ফ্রান্সের বিক্ষোভে রহস্যময় স্লোগানে তোলপাড়
‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ফ্রান্সে সহিংস বিক্ষোভ চলছে। একদিকে শিক্ষার্থীরা উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার দাবি জানাচ্ছেন, অন্যদিকে বিভিন্ন গোষ্ঠী জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে। এ পরিস্থিতিতে একটি অদ্ভুত স্লোগান আন্দোলনের মূলমন্ত্র হয়ে উঠেছে-‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’। স্লোগানটি ফ্রান্সের সীমানা পেরিয়ে প্রতিবেশী ইতালি, বেলজিয়ামসহ বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভকারীদের কাছে পৌঁছে গেছে।
স্লোগানের এ কথাগুলোর কোনো আক্ষরিক অর্থ নেই। বুধবার আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, বিক্ষোভের মূলে থাকা নানা ক্ষোভ ও অভিযোগকে শিক্ষার্থীরা এ আপাত অর্থহীন শব্দগুচ্ছের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। এর উদ্দেশ্য হলো-পুলিশের পক্ষ থেকে করা জাতিগত কুসংস্কার বা স্টিরিওটাইপকে ব্যঙ্গ করা।
গত সপ্তাহে ফ্রান্সজুড়ে কয়েক লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। গত মাসে শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলন শুরুর পর এটিই ছিল সবচেয়ে বড় গণসমাবেশ। শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক সংকট, কাঠামোগত বৈষম্য ও সুযোগের অভাবের মতো নানা ক্ষোভ থেকে এ আন্দোলনের সূত্রপাত হয়।
পুলিশের আচরণও এখন কঠোর পর্যালোচনার মুখে। বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে ফ্রান্সের পুলিশ পরিদর্শক সংস্থা আইজিপিএন পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা সহিংসতার অভিযোগগুলোর বিষয়ে বেশ কয়েকটি তদন্ত শুরু করেছে।
‘বিসমিল্লাহ’ একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ ‘আল্লাহর নামে’। মুসলমানরা কোনো কাজ শুরুর আগে এটি বলে থাকেন। ফরাসি অপভাষায় এর মূল অর্থ কিছুটা বদলে গিয়ে এখন এটি অনেকটা ‘চলো শুরু করা যাক’ বা ‘দেখা যাক কী হয়’-এমন অর্থে ব্যবহৃত হয়। ‘সে লে তেনেব্র’-এর আক্ষরিক অনুবাদ হলো-‘এটি অন্ধকার’। এটি এমন এক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়, যা অত্যন্ত হতাশাজনক ও অন্ধকারাচ্ছন্ন। সুতরাং, পুরো স্লোগানটির অনুবাদ দাঁড়ায়-‘আল্লাহর নামে, এ তো অন্ধকার!’ যা নিজে থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট বার্তা বহন করে না।
স্লোগানটি কোথা থেকে এলো?
শিক্ষার্থীদের মতে, এ উক্তিটি পুলিশ বাহিনীর প্রতি এক ধরনের উপহাস। আন্দোলনকারীরা নিজেদের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতেন, সেখানে পুলিশ অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালিয়েছিল। অক্টোবরের শুরুর দিকে স্ন্যাপচ্যাটের একটি কথোপকথনের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে এ উক্তিটি ছিল। সেখানে ‘মামাদৌ’ নামের এক ব্যবহারকারী একটি গ্রুপে যুক্ত হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে লিখেন-‘হাই, আল্লাহ’র নামে বলছি, চারদিকে অন্ধকার। অবরোধটা কবে হচ্ছে, ভাই?’ বার্তাটিতে আলজেরিয়ার পতাকার ইমোজিও ছিল।
শিক্ষার্থীদের দাবি, বার্তাটি পাঠিয়েছিলেন ছদ্মবেশী পুলিশ কর্মকর্তারা, যারা আরবি ভাষা ও অপশব্দের এক অদ্ভুত ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ মিশ্রণ ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের কথোপকথনের মধ্যে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছিলেন। তবে এ দাবির সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি এবং ফরাসি কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো বিবৃতিও দেয়নি।
প্যারিস ৮ ইউনিভার্সিটি ভিনসেন্স-সেন্ট-ডেনিসের আরব ও ভূমধ্যসাগরীয় সমাজবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ইউসেফ এল চাজলি বলেন, এ উক্তিটি ‘পুলিশ সম্পর্কে এমন এক ধারণা তৈরি করে, যেখানে তাদের বাস্তববিবর্জিত ও গৎবাঁধা ধ্যান-ধারণায় আচ্ছন্ন হিসাবে দেখানো হয়েছে।’ আল জাজিরাকে এল চাজলি বলেন, ‘এ ধরনের গৎবাঁধা ধারণাগুলো মূলত আরব ও আফ্রিকান বংশোদ্ভূত তরুণদের লক্ষ্য করেই বেশি ব্যবহৃত হয়। এটি আরও একবার প্রমাণ করে, বর্তমান আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো কতটা বাস্তববিবর্জিত অবস্থায় রয়েছে।’
প্ল্যাকার্ড, ব্যানার-সবখানেই বিক্ষোভকারীরা স্লোগানটি ব্যবহার করছেন। স্লোগানটি ইতালি ও বেলজিয়াম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে; সেখানেও সপ্তাহান্তে জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় এবং নিুমানের শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একই ধরনের প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
জনপরিসরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ইসলামভীতি বা ‘ইসলামোফোবিয়া’র বিষয়টিও। ফ্রান্সে ইসলামবিদ্বেষী কর্মকাণ্ড উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেলেও ফরাসি কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে অনাগ্রহ দেখিয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে এ ধরনের ঘটনা ৭২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলো দ্রুতই বর্ণবাদী ভাষা ব্যবহার করে সহিংসতার জন্য মুসলিম তরুণদের দায়ী করতে শুরু করে। এর সঙ্গে যোগ দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও; তিনি দাবি করেন, এর মূল কারণ হলো ‘ইসলাম সবকিছু দখল করে নিতে চায়’।
ট্রাম্পসহ বিদেশি নেতাদের অভিযুক্ত করলেন ম্যাক্রোঁ
ফ্রান্সে চলমান অস্থিরতা নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে ‘বোকামিপূর্ণ মন্তব্য’ করার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প ও অন্যান্য বিদেশি নেতাদের অভিযুক্ত করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। এমন সময়ে এ অভিযোগ এলো, যখন দেশটি এই সপ্তাহান্তে আরও বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বুধবার দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, কাতার সফরে ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্দিষ্ট কারও নাম উল্লেখ না করলেও জানান, শনিবারের দাঙ্গার পর ‘তথ্যের কারসাজি’র কারণে এমন সব মন্তব্য করা হয়েছে, যা ‘অগ্রহণযোগ্য এবং বোকামিপূর্ণ-আর এসব মন্তব্য করেছেন অনেকে, যার মধ্যে বিদেশি নেতারাও রয়েছেন।’ তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা বলছেন কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে ম্যাক্রোঁ বলেন, ‘অন্যদের পাশাপাশি তিনিও রয়েছেন।’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্রান্সের সহিংসতার জন্য ‘অভিবাসী, জিহাদি ও কমিউনিস্টদের’ দায়ী করেছেন।
