Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

শতফুল ফুটতে দাও

নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি থেকে মুক্তির পথ কী

ড. মাহবুব উল্লাহ্

ড. মাহবুব উল্লাহ্

প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি থেকে মুক্তির পথ কী

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোটেও সন্তোষজনক নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসংক্রান্ত নিরেট পরিসংখ্যান জানা না থাকলেও প্রায় সবাই একবাক্যে বলছেন-আইনশৃঙ্খলার অবস্থা ভালো নেই।

একটি দৈনিকের নিজস্ব প্রতিবেদকের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে চুরির মামলা বেড়েছে ১২ শতাংশ, ডাকাতির মামলা বেড়েছে ৪৩ শতাংশ, ছিনতাই বা দস্যুতার মামলা ৩৭ শতাংশ এবং অপহরণের মামলা বেড়েছে ৭১ শতাংশ। মামলা বৃদ্ধি মানেই কি অপরাধ বৃদ্ধি? সব সময় তা নাও হতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, ভুক্তভোগী ব্যক্তি নিছক ঝামেলা-ঝক্কি এড়ানোর জন্য মামলার পথ বেছে নেন না। ফলে মামলার চেয়ে অপরাধের সংখ্যা বেশি হওয়ার কথা। আবার অনেক সময় প্রতিপক্ষকে হেনস্তা করার জন্য ভুয়া মামলার আশ্রয় নেওয়া হয়। এমন ক্ষেত্রে মামলার চেয়ে প্রকৃত অপরাধের সংখ্যা কম। পরিসংখ্যানের এসব দুর্বলতা সত্ত্বেও আমরা মোটা দাগে বলতে পারি, মামলার সংখ্যা অপরাধের প্রতিফলন ঘটায়। সমাজজীবনে অপরাধ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও চলাচলে বেশি প্রভাব ফেলে এবং নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি হয়। এসব অপরাধের মধ্যে রয়েছে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, দস্যুতা ও অপহরণ। এগুলোর বাইরে আরও অনেক ধরনের অপরাধ রয়েছে। যেমন: খুনখারাবি বা হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক ও অন্য কারণে সহিংসতা এবং সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা।

পত্রিকাটি একটি উদাহরণ হিসাবে কাজী মোহাম্মদ আ. হাদিদ নামে এক ব্যক্তির দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছে। তিনি একজন বেসরকারি চাকুরে। অফিসের কাজ শেষে তিনি প্রায়ই মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহণ, অর্থাৎ রাইড শেয়ার করেন। উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলাদেশে এখন শতসহস্র কর্মজীবী রয়েছে, যারা তার কর্মক্ষেত্র থেকে পাওয়া বেতন বা মজুরি দিয়ে সংসার চালাতে পারেন না। এজন্য তাদের অতিরিক্ত সময় কাজ করে আয় বাড়াতে হয়। এতে ব্যক্তিবিশেষের শ্রমঘণ্টা বেড়ে যায় এবং তিনি পরিবারকে যথোপযুক্ত সময় দিতে পারেন না। নিজের জন্য প্রয়োজনীয় বিশ্রামও ভোগ করতে পারেন না। বেঁচে থাকার জন্য এই যে চাপ, তা এমন একধরনের মনস্তত্ত্ব তৈরি করে, যা হতাশা উদ্রেককর। যে সমাজে জীবনযাত্রা এরকম, সেই সমাজেও হতাশাজনিত অপরাধ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে ব্যক্তিবিশেষের পারিবারিক জীবনে তুমুল অশান্তি আসতে পারে।

আমরা কাজী মোহাম্মদ আ. হাদিদের গল্পটি বলছিলাম। তিনি গত বছরের ২৪ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর বনানীতে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। তার মামলার এজাহারে লেখা হয়েছে, যাত্রী নামানোর পর কাজী মোহাম্মদ আ. হাদিদ বনানী মাঠের কাছে মূত্রত্যাগ করতে গেলে চারজন তাকে ছরিকাঘাতের ভয় দেখিয়ে মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। এ সময় তাকে মারধর করা হয়। ছিনতাইকারীরা পালিয়ে যাওয়ার সময় চিৎকার করলে তিনি ও জনতা মিলে দুজনকে ধরে ফেলেন। এ সময় একটি হাতে আঘাত পান তিনি। তার মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়। কিন্তু মানিব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায় দুজন।

হাতে আঘাত পাওয়ার কারণে মাসখানেক কাজে যেতে পারেননি উল্লেখ করে আ. হাদিদ বলেন, তার কারণে নির্মাণ প্রকল্প থামিয়ে রাখা যায় না বলে অফিস নতুন লোক নিয়েছে। মোবাইল ফোনটি আদালতে জব্দ ছিল। সেটি ছাড়িয়ে নিতে আইনজীবীর পেছনে সাড়ে ৪ হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে। মোটরসাইকেলের কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স তিনি এখনো তুলতে পারেননি। আঙুলের ছাপ না মেলাসংক্রান্ত জটিলতায় পড়েছেন।

আ. হাদিদ ছিনতাইয়ের ঘটনায় তার টাকা হারিয়েছেন, তিনি আহত হয়েছেন, চাকরি হারিয়েছেন, মোটরসাইকেলের কাগজপত্র তুলতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন, মোবাইল ফোন ফেরত পেতে টাকা খরচ করতে হয়েছে এবং তিনি এখনো কর্মহীন। আ. হাদিদের কাহিনি থেকে বোঝা যায়, ছিনতাইয়ের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া কত ব্যয়বহ। এসব কারণে অপরাধকবলিত হওয়া সত্ত্বেও দেশের বেশির ভাগ মানুষ থানা-পুলিশ ও আইন-আদালতের আশ্রয় নিতে চায় না। কারণ, সেই পথে গেলে ক্ষতির অঙ্ক ১০ গুণ কিংবা শতগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন অগণিত ছিনতাই হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী কোনো আইনি প্রতিবিধানের আশ্রয় নেন না। কারণ শুধু একটাই, আর তা হলো ছিনতাইয়ে যে ক্ষতি হয়, এর চেয়ে অনেক ক্ষতি হয় পুলিশ ও আইনি সহায়তা নিতে গেলে।

ছিনতাই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের একটি গল্প আছে। নিউইয়র্ক শহরের বেশকিছু অ্যাভিনিউ ছিনতাইয়ের জন্য বহুল আলোচিত। এ শহরে রাস্তায় বের হতে হলে পথচারীর শুভানুধ্যায়ীরা পরামর্শ দেন অন্তত ৩০ ডলার সঙ্গে রাখতে। কারণ, ছিনতাইকারীর হামলার মুখোমুখি হলে অন্তত সুবোধ বালকের মতো ৩০ ডলার দিয়ে দিতে হয়। অন্যথায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারানোর শঙ্কাও থাকে। একবার নিউইয়র্ক শহরে ছিনতাই বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। এ অবস্থায় সাধারণ লোকজন রাস্তায় না বেরিয়ে বাড়িতে থাকাই শ্রেয়বোধ করল। ছিনতাইকারীরা দেখল তাদের জন্য কোনো শিকার নেই। এ অবস্থায় ছিনতাইকারীদের আয় শূন্যের কোঠায় নেমে গেল। এ পরিস্থিতি দেখে ছিনতাইকারীরা সিদ্ধান্ত নিল তারা ছিনতাইয়ের মাত্রা এমন পর্যায়ে নামিয়ে আনবে, যাতে মানুষজন রাস্তায় বেরোতে সাহসী হয়, তাদের কাছ থেকে ছিনতাইও করা যায় এবং পুলিশের হাতে ধরা পড়ার হারও কমে যায়। এভাবে পথচারী, ছিনতাইয়ের ঘটনা এবং পুলিশ কর্তৃক অপরাধী আটকের ঘটনার মধ্যে একটি ভারসাম্য বা Equilibrium তৈরি হয়। অর্থাৎ অপরাধ ঘটবে কি না, তার মাত্রা সহনীয় থাকবে এবং পুলিশও কিছু কর্মদক্ষতা দেখাতে পারবে। রাজধানী ঢাকায় যে ছিনতাই হয়, তা নিয়ে এ ধরনের কোনো মডেলের কথা কি আমরা ভাবতে পারি?

যে ৪ ধরনের অপরাধে মামলা হয়েছে ১৩ হাজার ৪১০টি, যা আগের বছরের চেয়ে ১৬.৪৮ শতাংশ বেশি, সেগুলোর শুধু ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মামলা বেড়েছে ৩৯ শতাংশ। অবশ্য চুরি ও ছিনতাই বা দস্যুতার অনেক ঘটনায় ভুক্তভোগীরা মামলার ঝামেলায় যেতে চান না। সেই প্রবণতা বরাবরের তুলনায় এখনো অব্যাহত আছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি মিডিয়া) এএইচএম সাহাদাত হোসাইন দৈনিকটিকে বলেন, ১৫-২০ বছর ধরে দেশে অপরাধের চিত্র প্রায় একইরকম। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি বা অপহরণের মামলা গত বছরের তুলনায় বাড়লেও সামগ্রিকভাবে অন্যান্য অপরাধও বেড়েছে, এমনটি নয়। মামলা বাড়ার একটি বড় কারণ, এখন মামলা করা সহজ হয়েছে, মানুষ সহজেই থানায় গিয়ে মামলা করতে পারছেন। এছাড়া আগে ঘটেছে, এমন ঘটনায় নতুন করে মামলা হয়েছে।

সাহাদাত হোসাইন বলেন, দেশে মোট মামলার সংখ্যা আগের চেয়ে কমেছে। এমনকি খুনের মামলাও কমেছে। এর অর্থ হচ্ছে-দেশে অপরাধের চিত্রটি কমবেশি একইরকম। অবশ্য পুলিশের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য বলছে, বিভিন্ন ধরনের অপরাধে ২০২৫ সালে মোট মামলা ৯ হাজার ৭৩২টি বেড়েছে। মামলা হয়েছে ১ লাখ ৮১ হাজার ৭৩৭টি।

পত্রিকাটির উদ্যোগে করা কিমেকার কনসাল্টিং লি.-এর এক মতামত জরিপে গত মাসে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলাতে সরকার ব্যর্থ বলে মনে করে ৬০ শতাংশ মানুষ। ৩৯ শতাংশ মনে করে, সরকার সফল। ১ শতাংশ বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিত নয়।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে খুনের ঘটনায় ৩ হাজার ৭৮৬টি মামলা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৫৪টি বেশি। খুনের মামলার হিসাব দেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশ উল্লেখ করেছে, কিছু মামলা আগের ঘটনার। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় বেশকিছু মামলা পরে হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক খুনের ঘটনা ঘটেছে অন্তত ১৫টি। বিগত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সংকলিত হিসাবে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৯৮ জন।

দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার পেছনে পুলিশ বাহিনীর দুর্বলতা কিংবা অকার্যকারিতাকে দায়ী করছেন অনেকে। ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান দমনের নামে পুলিশ ভয়াবহ দানবে পরিণত হয়েছিল-এমন অভিমত অনেকের। এ কারণে তারা ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর জনতার রুদ্ররোষের শিকার হয়ে নিজ নিজ কর্মস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পুলিশের অনেক অস্ত্র লুট হয়। ৫ আগস্টের পর ৩ দিন কোথাও পুলিশকে দেখা যায়নি। এ পর্যায়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তাদেরকে ডেজার্টার ঘোষণার হুমকি দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে পুলিশ কর্মস্থলে ফিরে এলেও তাদের মনোবলে প্রচণ্ড রকমের চির ধরে। এর ফলে তারা অপরাধ দমনে প্রায় নিষ্পৃহ হয়ে পড়ে। এটা একটা বড় কারণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার জন্য। পুলিশবাহিনীকে পুনর্গঠনের জন্য তেমন কোনো বড় উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। অতীতের দিনগুলোয় দুর্নীতির জন্য পুলিশের বদনাম দিল। কিন্তু তারা তাদের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করানোর জন্য বেছে বেছে হলেও অপরাধের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বেছে বেছে হলেও পুলিশের পদক্ষেপ নেওয়াতে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এর ফলে অপরাধীরা উৎসাহিত হচ্ছে, মব সৃষ্টিকারীরা বেআইনি কার্যকলাপে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এসব নিঃসন্দেহে অস্বস্তির কারণ। উপরন্তু সমাজ নিয়ন্ত্রণের শক্তি দ্বারা অপরাধ বাগে রাখার সক্ষমতাও হ্রাস পেয়েছে। যে সমাজে অলিগার্করা শতসহস্র কোটি টাকা লুণ্ঠন করে সমাজের অধিপতিতে পরিণত হয়, সে সমাজে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক মূল্যবোধের শক্তিতে অপরাধসহ নানাবিধ অবাঞ্ছিত কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। সমাজ যেন হবসের স্টেট অব চোরে প্রত্যাবর্তন করেছে। ভঙ্গুর রাষ্ট্রযন্ত্র পরিস্থিতিকে ভয়াবহভাবে নাজুক করে তুলেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রয়োজন সমাজদেহ থেকে লুণ্ঠন ও তস্করবৃত্তি উচ্ছেদ, মূল্যবোধের শক্তিতে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ জোরদার, যাতে গণপরিবহণে নারী ধর্ষণের মতো ঘটনার শিকার না হয় এবং পুলিশবাহিনীর মধ্যে মনোবল ফিরিয়ে আনা, এ বাহিনীকে পুনর্গঠন ও পুনর্বিন্যাস করা যায়।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম