও কমপ্লায়েন্স ঠিকভাবে অনুসরণ করা গেলে পণ্য ফেরত বা রিকলের ঝুঁকি কমে। উৎপাদন থেকে পণ্য সরবরাহ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সময় ব্যবস্থাপনা উন্নত হলে প্রতিষ্ঠানের লাভজনকতাও বাড়বে।

পর্যটনে উৎপাদনশীলতার বড় সুযোগ : আবু সুফিয়ান

ট্রাভেল ম্যাগাজিন ভ্রমণের সম্পাদক ও ট্যুরিজম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের পরিচালক আবু সুফিয়ান বলেন, পর্যটনকে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির বড় একটি খাত হিসাবে দেখতে হবে। পর্যটন বোর্ডের তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে এ খাতে ৭২ লাখ ৬০ হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ১৪ থেকে ৩৫ বছর বয়সি তরুণের সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ। তাদের ৩ থেকে ৬ মাসের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পর্যটন ও সংশ্লিষ্ট খাতে দেশি-বিদেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। অ্যাভিয়েশন খাতেও ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় ৩৩ লাখ কর্মীর প্রয়োজন হতে পারে। তার মতে, পর্যটন একক কোনো খাত নয়। এর সঙ্গে বিমান চলাচল, হোটেল, খাবার, কৃষি, জ্বালানি ও বিভিন্ন সেবা খাত সরাসরি যুক্ত।

তাই পর্যটন খাতকে দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসাবে দেখতে হবে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি প্রযুক্তি দক্ষতা ও জ্বালানিতে বড় বিনিয়োগ জরুরি

প্রযুক্তি দক্ষতা ও জ্বালানিতে বড় বিনিয়োগ জরুরি

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নই সময়ের দাবি

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নই সময়ের দাবি

বিশ্ব কিডনি দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে গোলটেবিল বৈঠক কিডনি সুরক্ষায় সচেতনতা জরুরি

কিডনি সুরক্ষায় সচেতনতা জরুরি

ঐক্যবদ্ধ ক্যানসার চিকিৎসা-অগ্রগতির পথ

ঐক্যবদ্ধ ক্যানসার চিকিৎসা-অগ্রগতির পথ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম