Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

দৃষ্টিপাত

গণতন্ত্রের এ যাত্রা শুভ হোক

Advertisement

Icon

ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

গণতন্ত্রের এ যাত্রা শুভ হোক

Advertisement

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল এবারই প্রথম সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। গণভোটে জুলাই সনদ অনুমোদিত হয়েছে। অর্থাৎ নির্বাচিত হয়ে যারা সরকার গঠন করেছেন, তাদের জন্য আগামীতে জুলাই সনদের চেতনার আলোকে বৈষম্যমুক্ত এবং উদার গণতান্ত্রিক পথে দেশ পরিচালনার বাধ্যবাধকতা আরোপিত হয়েছে। আমরা যদি আগামীতে জুলাই চেতনার আলোকে দেশ পরিচালনা করতে পারি, তাহলে রাষ্ট্রপরিচালনায় কোনো স্বৈরাচারী অপশক্তির আবির্ভাব ঘটার আশঙ্কা থাকবে না। আগামীতে দেশ পরিচালনায় জনগণের মতামত প্রাধান্য পাক এবং বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে একটি উদার গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত হোক, এটাই একান্ত কামনা।

দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী অপশাসনের কারণে দেশের প্রতিটি সেক্টর ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গেছে। নতুন সরকারকে তাই এমন কিছু সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে, যা অতীতে কোনো সরকারকেই মোকাবিলা করতে হয়নি। প্রতিটি সমস্যাই অত্যন্ত জটিল এবং এগুলো উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। কিন্তু এসব সমস্যার দায়ভার নতুন সরকারকেই বহন করতে হবে। এসব সমস্যা সফলভাবে মোকাবিলার ওপর নতুন সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতা অনেকাংশেই নির্ভর করছে। এর মধ্যে কিছু সমস্যা আছে, যা তাৎক্ষণিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। আর কিছু সমস্যা আছে, যা সমাধানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে বিএনপি জোটের পক্ষ থেকে নির্বাচনি মেনিফেস্টোতে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার করা হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক নেই। আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের স্বৈরাচারী দুঃশাসনামলে দেশে যে গুম-খুনের সংস্কৃতি চালু করা হয়েছিল, তা বর্তমানে নেই ঠিকই; কিন্তু তারপরও এটা নিশ্চিত করে বলা যাবে না যে, দেশে পুরোপুরি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি করতে পারেনি। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের পক্ষ থেকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিকীকরণের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে মনোযোগী হতে হবে। বিভিন্ন সংস্থায় পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আজ্ঞাবাহী লোকজন এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে। তারা হয়তো পরিস্থিতির চাপে কিছুটা নিশ্চুপ হয়ে আছেন। তবে সময় ও সুযোগ পেলে তারা যে কোনো মুহূর্তে ছোবল মারতে পারে। তৃণমূল পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পুলিশই একমাত্র সংস্থা, যাদের কাছে অপরাধীদের তথ্য থাকে। পুলিশ আন্তরিকভাবে তৎপর হলে যে কোনো অপরাধ সহজেই দমন করা সম্ভব। বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে পুলিশ বাহিনীকে ব্যাপক দলীয়করণের মাধ্যমে একটি আজ্ঞাবহ বাহিনীতে পরিণত করা হয়েছিল। পুলিশ বাহিনীতে ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান শুরু করা প্রয়োজন। যাদের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারের প্রতি ব্যাপক মাত্রায় আনুগত্য প্রদর্শনের অভিযোগ পাওয়া যাবে, তাদের তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পোস্টিং দেওয়া যেতে পারে। এমনকি চাকরিচ্যুত করা যেতে পারে। দ্রুত পুলিশ বাহিনীতে নতুন সদস্য নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে বিজিবি থেকে সাময়িকভাবে কিছু সদস্যকে পুলিশ বাহিনীতে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। যে কোনো সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতা অনেকাংশেই নির্ভর করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্বাভাবিকতার ওপর। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নকে তার অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হিসাবে ঘোষণা করেছেন।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বৈরাচারী সরকার আমলে গৃহীত ও বাস্তবায়িত ভুল নীতির কারণে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রসঙ্গটি। প্রায় ৪ বছর ধরে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্বব্যাপী উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রবণতা শুরু হয়। কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রবণতা দেখা দিলে অন্যান্য ব্যবস্থার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক পলিসি রেট বৃদ্ধি করে বাজারে মুদ্রার জোগান হ্রাস করার চেষ্টা করে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অফ আমেরিকা (ফেড) পলিসি রেট একাধিকবার বৃদ্ধি করে। সেই সময় বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্তত ৭৭টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের পলিসি রেট বৃদ্ধি করে। পাশাপাশি অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে তারা উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক পলিসি রেট একাধিকবার বৃদ্ধি করলেও ব্যাংক ঋণের সুদের সর্বোচ্চ হার ৯ শতাংশ ফিক্সড করে রাখে। অন্তর্বর্তী সরকার বিগত ১৮ মাসে নানাভাবে চেষ্টা করেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। অন্তর্বর্তী সরকার আমলে মূল্যস্ফীতির সর্বোচ্চ হার ছিল ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন হার ছিল ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। যদি যথাসময়ে পলিসি রেট বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাজারভিত্তিক করা হতো, তাহলে নিশ্চিতভাবেই মূল্যস্ফীতির ওপর এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ত। প্রতিবেশী দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক পলিসি রেট বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাজারভিত্তিক করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সফলতা প্রদর্শন করেছে। এক সময় শ্রীলংকার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির হার অত্যন্ত উচ্চমাত্রায় চলে গিয়েছিল। এখন তা ২ দশমিক ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। মালদ্বীপের মূল্যস্ফীতির হার শূন্য দশমিক ১৬ শতাংশে নেমে এসেছে। ভারতের মূল্যস্ফীতির হার বর্তমানে ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। নেপাল ও পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতির হার যথাক্রমে ২ দশমিক ৪২ শতাংশ ও ৫ দশমিক ৮ শতাংশ।

পলিসি রেট বৃদ্ধির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কৌশল সাময়িক ব্যবস্থা হিসাবে স্বীকৃত। দীর্ঘমেয়াদে পলিসি রেট বৃদ্ধি করে রাখা হলে তা অভ্যন্তরীণভাবে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই প্রবণতাই প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। প্রতিটি সেক্টরে উৎপাদন কমে গেছে। এতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। বিএনপি তার নির্বাচনি মেনিফেস্টোতে বাংলাদেশের জিডিপির আকার ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। বর্তমানে দেশের জিডিপির আকার হচ্ছে ৪৫ বিলিয়ন ডলার। সেখান থেকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে হলে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ ব্যাপক মাত্রায় বৃদ্ধি ব্যতীত কোনো গত্যন্তর নেই। বর্তমানে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার জিডিপির ২২ থেকে ২৩ শতাংশ। একে অন্তত ৪০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আহরণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে দায়ী করা হয়। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার চেয়ে বিনিয়োগকে বেশি মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত করে সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সুশাসনের অভাব। দেশের প্রতিটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক মাত্রায় দুর্নীতি বিরাজমান রয়েছে।

আগামীতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব আহরণের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। বর্তমানে আমাদের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ৭ শতাংশের নিচে। ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটা অর্জনযোগ্য; তবে সেজন্য রাজস্ব আদায় ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে।

ব্যাংকিং সেক্টর হচ্ছে একটি দেশের অর্থনীতির ‘লাইফ লাইন।’ বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও দ্রুত বর্ধনশীল একটি দেশে সুষ্ঠু ব্যাংকিং ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সরকারের আনুকূল্যপ্রাপ্ত ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের অবাধ তৎপরতায় এ খাত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ব্যাংকিং ব্যবস্থা অর্থ পাচারের নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছিল। নতুন সরকারকে বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার চেষ্টা জোরদার করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে কেউ যেন অর্থ পাচারের কথা চিন্তাও করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি জনগণের অনেক প্রত্যাশা। তারা চায়, দেশ আবারও কার্যকর গণতান্ত্রিক শাসনের পথে ধাবিত হবে। বাংলাদেশ কার্যকর ও টেকসই উন্নয়নের ‘রোল মডেলে’ পরিণত হোক। জাতি আর কখনোই আওয়ামী লীগ আমলের মতো স্বৈরাচারী শাসনের কবলে পতিত হতে চায় না। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরে দেশ আবারও নতুন গন্তব্যে ধাবিত হোক, এটাই সবার প্রত্যাশা।

ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম