সাক্ষাৎকার
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি দুটো : ১৯৪৭ ও ১৯৭১: ড. সলিমুল্লাহ খান
মাহবুব কামাল
প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ড. সলিমুল্লাহ খান। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সলিমুল্লাহ খান শুধু একজন পণ্ডিতই নন, সজ্জনও বটে। তার দার্শনিক চিন্তা অনেককেই নাড়া দেয়। তার বিরোধিতা থাকলেও তাকে উপেক্ষা করা যায় না। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন যুগান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহবুব কামাল
যুগান্তর: ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের রাজনীতিটা ঠিকমতো চলছে কি?
ড. সলিমুল্লাহ খান: অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর আমি দেখলাম, দেশের ওপর তাদের পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল না। তার মানে, বলতে গেলে সমান্তরাল সরকার চলেছে বেশ কয়েকটা। আপনার অভিজ্ঞতা তা সমর্থন করে কি না জানি না, আমার অভিজ্ঞতা হচ্ছে সেটাই। সরকারের একটা কেন্দ্র আছে বটে, সেটা ড. ইউনূসের কেন্দ্র। কিন্তু ৫ আগস্ট যে আকাঙ্ক্ষা জন্মেছিল, তার অনেক ব্যাখ্যা হতে পারে। একটা ব্যাখ্যা এমন যে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বা বৈষম্যবিরোধী সাধারণ আন্দোলন, সেটা ছিল সরকারি চাকরিতে, বিশেষ করে সিভিল সার্ভিসে, কোটাপ্রথার বিপরীতে মেধার প্রাধান্য স্থাপন করা। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার যখন গঠিত হলো, সেটা অনেকটাই কোটার ভিত্তিতেই হয়েছে। এটা আপনি বলতে পারেন ‘কোটাভাস’ প্যারাডক্স। সেখানে সামরিক বাহিনীর প্রাক্তন, কয়েকজন এনজিও লর্ড, কয়েকজন সিভিল সোসাইটি-এরকম কতগুলো বিন্যাস হয়েছে। তো এজন্য বলি, অন্তর্বর্তী সরকারের গঠনটা ছিল শুরু থেকেই সমস্যায় আকীর্ণ। ৫ আগস্টের আন্দোলনে প্রকৃত ভূমিকা পালন করেছে যারা, জীবন দিয়েছে যারা, তাদের অধিকাংশই সাধারণ মানুষ, ছাত্র, যুবক। শ্রমিকরাও আছে। তাদের কথা আস্তে আস্তে পেছনে সরে গেছে।
তার মানে যে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা থেকে স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে মানুষ মুক্তি চেয়েছিল, সেটা এখনো সুদূরপরাহত বলব। একটা বিষয়ে সরকারের প্রশংসা করতে হয়, দুবছরের কম সময়ের মধ্যে সরকার উপলব্ধি করতে পেরেছে, তাদের আর দীর্ঘদিন থাকার সুযোগ নেই। সেজন্য তারা নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু নির্বাচন প্রসঙ্গে আমাদের যে অভিজ্ঞতা, সেটা শোচনীয় অভিজ্ঞতা। আগের সরকারের পতনের মূল কারণ, লোকে যতই বলুক না কেন, ওটা ছিল কোটাপ্রথার বিরুদ্ধে ছাত্রদের আন্দোলন, তার পেছনে ব্যাপক জনগণের সমর্থন এসেছিল। ওই সরকার পরপর তিনটি নির্বাচনে নানারকম কারচুপির আশ্রয় নিয়েছিল। অনেকে বলতে পারেন, মোটামুটি নির্বাচনব্যবস্থাকে তারা প্রহসনে পরিণত করেছিলেন।
শেষ পর্যন্ত আমাদের দেশের মতো দেশে, যেটা বিশ্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রান্তে, এমনকি বলতে পারেন প্রান্তেরও বাইরে, আমরা তো কেন্দ্রে নই-ই, আমরা প্রান্তেরও বাইরে। ভারত যদি প্রান্তে হয়, আমরা তারও বাইরে। তো এরকম দুর্বল একটি দেশে যেসব সরকার থাকে, তাদের অনেক রয়ে-সয়ে চলতে হয়। আমি অন্তর্বর্তী সরকারের সমস্যার কথা বলছি। তাদের অনেক বেশি কথা শুনতে হয়েছে আন্তর্জাতিক মুরুব্বিদের, তাদের প্রতিবেশী দেশের, তারপরে তৃতীয় স্থান পেয়েছে সম্ভবত আমাদের জনগণের আকাঙ্ক্ষা। সে কারণেই তাদের সাফল্য এবং ব্যর্থতা যাই বলুন না কেন, সীমিত।
যুগান্তর : ৫ আগস্ট তো একটা অনেক বড় আকাঙ্ক্ষার অভ্যুত্থান ছিল। অভ্যুত্থানের পর সমাজে কিছু সিনড্রোম দেখা দিল, যেমন ধরেন একটা মবোক্রেসি। এটা একটা সুস্থির সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এই মবোক্রেসি এখনো চলছে, ইন ভেরিয়াস ফর্মস। তো এই যে মবোক্রেসির উত্থান, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রাইভালরি, কখনো কখনো চরম রাইভালরি-এগুলোর ব্যাপারে কি আপনি ইন্টেরিম বা অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো দায় আছে বলে মনে করেন?
ড. সলিমুল্লাহ খান : আমি দুঃখিত, আপনার সঙ্গে একমত হতে পারছি না দুই কারণে। ইন্টেরিম বা অন্তর্বর্তী সরকারের দায় নেই, এটা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু জিনিসটার উৎপত্তি তাদের আমলে হয়নি। এটার শুরু অনেক আগে। আপনি যেটাকে মবোক্রেসি বলছেন, এটাকে প্রাচীন গ্রিসে ডেমোক্রেসি বলা হতো। অ্যারিস্টটল কয়েক ধরনের শাসনব্যবস্থার কথা বলেছেন, সবচেয়ে খারাপটার নাম ডেমোক্রেসি। ডেমোস মানে আপনি যেটাকে মব বলছেন সেটাই, জনগণ। কিন্তু কেন এটা বলেছেন? আমাদের ইতিহাস থেকে বলি। ১৮৫৭ সালের ইংরেজদের মতে সিপাহি যুদ্ধকে আমরা ভারতের প্রথম স্বাধীনতাসংগ্রাম মনে করি। সেটার পরে ইংরেজদের নীতির মধ্যে একটা ব্যাপক পরিবর্তন এসেছিল। তারা চেয়েছিল ভারতীয় এলিট বাহিনী তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করুক। এজন্য তারা কংগ্রেসের মতো পার্টি গঠনে সহায়তা করেছেন। মনে রাখতে হবে, ইংরেজের পরামর্শেই কংগ্রেস গঠিত হয়েছিল। ভারতীয়রাও চেয়েছিল। তারপরে মুসলিম লীগ হলো, অন্যান্য পার্টি হলো, আমরা জানি। কিন্তু এ পার্টিগুলোর রাজনীতি ছিল আবেদন-নিবেদনকেন্দ্রিক। এটি ব্যাপকভাবে শক্তিশালী হলেও ইংরেজরা যে শেষ পর্যন্ত ভারত ছাড়তে বাধ্য হলো, তার পেছনে এ মবোক্রেসির একটা ভূমিকা আছে।
যেমন ধরেন, স্বদেশি আন্দোলনের সময় একটা প্রতিক্রিয়াশীল ধরনের ঘটনা ঘটেছে। হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা হয়েছে। ইংরেজরা যেহেতু বাংলাদেশকে একটা পৃথক প্রদেশ তৈরি করেছিল ঢাকাকে কেন্দ্র করে, আসামকে তার সঙ্গে যুক্ত করে, এটা কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীরা, এলিটরা পছন্দ করেননি। সেজন্য এক ধরনের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সূত্রপাত হয়েছিল। যেমন, ময়মনসিংহে ১৯০৫ সালে হয়েছে। মুসলিম-হিন্দু সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছিল তখন থেকেই। ইংরেজরা এটাকে উসকানি দিয়েছে। তারপরে মহাত্মা গান্ধী যখন প্রথম মহাযুদ্ধের পরে ফিরে এলেন দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে, তখন তিনিই প্রথম ব্যাপক গণ-আন্দোলনের সূচনা করলেন। যেটার একটা নাম আমরা পেয়েছি খেলাফত আন্দোলন আর অসহযোগ আন্দোলন। এটারই ধারাক্রমে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং জনগণের রাজনীতি-দুটোই কিন্তু পাশাপাশি ঘটেছে ভারতে। এবং এরই প্রতিক্রিয়ায় ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হয়েছে, আবার ভাগ হয়ে পাকিস্তান তৈরি হয়েছে। তারই প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তান যে আমাদের জাতীয় সমস্যার সমাধান করেনি, সেই জন্যই বাংলাদেশ হয়েছে ১৯৭১ সালে।
আমি একটা কথা পরিষ্কার করে বলতে চাই, রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে ধরনের রাইভালরিই হোক না কেন, অন্তর্বর্তী সরকার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, অথবা নির্বাচিত সরকার হোক, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পাশ কাটিয়ে আমাদের দেশ এগোতে পারবে না। এটা ভারতীয় উপমহাদেশের অভূতপূর্ব ঘটনা। ভারত-পাকিস্তান এরকম জনযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয়নি। অবশ্য বাংলাদেশের জনযুদ্ধের কিছু ত্রুটির দিক আছে, অত্যধিক ভারতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া, এটা তৎকালীন নেতৃত্বের ব্যর্থতা।
দ্বিতীয়টা হলো, এখন আসছি আপনার মবোক্রেসির কথায়। আওয়ামী লীগের দুধরনের সরকার-শেখ মুজিবের সরকার এবং শেখ হাসিনার সরকার, দুটো মিলে প্রায় ২০ বছর শাসন করেছে। এই শাসনের মধ্যে তারা একটা জিনিস ভুল করেছেন। মুক্তিযুদ্ধটাকে তারা শুধু আওয়ামী লীগের দলীয় যুদ্ধ হিসাবে দেখাতে চেষ্টা করেছেন। ফলে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক বিশাল একটা গোষ্ঠীকে তারা পর করে দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা যারা করেছিলেন, তারাও কিন্তু কম ভোট পায়নি ১৯৭০-এ। এটাও খেয়াল রাখতে হবে, অন্তত ২৫ শতাংশ ভোট তারা পেয়েছিলেন। তো আওয়ামী লীগের ব্যর্থতার কারণে, দলটির বিরুদ্ধে যেমন জাসদ গঠিত হয়েছে, অন্যান্য শক্তিও বিদ্রোহ করেছে, সব মিলে একটা ব্যাপক অসন্তোষ দানা বেঁধেছিল। জাসদ গণ-আন্দোলন করতে না পেরে কী করেছিল? তারা গণবাহিনী গঠন করেছিলেন। এই কাহিনি আপনি কিছুটা জানেন। তারপরে এরশাদবিরোধী গণ-আন্দোলনের সূত্রপাত হলো আবার। আমি অতি সংক্ষেপে বলছি, ছাত্র আন্দোলন শুরু হলো ১৯৮৩ সাল থেকেই। একটা পর্যায়ে এরশাদের পতন হলো। এটাও একটা গণ-অভ্যুত্থান ছিল। কিন্তু এটাকে আমরা নাম দিয়েছিলাম নাগরিক গণ-অভ্যুত্থান।
যুগান্তর : বদরুদ্দীন উমর তো বলেছেন, খণ্ডিত নাগরিক অভ্যুত্থান!
ড. সলিমুল্লাহ খান : মানে সেটাই। এর চেয়ে ব্যাপক আকারে আন্দোলন হয়েছে ২০২৪-এ। তার মানে দাঁড়াচ্ছে কী, ১৯৭২-এ আমরা যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে শুরু করেছিলাম, সেটার মধ্যে একটা বড় বিষয় ছিল জনগণের মধ্যে বৈষম্য কমানো, যেটাকে আমরা ‘সাম্য’ শব্দ দিয়ে সংজ্ঞায়িত করেছিলাম। কেউ কেউ এটাকে সমাজতন্ত্র বলতে চেয়েছিলেন। সমাজতন্ত্র না হোক, দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া তো বাধ্যতামূলক ছিল। সেটা হয়নি। এই না হওয়ার কারণে বারবার জনগণকে মাঠে নেমে আসতে হয়েছে। এখন আপনারা মবোক্রেসি কেন বলছেন? ২০২৪-এর যে আকাঙ্ক্ষা থেকে পূর্ববর্তী সরকার পরাজিত হয়েছে, সেই আকাঙ্ক্ষার কোনো বাস্তবায়ন হয়নি দেখে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত সব মহল অর্থাৎ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা মানতে পারেনি। না পারার জন্য তারা তাদের স্ব-স্ব আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য যমুনা ঘেরাও করেছে, তারা বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলন করেছে। কেউ কেউ চাঁদাবাজিও করেছে। কিন্তু এর ব্যাপক আকাঙ্ক্ষাটা বুঝতে হবে। আমি এজন্যই বলব, চব্বিশের ৫ আগস্ট যে বিজয়টা এসেছিল, তার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হয়নি।
কেন হয়নি? একটা উদাহরণ দিচ্ছি। পুরোনো সরকারের রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতায় বহাল রাখা হয়েছে। তাহলে পুরোনো সরকারের পতন হলো কীভাবে? পুরোনো সরকারের পার্লামেন্ট বাতিল করা হলো, কিন্তু সংবিধানটা রেখে দেওয়া হলো! পৃথিবীর যেখানেই সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে, সেখানে সংবিধান স্থগিত হয়েছে। এখানে সংবিধান স্থগিত না করে এই যে গোঁজামিলন, এটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শব্দ, আমরা সংক্ষেপে বলি গোঁজামিল। এটাই হচ্ছে মবোক্রেসির আসল কারণ।
যুগান্তর : আচ্ছা একটু থামাই তাহলে। এই মবোক্রেসির একটা বাইপ্রোডাক্টই বলতে পারি, যেমন ধরেন, আমাদের যে কালচারাল হেরিটেজ, আমাদের যে একটা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আছে, এগুলোর ওপরে আঘাতটা যখন আসে, তখন এটা কিন্তু ফিফথ আগস্টের যে অবজেক্টিভের সঙ্গে যায় না। ৫ আগস্টের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে আমাদের কালচারাল হেরিটেজের কোনো কনফ্লিক্ট নেই। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ৫ আগস্টের পরে আমাদের কালচারাল বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আক্রমণ হয়েছে। যেমন নাটক হতে দেওয়া হয়নি, তারপরে ধরেন যে, আমাদের একটা গৌরবময় অতীত ছিল, ধরা যাক বেগম রোকেয়া, তার ছবিতে কালি মাখা হয়েছে, জয়নুল আবেদিন, যার সঙ্গে গত দুঃশাসনের কোনো সম্পর্ক নেই। দে আর রিমোট পার্ট অব আওয়ার হিস্ট্রি। এগুলো কেন হলো।
ড. সলিমুল্লাহ খান : আমি একমত নই আপনার সঙ্গে। সম্পর্ক আছে। আমি বলছি, ৫ আগস্ট যে সরকার ক্ষমতা হারিয়েছে, সেই সরকার এসব সিম্বলকে তাদের সংকীর্ণ স্বার্থে এমনভাবে ব্যবহার করেছে, তারা মনে করেছে, এগুলো একমাত্র তাদেরই ঐতিহ্য, এগুলো একমাত্র তাদের উত্তরাধিকার। আমি বলেছি, মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে বাংলাদেশের সব মানুষের উত্তরাধিকার। যুদ্ধের সময় কিছু লোক বিরোধিতা করেছিল। কোলাবোরেটর, রাজাকার ছিল। তারপরও আমরা বলি, বর্তমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক ভিত্তি দুটো। আমরা একটাকে স্বীকার করি, আরেকটা অস্বীকার করি। তথ্যের খাতিরে শুধু নয়, সত্যের খাতিরেও আপনাকে বলতে হবে।
একটা হচ্ছে ১৯৭১, আর একটা ১৯৪৭। ১৯৭১-এর যুদ্ধ নিয়ে আমরা যারা গৌরব করি, তারা ১৯৪৭কে ৭১-এর বিপরীত মনে করেছি যেন। এটা কিন্তু সত্য নয়। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামকে আপনি পুরোপুরি নাকচ করে দিতে পারেন না। আমি আগের কথা বাদ দিলাম, ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহের কথা বাদ দিলাম। আপনি তিতুমীর, ফরায়েজি এগুলো বাদ দিলেন। ১৮৫৭-এর পরে যে গণ-আন্দোলন হয়েছে, ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে, নজরুল ইসলাম যে আন্দোলনের একজন সৈনিক, ধরেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি যে আন্দোলন করেছে, সেটার পরিপ্রেক্ষিতেই তো কংগ্রেস-মুসলিম লীগের নেতৃত্বে ভারত স্বাধীন এবং ভাগ হয়েছে। আমি সেই কথা বললাম। কিন্তু ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে আমরা অতিরিক্ত মহিমান্বিত করতে গিয়ে, এটা অবশ্যই গৌরবের বিষয়, কিন্তু ’৪৭ সালে যে এদেশের মানুষ পাকিস্তান আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল সানন্দে, সেই সত্যটাকে আপনি ব্যাখ্যা না করে দমন করতে চেয়েছেন। ৫ আগস্ট যে সরকার ক্ষমতা হারিয়েছে, তারা কিন্তু এভাবে বাংলাদেশের সব ঐতিহ্যকে একপেশেভাবে ব্যাখ্যা করেছে। তারা মনে করেছে, জয়নুল আবেদিন তাদের, তারা মনে করেছে বেগম রোকেয়া তাদের। তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যাদের ন্যায়সংগত বিক্ষোভ হবে, তারা তো ওগুলোকে আক্রমণ করবেই। সে আক্রমণটা সঠিক বলছি না আমি।
যেমন শিল্পবিপ্লবের গোড়ার দিকে শ্রমিকরা মেশিন ভাঙত ইংল্যান্ডে। এদের লুডাইট বলা হতো। কেন মেশিন ভাঙত তারা? তারা মনে করেছে, মেশিন প্রবর্তনের ফলে, যেমন এখন এআই প্রবর্তিত হচ্ছে, তারা চাকরি হারাচ্ছিল। ধনতন্ত্র, যেটা তাদের চাকরি হারানোর কারণ, এটাকে না বুঝে তারা মেশিন ভাঙত। এবং তাদের তখন মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা করা হতো। ইংল্যান্ডে ১৮২৫ সালে আইন হয়েছে ট্রেড ইউনিয়ন করার চেষ্টা করলে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। বেশি আগে না, ১৮২৫, মানে ঊনবিংশ শতাব্দীর এক কোয়ার্টার পরে। এর মাত্র ২০০ বছর পরে আমরা কথা বলছি।
তো আমি বলছি যে, বাংলাদেশে যারা মব করেছে, তারা যেসব সিম্বলকে আক্রমণ করেছে, সেটা যুক্তিসংগত নয়; কিন্তু মব তো যুক্তি মানে না। আগের সরকার যা করেছে, তারা ধরুন বাংলা একাডেমিকে এক্সক্লুসিভলি নিজেদের লোকদের ডেকে ডেকে পুরস্কার দিয়েছে। তো মানুষ মনে করেছে, বাংলা একাডেমি মানে আওয়ামী লীগের। বাংলা একাডেমিতে যাদের মহাপরিচালক নিয়োগ করা হয়েছে, তারা হয়তো নির্লজ্জভাবে আওয়ামী লীগের চাটুকার ছিলেন। তো শামসুজ্জামান খানকে আপনি চেনেন, হাবিবুল্লাহ সিরাজীকে চেনেন, আপনি মোহাম্মদ নুরুল হুদাকে চেনেন। আমি এগুলোর নাম নিতে চাই না।
যুগান্তর : অ্যাগ্রিড। আমার পয়েন্টটা অন্য জায়গায়। আমার পয়েন্টটা, ধরেন আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধকে একটা প্রাইভেট কোম্পানি বানিয়ে মনোপোলাইজ করতে চেয়েছে, অথচ ওটা পাবলিক প্রোপার্টি। ওকে ফাইন। এখন ধরেন, একজন নন-আওয়ামী লীগার, ঠিক আছে? তার তো কোনো দোষ নেই। শেখ মুজিবের প্রতি তার যে আবেগ, তার যে প্যাশন, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার যে প্যাশন, সে কি আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে না? সে তো আওয়ামী লীগের পার্ট না। তাই না? একটা নন-আওয়ামী লীগার, যিনি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন এবং যিনি আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের বিরোধিতা করেছেন, তিনি যখন দেখছেন, বঙ্গবন্ধুকে ডিফেম করা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধকে ইরেজ করে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, তখন সে তো তিনি তার অনুভূতিতে আঘাত পাবেন।
ড. সলিমুল্লাহ খান : আপনি বাঙালি মুসলমান সমাজের শিক্ষা-দীক্ষা, পশ্চাৎপদতা, এগুলো জানেন, সবাই জানে। এজন্য এই সমাজকে পুনর্গঠন করতে হলে যে মৌলিক পরিবর্তন দরকার, তার একটা সম্ভাবনা এসেছিল আমাদের সামনে ১৯৭১-এ। সেটাকে কিন্তু পরবর্তী সরকারগুলো সদ্ব্যবহার করেনি। এই পুরোনো ইতিহাস বলতে চাই না। আপনি যেভাবে মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুকে এক বলছেন, আমি কিন্তু এর সঙ্গে একমত নই। আপনার কথা আমার ওপর চাপিয়ে দিয়েন না, আমারটা আমি আপনার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছি না।
আমি বলছি কী, শেখ সাহেব শুধু মুক্তিযুদ্ধের আগে নেতা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি নেতৃত্ব দিতে পারেননি। তিনি স্বেচ্ছায় পাকিস্তানিদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। এই সত্যে কোনো সন্দেহ নেই। এবং আসার পরেও তিনি দেশ চালাতে পারেননি। দেশকে তিনি যেভাবে চালিয়েছেন, যেমন ধরেন কথার কথা বললাম, ১৯৭৩ সালে তিনি সিভিল সার্ভিসের ব্যাচ করলেন। কারণ, তার দুটো শত্রু ছিল। একটা হচ্ছে পাকিস্তান আর্মি, আবার বাংলাদেশ আর্মিকেও তিনি সন্দেহের চোখে দেখেছেন। যেহেতু মুক্তিযুদ্ধ তিনি পরিচালনা করতে পারেননি, তিনি তাজউদ্দীন সাহেবকে বিশ্বাস করেননি। এগুলো আপনি সব জানেন। তিনি সিভিল সার্ভিসকেও বিশ্বাস করতে পারেননি। আগে ছিল মেরিটভিত্তিক সিভিল সার্ভিস, ভালো হোক, মন্দ হোক। তিনি ’৭৩ সালে মুক্তিযোদ্ধা নামে অনেক অযোগ্য লোক সেখানে ঢোকালেন। এগুলো ছিল ভয়ানক আত্মঘাতীমূলক কাজ। এগুলো শেখ মুজিবের আমলেই হয়েছে।
তো আমি এজন্য বলছি কী, আপনি মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধু এক করে দেখেন, আমি এক করে দেখি না। আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখি, বঙ্গবন্ধুকে দেখি না। আমি মনে করি, তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। আওয়ামী লীগের কোনো পলিটব্যুরো ছিল? আওয়ামী লীগের কোনো সেন্ট্রাল কমিটি ছিল? তিনি কী কারণে পাকিস্তানিদের কাছে ধরা দিলেন? এটা হচ্ছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গোড়ায় সমূহ দুর্বলতা। এজন্যই তিনি পাকিস্তানের বন্দিশালা থেকে এসেও কখনো মুজিবনগর যাননি। কখনো তাজউদ্দীন আহমদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে চাননি। বন্দিদের জিজ্ঞাসা করেননি। এগুলো সবাই জানে। আমি এজন্য বলছি, দুটাকে এক করবেন না।
যুগান্তর : আপনি বলছেন যে, উনি স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছেন, ওনার বিকল্প কী ছিল, একটু জানতে চাই।
ড. সলিমুল্লাহ খান : আচ্ছা তাজউদ্দীনের বিকল্প কী ছিল?
যুগান্তর : তাহলে তো বিকল্প হলো বঙ্গবন্ধুকে ইন্ডিয়া যেতে হতো। এই তো?
ড. সলিমুল্লাহ খান : আপনি ইন্ডিয়া যাবেন, না রংপুর যাবেন, সেটা আপনার ব্যাপার।
যুগান্তর : না না, আমি বলছি যে...
ড. সলিমুল্লাহ খান : আওয়ামী লীগ অ্যাজ এ পার্টি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত ছিল। তাজউদ্দীনরা পালিয়ে যাওয়ার পর কেন ১৫ দিন পরে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দিতে হলো?
যুগান্তর : না, আমি সেটা জানতে চাচ্ছি না। আমি বলছি যে, যদি বঙ্গবন্ধু ইন্ডিয়াতে চলে যেতেন টু লিড দি ওয়্যার...
ড. সলিমুল্লাহ খান : তিনি কোথায় যাবেন, সেটা আপনি বলবেন কেন? আমি বলব কেন? তিনি একটা পার্টির নেতা, যদি দেশকে স্বাধীন করার জন্য ডাক দিয়ে থাকেন...
(ক্রমশ)
