হৃদরোগকে অবহেলা নয়
Advertisement
ডা. তৌফিকুর রহমান
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রতিবছর ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব হার্ট দিবস। ২০২৬ সালেও ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশন (ডব্লিউএইচএফ) বিশ্ববাসীকে হৃদরোগ সম্পর্কে সচেতন করতে এ দিনটি পালন করছে। এবারের প্রচারণার মূল বার্তা-‘Heart Disease Can Hide in Plain Sight: Don't Miss a Beat’. অর্থাৎ, হৃদরোগ অনেক সময় আমাদের চোখের সামনেই নীরবে বেড়ে ওঠে; তাই তার সংকেত যেন আমরা উপেক্ষা না করি, হৃদয়ের কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্পন্দন যেন আমাদের নজর এড়িয়ে না যায়।
বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ২০.৫ মিলিয়ন মানুষ হৃদরোগে মৃত্যুবরণ করেন। বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশের জন্য হৃদরোগ দায়ী এবং করোনারি হার্ট ডিজিজ ও স্ট্রোক এই মৃত্যুর প্রধান অংশের জন্য দায়ী। আরও উদ্বেগজনক হলো, এই বোঝার বড় অংশই বহন করছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো।
বাংলাদেশের মতো দেশে তাই বিশ্ব হার্ট দিবসের তাৎপর্য আরও গভীর। দ্রুত নগরায়ণ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ধূমপান ও তামাকের ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ডিসলিপিডিমিয়া, ওবেসিটি, এবং বায়ুদূষণ-সব মিলিয়ে কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামনে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব হার্ট দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়-হৃদ্রোগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর যুদ্ধ হাসপাতালের সিসিইউ বা ক্যাথ ল্যাবে শুরু হয় না; এর সূচনা হওয়া উচিত পরিবার, বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র ও সমাজে।
হৃদয়-জীবনের অবিরাম স্পন্দন
এই অসাধারণ অঙ্গটির প্রতি আমাদের যত্ন কিন্তু সব সময় তার গুরুত্বের সমান নয়। আমরা গাড়ির নিয়মিত সার্ভিসিং করি, মোবাইল ফোনের ব্যাটারি নিয়ে উদ্বিগ্ন হই, কিন্তু নিজের রক্তচাপ, ব্লাড গ্লুকোজ কিংবা কোলেস্টেরোল বছরের পর বছর পরীক্ষা করি না। অনেক মানুষ প্রথমবার নিজের কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে পারেন হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হওয়ার পর।
হৃদ্রোগ সবসময় নাটকীয়ভাবে আসে না। অনেক ক্ষেত্রে রোগটি দীর্ঘদিন নীরবে অগ্রসর হয়। উচ্চরক্তচাপকে তাই প্রায়ই নীরব ঘাতক বলা হয়। ডায়াবেটিস ও ডিসলিপিডিমিয়াও বছরের পর বছর উল্লেখযোগ্য উপসর্গ ছাড়াই ভাসকুলার ড্যামেজ ঘটাতে পারে। করোনারি অ্যাথেরোস্কলেরোসিস ধীরে ধীরে তৈরি হতে পারে; একসময় চর্বির আস্তর ফেটে যাওয়া ও থ্রমবোসিসের মাধ্যমে হঠাৎ আকস্মিক হৃদ্রোগ ঘটতে পারে।
সুতরাং উপসর্গ না থাকা মানেই সুস্থ হৃদয়-এ ধারণা বিপজ্জনক।
তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
ডব্লিউএইচএফ ২০২৬ সালের প্রচারণায় তিনটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে এনেছে-লক্ষণ চিনুন, হৃদয়কে সুরক্ষিত রাখুন এবং নীতিনির্ধারকদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে উদ্বুদ্ধ করুন।
১. হৃদ্রোগের সংকেত চিনুন
বুকে চাপ, ভারী অনুভূতি বা ব্যথা; শ্বাসকষ্ট; অস্বাভাবিক ঘাম; হঠাৎ দুর্বলতা; অস্বাভাবিক ক্লান্তি-এসব উপসর্গ অবহেলা করা উচিত নয়। হৃদরোগের সম্ভাব্য লক্ষণ দেখা দিলে বাড়িতে অপেক্ষা করা, নিজে নিজে ওষুধ খাওয়া অথবা অসংখ্য ছোট প্রতিষ্ঠানে ঘুরে সময় নষ্ট করার পরিবর্তে দ্রুত উপযুক্ত চিকিৎসাকেন্দে পৌঁছানো জরুরি।
একইভাবে স্ট্রোকের ক্ষেত্রে হঠাৎ মুখের পেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া, হাতে দুর্বলতা অনুভব করা এবং কথা বলতে সমস্যা হওয়ার মতো লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করা জরুরি। তবে লক্ষণ সব রোগীর ক্ষেত্রে একই রকম নাও হতে পারে। নারী, প্রবীণ এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের করোনারি ইসকেমিয়া, কখনো অস্বাভাবিক উপসর্গ প্রকাশ ঘটাতে পারে। কারও প্রধান অভিযোগ হতে পারে শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব, তীব্র ক্লান্তি বা অস্বস্তি। তাই সাধারণ মানুষের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদেরও অস্বাভাবিক উপসর্গ সম্পর্কে সচেতন থাকা দরকার।
২. ঝুঁকি জানুন, হৃদয়কে রক্ষা করুন
কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো-এর বহু ঝুঁকি প্রতিরোধযোগ্য বা নিয়ন্ত্রণযোগ্য। ডব্লিউএইচএফও জোর দিয়ে বলছে যে, বেশিরভাগ হৃদ্রোগের ক্ষেত্রে প্রতিরোধ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিশাল সুযোগ রয়েছে।
হৃদ্রোগ প্রতিরোধের প্রথম ধাপ নিজের ঝুঁকি সম্পর্কে জানুন
করোনারি আর্টারি ডিজিজ, স্ট্রোক, হার্ট ফেইলিওর, এট্রিয়াল ফাইব্রিলেশন, ক্রনিক কিডনি ডিজিজ, হৃদ্রোগজনিত অকালমৃত্যুর অন্যতম রিস্ক ফ্যাক্টর হলো উচ্চরক্তচাপ থাকা সত্ত্বেও বহু মানুষের কোনো উপসর্গ থাকে না। তাই শুধু মাথাব্যথা হলে রক্তচাপ মাপা নয়-প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের নিয়মিত রক্তচাপ মাপা একটি স্বাভাবিক স্বাস্থ্য-অভ্যাসে পরিণত হওয়া উচিত।
রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখুন
ডায়াবেটিস কেবল ব্লাড সুগার বা রক্তের শর্করার রোগ নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্ডিওভাসকুলার রিস্ক বা হৃদরোগের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা। ডায়াবেটিস রোগীদের করোনারি আর্টারি ডিজিজ (হৃদধমনির রোগ), স্ট্রোক, পেরিফেরাল আর্টেরিয়াল ডিজিজ (শরীরের দূরবর্তী রক্তনালির রোগ), হার্ট ফেইলিওর (হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্ষমতা হ্রাস) এবং রেনাল ডিজিজ বা কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়ে। তাই ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য শুধু শর্করার মাত্রা কমানো নয়; বরং সামগ্রিক হৃদরোগ ও কিডনি রোগের ঝুঁকি কমানো।
কোলেস্টেরল সম্পর্কে সচেতন হন
রক্তে উচ্চ মাত্রার এলডিএল কোলেস্টেরল এথেরোস্ক্লেরোটিক কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ বা রক্তনালিতে চর্বি জমা হৃদরোগের অন্যতম মূল কারণ। অথচ কোলেস্টেরল বাড়লেও সাধারণত কোনো ব্যথা বা পূর্ব সতর্কবার্তা থাকে না।
যাদের ইতিমধ্যেই হৃদ্রোগ বা এথেরোসেক্লরোসিস শনাক্ত হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে সেকেন্ডারি প্রিভেনশন বা আবার আক্রমণ রোধ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে উপযুক্ত লিপিড কমানোর থেরাপি, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনা, রক্ত জমাট বাঁধা বিরোধী থেরাপি নির্দেশিত-সেখানে ধূমপান বর্জন, ব্যায়াম, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার সমন্বিত প্রয়োগ প্রয়োজন। ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশনের সেকেন্ডারি প্রিভেনশন রোডম্যাপেও হৃদ্রোগীদের আবার হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক প্রতিরোধে এই সমন্বিত ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
খাদ্য হোক হৃদয়ের বন্ধু
আমাদের খাদ্যাভ্যাস কার্ডিওভাসকুলার হেলথ বা হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। অতিরিক্ত লবণ, স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাট, অতিরিক্ত পরিশোধিত শর্করা, মিষ্টি পানীয় এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিবর্তে ফলমূল, শাকসবজি, হোল গ্রেইন বা পূর্ণ শস্যদানা, শিম বা ডালজাতীয় খাবার, বাদাম, মাছ এবং স্বাস্থ্যকর প্রোটিন উৎসের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো লবণের ব্যবহার কমানো। রান্নায় লবণ দেওয়ার পাশাপাশি পাতে অতিরিক্ত কাঁচা লবণ খাওয়া, আচার, প্রক্রিয়াজাত স্ন্যাক্স এবং বিভিন্ন প্যাকেটজাত খাবারের মাধ্যমে সোডিয়াম গ্রহণের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। হৃদযন্ত্রের জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার মানেই দামি বিদেশি খাবার নয়। দেশীয় শাকসবজি, ডাল, ফল, মাছ এবং পরিমিত ও সুষম খাবারের মাধ্যমেও হৃদবান্ধব খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব।
চলুন, হৃদয়কে সচল রাখি
নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম বা কায়িক শ্রম রক্তচাপ, ইনসুলিন সংবেদনশীলতা, শরীরের ওজন, রক্তের লিপিড প্রোফাইল, কার্ডিওরেসপিরেটরি ফিটনেস এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর উপকারী প্রভাব ফেলে। এর জন্য সবাইকে অ্যাথলেট বা খেলোয়াড় হতে হবে না। দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা, বাগান করা কিংবা দৈনন্দিন জীবনে হাঁটার পরিমাণ বাড়ানো-সবই খুবই উপকারী।
বিশ্ব হার্ট দিবসের বার্তা তাই সহজ-বসে থাকার অভ্যাসে লাগাম টানুন, চলাফেরা বাড়ান।
একদিন অতিরিক্ত ব্যায়াম করে পরের ছয় দিন নিষ্ক্রিয় থাকার পরিবর্তে নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমকে জীবনযাত্রার অংশ করে তোলাই গুরুত্বপূর্ণ।
তামাকমুক্ত হৃদয়
হৃদ্রোগ প্রতিরোধে তামাক নিয়ন্ত্রণ বা তামাক বর্জনের গুরুত্ব অপরিসীম। সিগারেট, বিড়ি, জর্দা বা ধোঁয়াহীন তামাক-কোনোটিই নিরাপদ নয়। ধূমপান অ্যান্ডোথেলিয়াল ডিসফাংশন (রক্তনালির ভেতরের প্রাচীরের ক্ষতি), প্রদাহ, রক্ত জমাট বাঁধা এবং রক্তনালীতে চর্বি জমার মাধ্যমে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। এমনকি পরোক্ষ ধূমপানও সমান ক্ষতিকর।
তাই চিকিৎসকের চেম্বারে ধূমপানের ইতিহাস নেওয়া শুধু একটি আনুষ্ঠানিক প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়। প্রতিটি ধূমপায়ীর জন্য ধূমপান ছাড়ার পরামর্শ, মানসিক ও আচরণগত সমর্থন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা হৃদ্রোগ প্রতিরোধের মূল অংশ হওয়া উচিত।
একটি সুস্থ হৃদয় শুধু একজন মানুষের জীবনকে সচল রাখে না; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবার, একটি কর্মক্ষেত্র, একটি সমাজ এবং একটি দেশের ভবিষ্যৎ। প্রতিটি হৃদয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি স্পন্দন মূল্যবান।
তাই একটি স্পন্দনও যেন বাদ না পড়ে (Don't Miss a Beat)।
অধ্যাপক ডা. তৌফিকুর রহমান : হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ অ্যান্ড হসপিটাল, ঢাকা
