Logo
Logo
×

Advertisement

দ্বিতীয় সংস্করণ

নান্দনিক ধানমন্ডি লেকে আতঙ্ক

সন্ধ্যা নামলেই কিশোর গ্যাং অন্ধকারে মাদকের আসর

১১ বছরে ১৫ লাশ উদ্ধার * ‘শুধু সংস্কার নয়, নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি’

Advertisement

Icon

আসাদুল্লা লায়ন

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে সবুজে ঘেরা নান্দনিক ধানমন্ডি লেক। রাজধানাবাসীর অন্যতম বিনোদনকেন্দ্র এ জলাধার ঘিরে আতঙ্ক বিরাজ করছে। নান্দনিক স্থানটি অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। সন্ধ্যা নামলেই লেকের বিভিন্ন নির্জন স্থানে কিশোররা আড্ডায় মেতে ওঠে। যত্রতত্র মাদকসেবন ও মাদক কেনাবেচার আসর বসে। বিভিন্ন স্পটে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এমনকি লেক থেকে মাঝেমধ্যে লাশ উদ্ধার করা হয়। ২০১৫ সাল থেকে প্রায় প্রতি বছর লেকে লাশ পাওয়া যাচ্ছে। চলতি বছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১১ বছরে ১৩টি লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, লেকে কখনো গোসল করতে নেমে, কখনো সাঁতার কাটতে গিয়ে প্রাণ হারায় মানুষ। আবার নিখোঁজ ব্যক্তির লাশও মেলে। এদিকে ধানমন্ডি লেকের নাব্য ও নান্দনিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে মঙ্গলবার থেকে পুনঃখনন (ড্রেজিং) ও সামগ্রিক উন্নয়নকাজ শুরু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। সংশ্লিষ্টদের অভিমত, শুধু সংস্কার নয়, লেকের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। লেকের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে রাজধানীবাসী কখনোই কাক্সিক্ষত সুফল পাবে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামগ্রিকভাবে লেকটি এখন অনিরাপদ। এর পেছনে অন্যতম দুর্বলতা পর্যাপ্ত আলো ও সিসিটিভি কাভারেজ না থাকা, নিরাপত্তাকর্মীর অভাব ও অবাধ যাতায়াতের সুযোগ। ফেব্রুয়ারিতে লেকে মাদকসেবন এবং কিশোর গ্যাং-এর দৌরাত্ম্য বন্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ। তখন একাধিক কিশোর-তরুণকে আটক করা হয়। অভিযান শেষে তৎকালীন ডিসি রমনা মাসুদ আলম জানান, রাতে উঠতি বয়সিরা লেক এলাকায় আড্ডা দেয়। তাদের একটি অংশ গাজা, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকে আসক্ত। সন্ধ্যার পর বাসা থেকে বের হয়ে কিছু কিশোর মাদকে জড়িয়ে পড়ছে। নির্জন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে মারামারির ঘটনাও ঘটে। ৩০ আগস্ট দুপুরে লেকের ডিঙ্গি রেস্টুরেন্টের সামনে অস্ত্রের মুখে একজনের ৩৮ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় এক ডাকাতদল।

সম্প্রতি লেকে ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ এলাকা নির্জন। যে কোনো দিক দিয়ে লেকে অবাধে প্রবেশ ও বের হওয়া যায়। ১০ নম্বর রোডের পাশে চায়ের টং দোকানের মালিক খলিলুর ইসলাম জানান, এ লেকের পাশে বড় হয়েছি। রাত নামলেই লেক নির্জন হয়ে পড়ে। কোনো লাইট জ্বলে না। ছোটবেলা থেকে শুনছি-মানুষ মেরে এখানে লাশ ফেলে যায়। আবার সাঁতার কাটতে গিয়েও ডুবে মারা যায় অনেকে। লেকে মাঝেমধ্যে লাশ ভেসে উঠে। ২২ সেপ্টেম্বরও লাশ দেখেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ওটা হয়তো কেউ মেরে এখানে ফেলে গেছে। লেকের পাশের এলাকায় পুরো জীবন কাটিয়েছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব পরিচ্ছন্নতাকর্মী আব্দুল হাকিম মাদবর। এখনো তিনি লেকের পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন। তিনি বলেন, এখন নতুন করে চুরি-ছিনতাই বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, মাঝেমধ্যে লেকের পানিতে কিশোর ডুবে মরে। এটি নিয়ে মানুষের মাঝে ভয়ও তৈরি হয়েছে। পানিতে ডুবে মৃত্যু নিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়ায় লেকে গোসল বা সাঁতার কাটা বন্ধের দাবি জানিয়েছে স্থানীয়রা। তারা বলেন, পানিতে কেউ পড়ে গেলে বা সাঁতার কাটতে নেমে কেউ বিপদগ্রস্ত হলে উদ্ধারের কোনো ব্যবস্থা নেই। উদ্ধারের পর্যাপ্ত সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত নিরাপত্তাকর্মী এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থার পরামর্শ তাদের।

লেকে নিয়মিত হাঁটতে আসেন ধানমন্ডি এলাকার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত এক সরকারি কর্মকর্তা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি বলেন, একসময় গভীর রাতেও লেকে নিরাপদে হাঁটা যেত। এখন অনিরাপদ হয়ে যাওয়ায় সাহস করি না। তিনি বলেন, বিস্তীর্ণ লেকটির নিরাপত্তায় রমনা পার্কের আদলে বেষ্টনী ও প্রবেশদ্বার তৈরি করা জরুরি। ধানমন্ডি সোসাইটির পাবলিক রিলেশনস সেক্রেটারি রিয়াজ আহমেদ বলেন, নিরাপত্তা বাড়াতে ইতোমধ্যে মন্ত্রী, ঢাকা-১০ আসনের সংসদ-সদস্য এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে। নিরাপত্তার ঘাটতি, ডুবে মৃত্যুর ঘটনা, সিসিটিভির অভাব, হকার সমস্যা ও চাঁদাবাজির বিষয় গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে। তারা এসব দেখার আশ্বাস দিয়েছেন।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, নজরদারি বাড়াতে পার্কজুড়ে অবিলম্বে সিসিটিভি ক্যামেরার সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিরাপত্তা প্রহরীরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন কি না, তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। প্রহরীর সংখ্যা কম থাকলে তা দ্রুত চিহ্নিত করে পূরণ করা আবশ্যক। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে প্রতিটি স্থানে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। ড. আদিল খান বলেন, উন্মুক্ততাই ধানমন্ডি লেকের প্রধান বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্য। নিরাপত্তার জন্য পার্কের উন্মুক্ততা নষ্ট বা সীমানা অবরুদ্ধ করার প্রয়োজন নেই। বরং সিসিটিভি ও নিরাপত্তা প্রহরী বাড়িয়ে নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা সম্ভব। সন্ধ্যা বা রাতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে লেকে অনায়াসে হাঁটার সুযোগ থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।

রমনা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, নিয়মিত পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি লেক এলাকায় সাদা পোশাকের পুলিশ নিয়োজিত রয়েছে। সম্প্রতি লেকে একটি ডাকাতির ঘটনায় পুরো ডাকাত দলকে অস্ত্র ও লুণ্ঠিত টাকাসহ গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি বলেন, লেকে সংঘটিত অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে সিসিটিভি কাভারেজ না থাকা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে। এছাড়া বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার জন্য ডিএমপির সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানানো হয়েছে। লেকের রক্ষণাবেক্ষণসহ সার্বিক বিষয়ে অন্যতম দায়িত্ব পালন করে থাকে ডিএসসিসি। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ফোনে কল করে ও বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

১১ বছরে ১৫ লাশ উদ্ধার : দুদিন নিখোঁজ থাকার পর জাভেদ আহমেদের (৫১) লাশ ২২ সেপ্টেম্বর ধানমন্ডি লেক থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। শনিবার ধানমন্ডি থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জালাল উদ্দিন বলেন, সিসিটিভি কাভারেজে জাভেদকে আমরা শনাক্ত করতে পারিনি। ঘটনাস্থলে বা তার কাছাকাছি কোনো সিসিটিভি নেই। আর আশপাশেরগুলোয় কিছু দেখা যায় না। প্রাথমিকভাবে জাভেদের হত্যাকাণ্ডের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। পরিবারও কোনো অভিযোগ করেনি। জাভেদ দীর্ঘদিন বেকার ছিলেন। গত বছর ওমর ফারুক (১৮) ও অজ্ঞাত এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। ২০২৩ সালেও একাধিক লাশ উদ্ধার হয়। এর মধ্যে নিখোঁজ গাড়িচালক শাহিন আলম (২৫), নিখোঁজ ফার্মাসিস্ট ইমতিয়াজ (৫৭)। ২০২২ সালে তিনটি লাশ উদ্ধার হয়। এর মধ্যে বাবুল চন্দ পাল (৬৫), আবির হোসেন (১৬) ও মেরিন ইঞ্জিনিয়ার শাহাদাত হোসেন মজুমদারের লাশ রয়েছে। ২০১৯ সালে কলেজছাত্র হৃদয়ঙ্গম ঋদ্ধ (১৭) সাঁতার কাটতে গিয়ে ডুবে যান। ২০১৮ সালে মোশারফ খন্দকার ইমি (১৭) ডুবে মারা যান। ২০১৭ সালে রাতুল (১৩) বন্ধুদের সঙ্গে গোসল করতে গিয়ে নিখোঁজ হলে তিন দিন পর লাশ ভেসে ওঠে। ২০১৬ সালে নিখোঁজ এইচএসসি পরীক্ষার্থী সুদীপ্ত দত্ত অর্জুনের (১৮) লাশ উদ্ধার হয়। ২০১৫ সালে গোসল করতে নেমে মারা যান আবুল বাশার (১৭)। একই বছর শিল্প মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব এবিএম আবদুল লতিফ মারা যান।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

তিন ছিনতাইকারীর মৃত্যুদণ্ড বিচারক বললেন-এ রায় সমাজের প্রতি বার্তা

বিচারক বললেন-এ রায় সমাজের প্রতি বার্তা

নান্দনিক ধানমন্ডি লেকে আতঙ্ক সন্ধ্যা নামলেই কিশোর গ্যাং অন্ধকারে মাদকের আসর

সন্ধ্যা নামলেই কিশোর গ্যাং অন্ধকারে মাদকের আসর

চসিক মেয়রের হস্তক্ষেপে গ্রেফতার এড়াল শীর্ষ সন্ত্রাসী বগা!

চসিক মেয়রের হস্তক্ষেপে গ্রেফতার এড়াল শীর্ষ সন্ত্রাসী বগা!

ধানমন্ডি লেকের প্রাণ ফেরাতে পুনঃখনন শুরু

ধানমন্ডি লেকের প্রাণ ফেরাতে পুনঃখনন শুরু

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম