শিবির-ছাত্রদল উত্তেজনা
শাহবাগে ডাকসু নেতা ও সাংবাদিকসহ আহত ১২
ছাত্রদলের জরুরি সভা আজ
Advertisement
ঢাবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
শাহবাগ থানা চত্বরে বৃহস্পতিবার হামলার শিকার ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মোসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন ঢাবি ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফ খান -সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগ কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) দুই নেতা হামলার শিকার হয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাতে শাহবাগ থানার সামনে এ ঘটনার পর ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এ সময় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ১০ জন সাংবাদিকও হামলার শিকার হয়েছেন। ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা এ হামলা চালিয়েছেন বলে ছাত্রশিবির অভিযোগ করেছে। এদিকে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে আজ শুক্রবার জরুরি সাংগঠনিক সভা ডেকেছে ছাত্রদল।
জানা গেছে, ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির প্যানেলের সদস্য প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের আইডি থেকে এআই দিয়ে তৈরি একটি ছবি পোস্টের অভিযোগের ঘটনায় শাহবাগ থানায় দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে থানার সামনে হামলা ও মারধরের শিকার হন ডাকসু নেতা যুবাইর বিন নেছারী (এ বি জুবায়ের) ও মোসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ। ঘটনার পর এ বি জুবায়ের ও মোসাদ্দিককে উদ্ধার করে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কক্ষে নেওয়া হয়। সে সময় থানার সামনে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীসহ বিক্ষুব্ধ একদল লোক অবস্থান নেন। এক ঘণ্টার বেশি সময় এই অবস্থা চলার পর জুবায়ের ও মুসাদ্দিককে শাহবাগ থানা জামে মসজিদের ফটক দিয়ে বের করে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। এর আগে শাহবাগ থানায় শিবির ছাত্রদলের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ছাত্রদলের হামলায় অন্তত ১০ জন সাংবাদিক আহত হন। আহতরা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (ডুজা)-এর সদস্য।
ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেন, ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা বহিরাগতদের নিয়ে এ বি জুবায়ের ও মুসাদ্দিকের ওপর হামলা করেন।
এস এম ফরহাদের এ অভিযোগের বিষয়ে ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আন্তর্জাতিক সম্পাদক মেহেদী হাসান বলেন, ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে এ বি জুবায়েরসহ ছাত্রশক্তি ও শিবিরের নেতা-কর্মীরা থানায় এলে সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের মারধরের চেষ্টা করে। কিন্তু ঢাবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপনসহ নেতা-কর্মীরা ঢাল হয়ে দাঁড়ান।
তবে হামলার কারণ ব্যাখ্যা করে এস এম ফরহাদ বলেন, ‘ঈশান চৌধুরী নামে ছাত্রলীগের একটি আইডি থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ একটি পোস্ট দেওয়া হয়। এর পরে অরণ্য আবির নামে একটি আইডি থেকে পোস্টটি ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্যানেল থেকে ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আবদুল্লাহ আল মাহমুদ দিয়েছে বলে প্রচার করা হয়। বিষয়টি মাহমুদ নিজের আইডি থেকে ক্লিয়ার করে।’ তবে এতে ক্ষান্ত হননি ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। তারা তাকে ফেসবুকে হুমকি দিলে তিনি সন্ধ্যা ৭টার দিকে শাহবাগ থানায় নিরাপত্তা চেয়ে জিডি করতে যান। তার সঙ্গে অমর একুশে হল ছাত্র সংসদের জিএস উবায়দুর রহমান হাসিবসহ আরও দুজন ছিলেন। খবর পেয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা থানা ঘেরাও করেন। এ সময় সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে সাংবাদিকদের ওপর হামলা করে ছাত্রদল।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা জানান, সংবাদ সংগ্রহের সময় জাগোনিউজের ঢাবি প্রতিনিধি ফেরদৌস ও রাইজিং বিডির সৌরভ ইসলাম ভিডিও ধারণ করতে গেলে ছাত্রদলের কয়েকজন বাধা দেন। এর প্রতিবাদ জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি মানজুর হোসেন মাহি। এ সময় মাহিকে ছাত্রদলের সাবেক সহ-স্কুল বিষয়ক সম্পাদক ওবায়দুর রহমান সামিথ ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেন। তখন মাহি নিজের পরিচয় দিলে তিনি গালি দেন। এ সময় ফেরদৌসসহ আরও কয়েকজন মাহিকে বাঁচাতে গেলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের থানার বারান্দা থেকে ধাক্কা দিতে দিতে থানা চত্বরে নিয়ে আসেন। এ সময় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গাজী মো. সাদ্দাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি মাসুম বিল্লাহ, সাংগঠনিক সম্পাদক নূর আলম ভূঁইয়া ইমনের নেতৃত্বে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ‘শিবির-সাংবাদিক একসঙ্গে চলে না’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শাহবাগ থানায় শিবির ও ছাত্রদলের মধ্যকার উত্তেজনাকর পরিস্থিতির ভিডিও ধারণে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রথমে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা ‘শিবির-সাংবাদিক একসঙ্গে চলে না’ স্লোগান দিতে থাকেন এবং সংঘবদ্ধভাবে সাংবাদিকদের মারধর করেন। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির বলেন, আমি চট্টগ্রাম থেকে এসেছি। বিষয়টি আমি শুনেছি। দেখছি আমি। সাংবাদিকদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে বৃহস্পতিবার রাতেই কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ঢাবি সাংবাদিক সমিতি। সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিক সমিতির নেতারা তিন দফা দাবি জানান। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-হামলায় জড়িতদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার করতে হবে। জড়িত যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করতে হবে। সারা দেশে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
ছাত্রশিবিরের নিন্দা ও প্রতিবাদ : ডাকসুর একাধিক নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিকদের ওপর ন্যক্কারজনক হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। বৃহস্পতিবার রাতে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ এক বিবৃতিতে বলেন, পুলিশের উপস্থিতিতে থানার ভেতর এ ধরনের হামলা প্রমাণ করে দেশের জনগণ কতটা অনিরাপদ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা নতজানু ও ভঙ্গুর। তারা আরও বলেন, অবিলম্বে শাহবাগ থানার সিসিটিভি ফুটেজ দেখে চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে দাবি আদায়ে বাধ্য করবে।
জরুরি সভা ডেকেছে ছাত্রদল : বিভিন্ন ক্যাম্পাসে উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে আজ শুক্রবার জরুরি সাংগঠনিক সভা ডেকেছে ছাত্রদল। বৃহস্পতিবার ছাত্রদলের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, সংগঠনের কেন্দ্রীয় সংসদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেতাদের এ সভা দুপুর আড়াইটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ক্যাফেটেরিয়ায় অনুষ্ঠিত হবে। সভায় প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন সংগঠনের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব এবং বিশেষ অতিথি হিসাবে থাকবেন সাধারণ সম্পাদক নাহিদ উদ্দিন নাহিদ।
জবিতে জকসু ও ছাত্রদলের বিক্ষোভ : জবি প্রতিনিধি জানান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পালটাপালটি বিক্ষোভ মিছিল করেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। ডাকসু নেতৃবৃন্দের ওপর হামলার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১১টায় বিক্ষোভ মিছিল করে জকসু। এর আগে জাইমা রহমানকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের প্রতিবাদে রাত ১০টার দিকে মিছিল করে ছাত্রদল। জকসুর মিছিলটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে শুরু হয়ে বাহাদুর শাহ পার্ক প্রদক্ষিণ করে ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকের সামনে এসে শেষ হয়। অপর দিকে ছাত্রদল ক্যাম্পাসের সামনে সড়কে বিক্ষোভ মিছিল করে।
