হালফিল বয়ান
তিনি বেঁচে থাকবেন নতুন প্রজন্মের চেতনায়
ড. মাহফুজ পারভেজ
প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘কোনো কোনো মৃত্যু পাখির পালকের মতো হালকা, আবার কোনো কোনো মৃত্যু থাই পাহাড়ের মতো ভারী।’ মৃত্যুর চলমান ঢলের মধ্যে থাই পাহাড়ের চেয়েও ভারী এক মৃত্যু বৃহস্পতিবার রাতে আচ্ছন্ন করে পুরো বাংলাদেশকে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক যুগ-সন্ধিক্ষণে, ইতিহাসের এক ভয়ংকর মোড়ে দাঁড়িয়ে যে সাহস বুক পেতে দিয়েছিল-সে বুক আজ নিথর। গণতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের লড়াইয়ের ময়দানে যে কণ্ঠ ছিল অবিচল, যে চোখে ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন, সেই কণ্ঠ আজ নীরব, সেই চোখ চিরতরে বন্ধ।
সাহস, প্রতিবাদ ও দ্রোহের আরেক নাম ইনকিলাব মঞ্চের শরিফ ওসমান হাদি আর নেই। তার বয়স হয়েছিল ৩২ বছর। মৃত্যুর খবরটি প্রথমে জানানো হয় ইনকিলাব মঞ্চের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে। যেখানে বলা হয়, ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদের মোকাবিলায় মহান বিপ্লবী ওসমান হাদিকে আল্লাহ শহীদ হিসাবে কবুল করেছেন।’ শরিফ ওসমান হাদি ছিলেন আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী। তার মতো একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার জুলাই যোদ্ধার মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ পুরো জাতি। এমন মর্মন্তুদ খবর শুনে শোকবিহ্বল হয়ে পড়েন দেশবাসী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ তথ্য ছড়িয়ে পড়লে শোকের ছায়া নেমে আসে। বিক্ষোভ ও প্রতিবাদে এ মৃত্যুর প্রতিক্রিয়ায় অগ্নিগর্ভ হয় পুরো দেশ ও ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র-জনতা।
সাত দিন আগে গুলিবিদ্ধ হন তিনি রাজধানী ঢাকার বিজয়নগরে। তারপর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার চলে যাওয়া কোনো সাধারণ মৃত্যু নয়-এ এক রাজনৈতিক ক্ষয়, এক প্রজন্মের স্বপ্নে নেমে আসা গভীর অন্ধকার। সিঙ্গাপুরের হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে থেকেও তিনি ছিলেন বাংলার রাজপথে, মানুষের অধিকারের পাশে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক অদম্য নাম।
জুলাই বিপ্লবের বারুদ হয়ে জ্বলে ওঠা ওসমান হাদি জানতেন-তার পথ ঝুঁকির; তার লড়াইয়ের বিপদ আছে। তবু তিনি পিছু হটেননি। বুক পেতে দিয়েছিলেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন-গণতন্ত্র ভিক্ষা নয়, অধিকার। বরং ন্যায়ের পথে নীরবতা অপরাধ। তার জীবন ছিল এক জীবন্ত প্রতিবাদ আর তার মৃত্যু হয়ে উঠল এক ভারী প্রশ্ন-ছাত্র-জনতা কি সেই সাহস ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক রূপান্তরের লড়াইয়ের প্রতিটি সংকটে ধরে রাখতে পারবে?
শরিফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুতে শুধু একজন মানুষ নয়, স্তব্ধ হলো একটি দীপ্ত কণ্ঠ, একটি নির্ভীক উপস্থিতি। তবু ইতিহাস সাক্ষী-এমন মানুষ কখনো পুরোপুরি মারা যান না। তারা রয়ে যান লড়াইয়ের ভাষায়, প্রতিরোধের শপথে, নতুন প্রজন্মের চেতনায়। তারা থেকে যান জন-আন্দোলনের স্মৃতিতে। তাদের সাহস মশাল হয়ে জ্বলে। স্বপ্ন প্রজ্বলিত থাকে জনমানসে এবং তাদের শূন্যতা তরুণ প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেবে-গণতন্ত্রের পথ কখনো সহজ নয়, কিন্তু সেই পথে হাঁটার মানুষ অমর।
সমকালীন বাংলাদেশের ইতিহাস স্বীকার করবে, হাদির অবদান কেবল কোনো সংগঠনের নেতৃত্বে সীমাবদ্ধ ছিল না-তা ছিল একটি নৈতিক প্রতিবাদ, একটি প্রজন্মের সাহসী উচ্চারণ। শরিফ ওসমান হাদির জীবন ছিল সংগ্রাম, সাহস ও দায়বদ্ধতার এক অনন্য দলিল। তিনি রাজনীতিকে ক্ষমতার সিঁড়ি হিসাবে দেখেননি। দেখেছেন দায়িত্ব হিসাবে, আত্মত্যাগের ক্ষেত্র হিসাবে। যখন ভয় ছিল রাষ্ট্রের নিত্যসঙ্গী, যখন নীরবতা হয়ে উঠেছিল টিকে থাকার কৌশল-ঠিক তখনই তিনি কথা বলেছেন-স্পষ্ট, দ্বিধাহীন, আপসহীন কণ্ঠে।
হাদি বিশ্বাস করতেন, গণতন্ত্র কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়-এটি চর্চা ও আত্মস্থ করার বিষয়, যা নাগরিকের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ বিশ্বাস থেকেই তিনি রাজপথে নেমেছেন, আন্দোলন গড়েছেন, তরুণদের সংগঠিত করেছেন। দমনপীড়ন, নজরদারি, হুমকি-কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। কারণ তার সংগ্রাম ছিল না ব্যক্তিগত, ছিল সামষ্টিক মুক্তির স্বপ্নে প্রোথিত। তিনি জানতেন, ফ্যাসিবাদ কেবল একটি শাসনব্যবস্থা নয়-এটি ভয় তৈরি করে, মানুষকে একা করে দেয়। তার সবচেয়ে বড় অবদান ছিল ভয়ের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সাহসের সংস্কৃতি তৈরি করতে ভূমিকা রাখা। যারা প্রথমবার রাজপথে নামতে ভয় পেত, তিনি তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। যারা কথা বলতে দ্বিধায় ছিল, তিনি তাদের কণ্ঠে আস্থা জুগিয়েছেন।
শরিফ ওসমান হাদির সাহস প্রদর্শনমূলক ছিল না-ছিল নীরব, গভীর, দৃঢ় ও সক্রিয়। তিনি জানতেন এ সাহসের মূল্য দিতে হতে পারে জীবন দিয়েও। তবু তিনি পিছু হটেননি। বুক পেতে দিয়েছিলেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন-ইতিহাস কখনো নিরাপদ মানুষের কাঁধে ভর করে এগোয় না, এগোয় ঝুঁকি নেওয়া মানুষের রক্তে-ঘামে। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও তার আহত শরীর-মন পড়েছিল দেশের দিকে, আন্দোলনের দিকে, মানুষের ভবিষ্যতের দিকে। শারীরিক দুর্বলতা তার রাজনৈতিক দৃঢ়তাকে ভাঙতে পারেনি। এ অদম্য মানসিক শক্তিই তাকে আলাদা করেছে-একজন সাধারণ কর্মী থেকে এক প্রতীকী চরিত্রে।
তার মৃত্যু একটি শূন্যতা-সেই শূন্যতা পূরণের দায় জাগ্রত জনতার। তারুণ্যের দায় তার আদর্শ বহন করার, তার সাহসকে ছড়িয়ে দেওয়ার, তার অসমাপ্ত স্বপ্নকে সম্পূর্ণ করার। তিনি জুলাইয়ের পটভূমিতে শিখিয়ে গেছেন-গণতন্ত্র রক্ষা করা মানে শুধু ভোট দেওয়া নয়, প্রয়োজনে বুক পেতে দেওয়া। শরিফ ওসমান বিন হাদি চলে গেছেন; কিন্তু তার অবদান রয়ে গেছে সংগ্রামের ভাষায়, সাহসী কর্মকাণ্ডের ইতিহাসে।
আওয়ামী লীগ ও ভারতবিরোধী বক্তব্যের কারণে শরিফ ওসমান বিন হাদি ছিলেন সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত ছিলেন। তিনি ফ্যাসিবাদ ও ভারতবিরোধী একটি ন্যারেটিভ তৈরি করতে চেয়েছিলেন। জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে সামনে রেখে প্রতিটি রাজনৈতিক ইস্যুকে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন তিনি। তার রাজনীতি ছিল মতাদর্শিক লড়াই ও সাংস্কৃতিক পালাবদলের পক্ষে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মেরুকরণে তিনি সমালোচনামুখর স্বতন্ত্র অবস্থান বিনির্মাণের প্রয়াসী ছিলেন। এসব কারণে গুলিবিদ্ধ হওয়ার এক মাস আগেই হত্যার হুমকি পাওয়ার কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন শরিফ ওসমান হাদি। গত নভেম্বরে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেছিলেন, দেশি-বিদেশি অন্তত ৩০টি নম্বর থেকে তাকে ফোন ও মেসেজ পাঠিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। ওই পোস্টে তিনি লেখেন, আওয়ামী লীগের ‘খুনি’ সমর্থকরা তাকে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখছে। তবে জীবননাশের আশঙ্কা সত্ত্বেও ‘ইনসাফের লড়াই’ থেকে পিছিয়ে যাবেন না।
ঝালকাঠির নলছিটি থেকে উঠে আসা শরিফ ওসমান হাদিকে শুরুতে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকতে দেখা যায়নি। মাদ্রাসার শিক্ষক বাবার সন্তান হাদি নেছারাবাদ কামিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হন। সেখান থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে তিনি বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছিলেন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ইনকিলাব মঞ্চ গঠন করে আলোচনায় আসেন হাদি। ইনকিলাব মঞ্চ প্রতিষ্ঠার পর জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ, শহীদ ও আহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং জুলাই ঘোষণাপত্র ঘোষণার দাবিতে শাহবাগে ধারাবাহিক সমাবেশ আয়োজন করেন ওসমান বিন হাদি। বিভিন্ন টেলিভিশনের টকশোতেও তিনি জোরালো বক্তব্য রাখেন। দ্রুত তার একটি সমর্থক গোষ্ঠী গড়ে ওঠে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত বছরের অক্টোবরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভে অংশ নেন তিনি। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার দাবিতেও ছিলেন সরব। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পক্ষেও প্রকাশ্যে মত দেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর ওসমান বিন হাদি জাতীয় নাগরিক কমিটিতে যোগ দিলেও পরে নতুন দল এনসিপিতে যোগ দেননি। বরং ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে কয়েক মাস ধরে মাঠে সক্রিয় ছিলেন। ফজরের নামাজের পর মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে ভোট চাওয়া, বাতাসা-মুড়ি নিয়ে প্রচার, ভোটারদের কাছ থেকে অনুদান গ্রহণ ও ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ-সবই তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরতেন। ওসমান হাদিকে হত্যার এ ঘটনাকে নির্বাচনের প্রাক্কালে ‘পলাতক শক্তির’ সহিংসতার একটা সতর্ক বার্তা হিসাবে দেখছে সরকার। ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৪ জনকে আটক ও গ্রেফতার করেছে পুলিশ ও র্যাব।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর হাদির আক্রান্ত হওয়া ও মৃত্যুর ঘটনা নানা কারণে দেশের রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতাকে আরও নাজুক করেছে। শান্তিপূর্ণভাবে পূর্ণ নিরাপত্তার মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার বিষয়টি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। হাদির অবর্তমানে তার অনুসারীদের সামনেও তৈরি হয়েছে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ। যার মধ্যে রয়েছে মতাদর্শিক ও সাংস্কৃতিক লড়াই অব্যাহত রাখার দায় এবং সংক্ষোভ-প্রতিবাদের প্রতিক্রিয়া থেকে আক্রমণাত্মক পরিস্থিতির উদ্ভব ঠেকানো। হাদি কাজ করেছেন সংগ্রাম, সাহস ও দায়বদ্ধতায়। বুদ্ধিবৃত্তিক জনসম্পৃক্ত প্রয়াসে এক্ষেত্রে যতটা সফল্য আসবে, হঠকারিতা ও উগ্রতায় ততটা আসবে না। হাদির পক্ষ ও বিপক্ষ শক্তি মতাদর্শিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরে কাজ করলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক আরও সজীব, ক্রিটিক্যাল ও বহুমাত্রিক হতে পারত। শক্তি ও আক্রমণের ধ্বংসাত্মক পথে চলে শরিফ ওসমান হাদির আদর্শিক চেতনা বিজয়ী হবে না। হত্যা ও হত্যার প্রচেষ্টার দ্বারাও হাদি ও তার অনুসারীদের অবসান ঘটানো সম্ভব হবে না। বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে আঘাত নয়, কেবল তর্ক-বিতর্ক-যুক্তি এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক জনসক্রিয়তার মাধ্যমেই বিজয়ী হওয়া সম্ভব। সম্মুখসারির জুলাই যোদ্ধা, বিপ্লবী, শরিফ ওসমান হাদি ফ্যাসিস্টদের হাতে জীবন দিয়ে এ গণতান্ত্রিক সত্য প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন।
প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ : চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওন্যাল স্টাডিজ, বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)
