Logo
Logo
×

দ্বিতীয় সংস্করণ

জুলাই সনদের প্রতিটি অক্ষর বাস্তবায়ন করব: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আমরা কোনো আরোপিত আদেশ-যেগুলো জবরদস্তিমূলকভাবে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা সেটার মধ্যে নেই। তবে আমরা জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অক্ষর এবং প্রতিটি শব্দ বাস্তবায়ন করব। বুধবার বিকালে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫, নতুন সংসদের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। নাগরিক প্ল্যাটফর্ম-রিফর্ম ওয়াচ আলোচনা সভার আয়োজন করে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই সনদের অনেক দফায় অনেক দল ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে। আমরাও দিয়েছি। সেখানে বলা আছে-যদি নির্বাচনি মেনুফেস্টোতে উল্লেখপূর্বক জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত হয়-সেসব দল সেটা বাস্তবায়ন করতে পারবে। আমরা চারটি বিষয়ে সম্মত হয়েছি। অনেক দল দুটি বিষয়ে সম্মত হয়েছে। সেটা হচ্ছে-অর্থবিল ও আস্থা ভোট। এই দুটি বাদে সব বিষয়ে এমপিরা স্বাধীন। কিন্তু আমরা বলেছি আরও দুটি বিষয়ে এমপিরা পরাধীন। একটা হচ্ছে সংবিধান সংশোধনী ও আরেক দেশে যদি কখনো যুদ্ধ পরিস্থিতি হয়, সেই সময় যে আইন আসবে সেটা দলের পক্ষে থাকতে হবে। এ দুটি বিষয়ে আমরা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছি। এখন আমরা ম্যান্ডেট পেয়েছি। সুতরাং আমরা সেভাবে এগিয়ে যাব।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ-সদস্য অ্যাডভোকেট মো. ফজলুর রহমান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ-সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, টাঙ্গাইল-৮ আসনের সংসদ-সদস্য অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান, পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ-সদস্য মুহম্মদ নওশাদ জমির ও নোয়াখালী-১ আসনের সংসদ-সদস্য এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন।

এছাড়া নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, নিজেরা করির সমন্বয়কারী খুশী কবির অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই অধ্যাদেশে ১৩৩টি বিষয় রয়েছে। এর মধ্যে বেশকিছু আছে-যেগুলো আলোচনার দাবি রাখে। কিন্তু প্রতিদিন গড়ে আমাদের চারটি করে অর্ডিন্যান্স পাশ করতে হবে। কারণ জাতীয় সংসদ সেশন বসা থেকে ৩০ দিনের মধ্যে এগুলো পাশ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এখানে একটু মুশকিল হয়ে গেছে ৩০ কার্যদিবস নয়-এটা হচ্ছে ৩০ দিন। তার মানে মাঝখানে বন্ধ থাকলেও সেটা গণ্য করতে হবে। শুক্রবার ও শনিবার, পবিত্র শবেকদর, ঈদের ছুটি ও স্বাধীনতা দিবসের ছুটি এর মধ্যে পড়বে। সে হিসাবে এভাবে ১৫ দিন চলে যায়। এই সময়ে দিনে আটটি অর্ডিন্যান্স পাশ ও উত্থাপন করা এবং বিল আকারে প্রত্যেকটা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কতটা সম্ভব জানি না। এই সময়ে আমরা যেগুলো শেষ করতে পারব না-সেগুলো হয়তো অটোম্যাটিক ল্যাপস হয়ে যাবে। তবে ৩০ দিনের সীমাবদ্ধতার ভেতরে যেটা সম্ভব, সেটা আমরা করব। তার মধ্যে অবশ্যই মানবাধিকার কমিশনের এই অর্ডিন্যান্সটা থাকবে।

তিনি বলেন, ১৩৩টির মধ্যে কিছু কিছু আছে যেগুলো একদম পত্র পাঠ অনুমোদন করা যাবে। সেগুলো খুব সামান্য বিষয়। কিন্তু বেশ কিছু অর্ডিন্যান্স আছে-যেমন গুম কমিশন ও মানবাধিকারসংক্রান্ত। তাই ৩০ দিনের ভেতরে আমরা কতগুলো শেষ করতে পারব তা ঠিক বলা কঠিন। কিন্তু আমি এটা বলতে পারি-অধিকাংশই আমরা ধারণ করব। গুম নিয়ে তিনি আরও বলেন, গুম কমিশনের যে আইনটা হয়েছে-এর মধ্যে দু-একটা বিষয়ে একটু ভুলভ্রান্তি রয়ে গেছে। এগুলো ভালো করে দেখতে হবে।

দেশে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক মানুষ রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কারাগারে বন্দি রয়েছেন উল্লেখ করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, এটি মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম ব্যর্থতা। আইনের শাসন রক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকারের আরও দৃঢ় প্রতিশ্রুতি প্রত্যাশিত ছিল। সংলাপে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের উপস্থিতিতে তিনি এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের আশা প্রকাশ করেন। বেআইনিভাবে কারা হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের মানবাধিকার পুনরুদ্ধার এবং দেশে আইনের শাসনের কার্যকারিতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে সালাহউদ্দিন আহমদের জন্য ‘লিটমাস টেস্ট’ হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।রেহমান সোবহান বলেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, পূর্ববর্তী সরকারগুলো বিরোধীদের অধিকার লঙ্ঘন করেছে। আবার যখন সেই বিরোধীরা ক্ষমতায় আসে, তখন তারাও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে প্রতিপক্ষের মানবাধিকার লঙ্ঘনে সময় ব্যয় করে।

সংসদ-সদস্যদের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ কী? এ প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘যারা নিজেদের মানবাধিকারের প্রবক্তা হিসাবে তুলে ধরছেন, তারা কতটা নিশ্চিত করবেন যে, দেশে আইনের শাসন বজায় থাকবে? আমরা কি সত্যিই একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ পাব, নাকি সেটি মানবাধিকার রক্ষার বদলে লঙ্ঘনের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হবে?’ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ পাশ হবে-এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, কমিশন কতটা কার্যকরভাবে কাজ করবে তা অনেকটাই নির্ভর করবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এটিকে উপেক্ষা করেন কি না তার ওপর।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বিদ্যমান মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশটি আপাতত ‘মন্দের ভালো’ হিসাবে হলেও পাশ হওয়া উচিত। কারণ এই মুহূর্তে এর সব ত্রুটি সংশোধনের চেষ্টা করলে আইনটি আর পাশ নাও হতে পারে। তবে ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধনের সুযোগ রাখা যাবে।

তিনি বলেন, যখন মানবাধিকার কমিশনের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি ছিল, তখনো আমরা একটি কার্যকর কমিশন পাইনি। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই আজ নতুন করে বিষয়টি আমাদের সামনে এসেছে। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মানবাধিকার কমিশন প্রশ্নটি নতুন করে আলোচনায় আনে। তখন প্রতীকীভাবে একটি কমিশন থাকলেও তা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং সেপ্টেম্বরের শেষভাগ পর্যন্ত দেশে কার্যকর কোনো মানবাধিকার কমিশন ছিল না।

আলোচনায় অংশ নিয়ে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ-সদস্য অ্যাডভোকেট মো. ফজলুর রহমান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গাছের ডালে যদি কাউয়া স্লোগান হয়-তাহলে কোনোদিন মানবাধিকার আসবে না। মানবাধিকারের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঠিক করেন।

মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান বলেন, পাকিস্তানে আইন-আদালত কিচ্ছু ছিল না। পাকিস্তান আমাদের অন্যায়ভাবে শোষণ-শাসন করেছে। তখন স্লোগান দিয়েছিলাম-‘তুমি কে আমি কে বাঙালি।’ ১১ দফা করলাম ছাত্রসমাজ। এরপর এলো ’৭০-এর নির্বাচন। বাঙালিরা একসঙ্গে ভোট দিলাম। একটা দলের একজন নেতা বানাইলাম। সিট দিলাম ৩০০ সিটের মধ্যে ১৬৭টি। মেজরিটি হইল। ক্ষমতা পাইলাম না। যুদ্ধ করলাম, দেশ স্বাধীন করলাম। রক্তের সাগর সৃষ্টি হলো। মুক্তি পাইলাম না। এখন আবার যুদ্ধের ৫৪-৫৫ বছর পর চিন্তা করতে হচ্ছে মানবাধিকার কমিশনের অধ্যাদেশটা কীরকম করা উচিত। এই দেশটা কেন তবে সৃষ্টি করা হয়েছে?

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম