বিএনপি কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা
২৪ ঘণ্টা পরও উদ্ধার হয়নি বিচ্ছিন্ন দুই হাত
বোন ও স্ত্রীর কান্না থামছে না
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর সবুজবাগে বিএনপি কর্মী ইব্রাহীম পলাশকে (৩২) নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার ২৪ ঘণ্টা পার হলেও তার বিচ্ছিন্ন দুই হাত উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। এ ঘটনায় সবুজবাগ থানায় তিনজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেছেন নিহতের বোন জোছনা বেগম। তবে এখন পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ দেখে দ্রুত আসামিদের গ্রেফতারের অনুরোধ জানিয়েছেন নিহতের স্বজনরা।
জানতে চাইলে ডিএমপির সবুজবাগ থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, নিহত পলাশের দুটি হাত উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। এখনো কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। অভিযান চলছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এত বড় এলাকা। কোথায় হাত দুটি ফেলেছে তা বের করতে একটু সময় লাগছে।
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার রাত আটটার দিকে সবুজবাগের বাগপাড়া পানির পাম্পসংলগ্ন সোহাগের চায়ের দোকানের সামনে পলাশকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে তার দুই হাত কেটে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। গুরুতর আহত অবস্থায় পলাশকে প্রথমে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে রাত ১০টার দিকে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় নিহত পলাশের বোন মোছা. জোছনা আক্তার বাদী হয়ে বুধবার সবুজবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় মোস্তফা হোসেন রয়েল, সবুজ ও শফিক-এই তিনজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও চার-পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পলাশের সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পলাশের মাথা, ঘাড়, বুক, কোমরসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এছাড়া তার ডান ও বাম হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন ছিল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং ধারালো অস্ত্রের আঘাতেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
নিহত পলাশের বড় বোন জোছনা আক্তার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে আমার বাসা থেকে আমার মেয়ে জান্নাতের জন্য খাবার নিয়ে বের হয় পলাশ। আমার মেয়ে জামিয়াতুল সালেহা মহিলা মাদ্রাসায় পড়ে। সেখানে খাবার দিয়ে সে জানায়, কালীবাড়ি এলাকায় তার কিছু কাজ আছে, সেখানে যাবে। এরপর কিছুক্ষণ পর খবর পাই, কে বা কারা আমার ভাইকে কুপিয়ে ফেলে গেছে। ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার পর আমার ভাই মারা যায়।
কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, কী নৃশংসভাবে আমার ভাইকে হত্যা করেছে, আপনারা দেখেছেন। শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, তার দুটি হাতও কেটে নিয়ে গেছে। সিসিটিভি ফুটেজে হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য থাকার পরও কোনো আসামিকে গ্রেফতার করা হয়নি।
নিহতের স্ত্রী মরিয়মের কান্না থামছেই না। পাঁচ মাস আগে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন তারা। সেই স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তিনি বলেন, তিন দিনের পরিচয়ের পর আমাদের বিয়ে হয়। সংসার জীবন ভালোই চলছিল। ভালোবেসে বিয়ে করলাম, কিন্তু জীবনসঙ্গীকে নিয়ে সংসার করা হলো না। আমি এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। এই মাসেই আমার ফল প্রকাশ হওয়ার কথা। আমার তো আর কিছুই রইল না। নিহতের বন্ধু মো. হিরা জানান, পলাশ আগে একটি রেন্ট-এ-কার প্রতিষ্ঠানে চালক হিসাবে কাজ করতেন, বর্তমানে বেকার ছিলেন। তিনি সবুজবাগ ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির কর্মী ছিলেন।
এক সপ্তাহ আগে এলাকার বিএনপি কর্মী মোস্তফা হোসেন রয়েলের সঙ্গে তার বিরোধ সৃষ্টি হয়। সেই বিরোধের জের ধরেই রয়েল ও তার সহযোগীরা পলাশকে কুপিয়ে হত্যা করে।
এদিকে একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গত ১৫ জুলাই একটি রিকশা গ্যারেজে কয়েকজন যুবক সাদা শার্ট পরা এক ব্যক্তির ওপর হামলা চালাচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন জানান, রিকশা গ্যারেজের ম্যানেজারের কাছে চাঁদা দাবিকে কেন্দ্র করে রয়েল, সবুজ ও শফিক ওই হামলা চালিয়েছিল।
পলাশকে হত্যার দিনের আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজেও চাঞ্চল্যকর দৃশ্য ধরা পড়েছে। ফুটেজ অনুযায়ী, ২১ জুলাই রাত ৮টা ১০ মিনিটে স্থানীয় কয়েকজন ভিড় করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ একজন হাতে দেশীয় ধারালো অস্ত্র ‘সামুরাই’ নিয়ে দৌড়ে এসে একজনকে লক্ষ্য করে প্রকাশ্যে এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করে। স্থানীয়দের দাবি, ওই ব্যক্তি স্থানীয় সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত রয়েল। সে সামুরাই দিয়ে পলাশকে একের পর এক কোপাতে থাকে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, হামলার আগে রয়েলের সঙ্গে চলাফেরা করা কয়েকজন এসে পলাশকে দেখে যায়। তারা গিয়ে ‘ক্লিয়ারেন্স’ দেওয়ার পরই রয়েল প্রকাশ্যে এসে পলাশকে কুপিয়ে হত্যা করে।
