যেখানে ম্যালকমের শেষ, সেখানে মামদানির শুরু
Advertisement
সৌমায়া গান্নুশি
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
জোহরান মামদানি। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যুক্তরাষ্ট্রে ন্যায়বিচারের জন্য সংগ্রাম সত্যিই কখনো মরে না। এটি হয়তো চাপা পড়ে, মুছে যায় বা কোণঠাসা হয়ে পড়ে; কিন্তু এটি সবসময় ফিরে আসার পথ খুঁজে নেয়। নতুন রূপে, নতুন চেহারায়, নতুন কণ্ঠে। দুজন ব্যক্তি, দুই প্রজন্মের ব্যবধান সত্ত্বেও একজন নাগরিক অধিকার আন্দোলনের এক কিংবদন্তি, অন্যজন নিউইয়র্কের একজন উদীয়মান রাজনীতিবিদ, যারা একই নৈতিক ভূমিতে দাঁড়িয়ে আছেন। ম্যালকম এক্স হত্যাকাণ্ডের ছয় দশক পরও নিউইয়র্ক সিটি মেয়র পদপ্রার্থী জোহরান মামদানি সমতা, ন্যায়বিচার ও মুক্তির প্রতি তার নির্ভীক, আপসহীন বিশ্বাসকে তুলে ধরছেন। বিশেষ করে মামদানির মতো ম্যালকম এক্সও একজন গর্বিত মুসলিম ছিলেন। তার প্রাথমিক বিশ্বদৃষ্টি তৈরি হয়েছিল বর্ণবৈষম্যের কষ্টিপাথর এবং নেশন অব ইসলামের ব্ল্যাক জাতীয়তাবাদের মধ্যে; যে আন্দোলন শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যকে উলটে দিয়েছিল; কিন্তু বিশ্বকে তখনো শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ, অত্যাচারী ও অত্যাচারিত-এ দুই ভাগে ভাগ করে রেখেছিল।
জিম ক্রোয়ের নির্মমতা ছাড়া আর কিছুই না জানা একজন মানুষের কাছে এ বিভাজনকে অপরিবর্তনীয় মনে হয়েছিল। জিম ক্রো হলো ১৯ শতকের শেষ এবং ২০ শতকের প্রথমদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে বলবৎ হওয়া জাতিগত বিভেদ্য আইনব্যবস্থা। মক্কায় হজের সময় ম্যালকম যা দেখেছিলেন, তা তার সেই দ্বৈধতাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। তিনি বলেছিলেন, আমার কাছ থেকে এ কথাগুলো শুনে আপনারা হয়তো অবাক হবেন; কিন্তু হজের সময় আমি যা দেখেছি এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, তা আমাকে আমার আগের ধারণার অনেকটা পুনর্বিন্যাস করতে এবং কিছু আগের সিদ্ধান্তকে বাদ দিতে বাধ্য করেছে। পবিত্র ভূমিতে ম্যালকম এক্স এমন কিছু দেখেছিলেন, যা যুক্তরাষ্ট্র তাকে অসম্ভব বলে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছিল : প্রতিটি বর্ণ ও ভাষার মানুষ নীল চোখের স্বর্ণকেশী মানুষজন কালো আফ্রিকানদের পাশে একতা, মর্যাদা এবং এক ভাগ করা উদ্দেশ্য নিয়ে ধর্মীয় আচারে একতাবদ্ধ। তিনি উল্লেখ করেন, আমি কখনো এমন আন্তরিক আতিথেয়তা এবং সত্যিকারের ভ্রাতৃত্বের এমন অপ্রতিরোধ্য উদ্দীপনা দেখিনি... আমরা সবাই একই আচারে অংশ নিচ্ছিলাম, যা ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের এক স্পিরিট প্রদর্শন করছিল, আমেরিকা আমাকে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছিল, শ্বেতাঙ্গ এবং অ-শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে কখনোই তা থাকতে পারে না।
হজ শুধু তার রাজনীতিকে নতুন আকার দেয়নি; এটি তার হৃদয়কেও বদলে দিয়েছিল। ম্যালকম এক্স শুধু কৃষ্ণাঙ্গদের মুক্তি নয়, বরং সর্বজনীন মানব মর্যাদার এক দৃষ্টি নিয়ে আমেরিকায় ফিরে আসেন এবং বলেন : আমেরিকার ইসলাম বোঝা দরকার, কারণ এটিই একমাত্র ধর্ম, যা তার সমাজ থেকে জাতিগত সমস্যাকে মুছে ফেলে। তিনি বর্ণবাদকে কেবল একটি অভ্যন্তরীণ আমেরিকান পাপ হিসাবে নয়, বরং একটি বৈশ্বিক কাঠামো হিসাবে দেখতে শুরু করেন-একটি ঔপনিবেশিক নেটওয়ার্ক, যা আফ্রো-অ্যামেরিকানদের সংগ্রামকে আলজেরিয়ান, ঘানাইয়ান, ভিয়েতনামি এবং ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করে। তার প্রবন্ধ ‘জায়নিস্ট লজিক’-এ তিনি জায়নবাদকে ‘ঔপনিবেশিকতার একটি নতুন রূপ’ হিসাবে বর্ণনা করেন-এমন একটি প্রকল্প, যা মানবিক ভাষার আবরণে দখলকে আড়াল করে। তিনি এমন একটি বাস্তবতাকে তুলে ধরেন, যা মার্কিন নেতারা স্বীকার করতে চান না : এ নিপীড়ন স্থানীয় নয়, এটি কাঠামোগত ও বৈশ্বিক।
ছয় দশক পরে এক তরুণ রাজনীতিবিদ নিউইয়র্কের একটি মসজিদে দাঁড়িয়ে এমন কথা বলছেন, যা ম্যালকম এক্স চিনতে পারতেন। মামদানি যখন প্রথম রাজনীতিতে প্রবেশ করেন, তখন তাকে তার বিশ্বাসকে শান্ত রাখতে আমেরিকান জনজীবনের জন্য যা হয়তো খুব বেশি মুসলিমের মতো মনে হতে পারে, তা চাপা দিতে তাকে অনুরোধ করা হয়েছিল। এটি এমন একটি শিক্ষা, যা পশ্চিমের বহু মুসলিম আত্মস্থ করেছেন : কম চাইতে শেখ, কম আশা কর, সামান্য কিছু পেলেই কৃতজ্ঞ থাক। কিন্তু ম্যালকম এক্সের মতো মামদানিও অদৃশ্যতাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি তার বিশ্বাসকে কোনো দায় হিসাবে নয়, বরং শক্তির উৎস হিসাবে গ্রহণ করেছেন। সম্প্রতি এক সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি বলেন, প্রত্যেক মুসলমানের স্বপ্ন হলো, অন্য যে কোনো নিউইয়র্কবাসীর মতো একইরকম ব্যবহার পাওয়া; কিন্তু খুব দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের বলা হয়েছে, এর চেয়ে কম চাইতে এবং সামান্য যা কিছু আমরা পাই, তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে। কিন্তু আর নয়।
৩৪ বছর বয়সি ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট মামদানি ফিলিস্তিনি অধিকারের দীর্ঘদিনের সমর্থক হিসাবে তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই বয়কট, বিনিয়োগ প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা (BDS) প্রচারাভিযানকে সমর্থন করে আসছেন-এ অবস্থানটিও তার রাজনীতির কেন্দ্রে রয়েছে। তিনি ইসরাইলি সহিংসতায় যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রকাশ্যে নিন্দা করেছেন এবং ঘোষণা করেছেন, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নিউইয়র্ক সিটিতে পা রাখলে মেয়র হিসাবে তিনি তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা করবেন-এটি একটি প্রতীকী অবস্থান; যা সমর্থকদের উদ্দীপ্ত করেছে এবং বিরোধীদের ক্ষুব্ধ করেছে।
নির্বাচনের আগ দিয়েও করপোরেট ও রিয়েল এস্টেট খাত তাদের স্বার্থে মামদানিকে থামাতে ২২ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থাৎ অস্বাভাবিক পরিমাণে অর্থ ঢেলেছে। এটি শহরের ধনীগোষ্ঠীদের শেষ চেষ্টা; কারণ তারা তার প্রচারণাকে তাদের ক্ষমতার জন্য একটি অস্তিত্বের হুমকি হিসাবে দেখছে। মামদানি যা তুলে ধরছেন, তা কেবল ইসরাইলের ভাবমূর্তি বা ডেমোক্রেটিক প্রতিষ্ঠানের জন্য শুধু চ্যালেঞ্জ নয়, তিনি প্রজন্মগত পরিবর্তনেরও মূর্তপ্রতীক।
১৯৬৫ সালে ম্যালকম এক্সের হত্যাকাণ্ড কেবল একজন মানুষকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ছিল না। এটি ছিল শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য, সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদী আধিপত্যকে তার মূলে চ্যালেঞ্জ জানানো একটি আন্দোলনকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করার প্রচেষ্টা। আজ মামদানি ভিন্ন ধরনের আক্রমণের সম্মুখীন: চরিত্রহননের। একটি নিরলস অপপ্রচারের মাধ্যমে তাকে চরমপন্থি হিসাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে; ফিলিস্তিনের প্রতি তার সংহতিকে দায় হিসাবে এবং বিশ্বাসকে তার বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসাবে পরিণত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আর হুমকির মুখে ক্ষমতা এভাবেই আচরণ করে : যদি তারা কোনো আন্দোলনকে নিজেদের দখলে নিতে না পারে, তবে তারা তাকে পিষে ফেলার চেষ্টা করে। যদি তারা বার্তাটিকে নীরব করতে না পারে, তবে তারা বার্তাবাহকের বিরুদ্ধে কুৎসা রটাবে। যে শক্তিগুলো ম্যালকম এক্সের দৃষ্টিভঙ্গিকে ভয় পেয়েছিল, তারাই এখন এর আধুনিক রূপকে ভয় পাচ্ছে-গর্বিতভাবে মুসলিম, প্রবলভাবে আন্তর্জাতিকতাবাদী, ন্যায়বিচারে প্রতিষ্ঠিত এবং সাম্রাজ্যের মোকাবিলা করতে নির্ভীক। এটি সেই আন্দোলন, যা অসম্পূর্ণ, অবিচ্ছিন্ন এবং যা এগিয়ে চলেছে।
মিডল-ইস্ট আই থেকে ভাষান্তরিত
সৌমায়া গান্নুশি : ব্রিটিশ তিউনিশিয়ান লেখিকা, মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতি বিশেষজ্ঞ
